ওভারডিউ ম্যানেজমেন্ট : সম্মান বজায় রেখে আপোষ করা

।। নূরুল ইসলাম খলিফা ।।
১৯৯৩ সালে আমি বরিশাল শাখার ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নিলাম। চার বছরের মাথায়ই আবার ফিরে এলাম নিজ শহরে। ১৯৮৯ সালে আমি এই শাখার সেকেন্ড অফিসার ছিলাম এবং প্রিন্সিপ্যাল অফিসার হিসেবে প্রমোশন পাওয়ার পরপরই প্রধান কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগে বদলী হয়ে গিয়েছিলাম। চার বছর পরে আবার সেখানে , তবে এবার ম্যানেজারের দায়িত্বে। পদবীতে তখনও আমি প্রিন্সিপ্যাল অফিসার। অবশ্য সে বছরই জুন মাসে আমি এসপিও পদে প্রমোশন পেরেছিলাম । একজন সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট এর কাছ থেকে দায়িত্ব নিলাম। পোষ্টিং অর্ডার করার সময় এই প্রশ্ন উঠেছিল যে , একটি বিভাগীয় সদর দপ্তরে একজন প্রিন্সিপ্যাল অফিসারকে ম্যানেজার করা ঠিক হবে কিনা ? হেড অফিসের একজন নির্বাহী যিনি আমাকে বেশ ভাল বাসতেন , তিনি আমাকে বলেছিলেন যে , সে সময়ে প্রধান নির্বাহীর চেম্বারে আমিও বসা ছিলাম। পার্সোনেল ডিভিশনের প্রধান নাকি বার বার বলছিলেন যে , স্যার ! সে তো সবেমাত্র একজন প্রিন্সিপ্যাল অফিসার। কয়েকবার বলার পরে সরকার সাহেব বলেছিলেন , সেটা তো আমি শুনলাম। পদবী দিয়ে কী করবেন ? সেখানে তো একজন এভিপি ছিল , তাকে তো উইথড্র করতে হলো। যা হোক এ কাহিনী আরেকদিন বলা যাবে।
 
শাখায় জয়েন করে দেখি , যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম , এখন তেমন আর নেই। লোক জনের আনাগোনা খুবই কম। বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগ এমনিতেই এখানে কম , তার উপর ওভারডিউতে ভারাক্রান্ত। শাখা বেশ লোকসানে চলছে। একটা জটিল সমস্যা ছিল জনৈক গ্রাহকের বিরুদ্ধে ব্যাংক ফৌজদারী মামলা করেছে এবং তিনিও পাল্টা মামলা করেছেন ব্যাংকের অফিসারদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি বরিশালে বেশ আলোচিত-সমালোচিত ছিল। প্রথমবার মোরাবাহা বিনিয়োগের জন্য মালামাল ক্রয় করতে গ্রাহক এবং ব্যাংকের প্রতিনিধি একত্রে ঢাকা গিয়েছিল এবং ব্যাংকের দুই লক্ষ টাকা ছিনতাই হয়েছিল। ব্যাংকের প্রতিনিধির সন্দেহ ছিল এটির সাথে গ্রাহকের যোগ সাজস ছিল যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রমান ছিল না। এর পরে নতুন বিনিয়োগের জন্য গ্রাহক আবার আবেদন করেন। লিমিটের মধ্যে থাকলেও সে টাকা দিতে ব্যাংক অনেক গড়িমসি করেছে এবং আবেদনের অনেক পরে ডিসবার্সমেন্ট হয়েছিল। এককথায় লেবু তিতা হয়ে গিয়েছিল অর্থাৎ ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। মালামাল ক্রয় করে ফেরার পথে লঞ্চ থেকে মালামাল আবার গায়েব হয়ে গেল। এখন গ্রাহকের বক্তব্য যে , মালামাল তো ব্যাংকের প্রতিনিধির জিম্মায় ছিল ; আমি কি জানি। অন্যদিকে ব্যাংকের প্রতিনিধি একজন গোডাউন গার্ড জানে যে, মালামাল তো গ্রাহকের তত্বাবধানেই লঞ্চে তোলা হয়েছে। ষ্টেশনে গেলেই মালামাল লঞ্চ থেকে ব্যাংকের জিম্মায় নেয়া হবে। অবশেষে গ্রাহকের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা মালামাল অপহরণের দায়ে। গ্রাহক মামলা করেছে ব্যাংকের প্রতিনিধি তার অনুকুলে প্রদত্ত বিনিয়োগের মালামাল অপহরণ করেছে। সুতরাং এই টাকার দায়দায়িত্ব তার নয়। ব্যাংকের গোডাউন গার্ড বলির পাঠা হলো ; তার চাকরি চলে গেল।
আমি পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলাম। কয়েকজন গ্রাহকের সাথে কথা বার্তা বললাম। মাঠ যেহেতু আমার আগেই পরিচিত , তাই সহজেই বুঝতে পারলাম। বরিশালের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমে দীন জামে কসাই মসজিদের খতীব মরহুম মাওলানা বশীরউল্লাহ আতহারী (রহ) আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। মাসে একবার তার সাথে দেখা না করলে আমারও ভাল লাগতো না ;তিনিও বলতেন ,আপনি আমাকে ভুলে গেছেন। তিনি এ বিষয়ে আমাকে সংবাদ দিলেন। বললেন , ‘ব্যবসায়ী ছেলেটি একেবারে খারাপ নয় ; সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে সম্পর্কের কারনে। পূর্বের ম্যানেজার সাহেবের আচরণটা সুন্দর ছিল না। বিশেষ করে একজন ব্যবসায়ীর প্রয়োজনটা উপলব্ধি করতে চাইতেন না বা পারতেন না। ব্যাংকের তাবৎ গ্রাহকেরা এখন বিরক্ত। ইসলামী ব্যাংকের এরকম হতাশাজনক অবস্থা আমাদের জন্য বেশ বেদনাদায়ক। এখানকার কয়েকজন ব্যবসায়ী যারা ব্যাংকের হিতাকাংখী, আমার কাছে এসেছিল। তারা আপনার মাধ্যমে বিষয়টির একটা নিস্পত্তির আশা করছে।’ বললাম , ‘পানি বেশি ঘোলা হয়ে গেছে হুজুর। তার পরেও আমি চেষ্টা করবো একটা আপোষ নিস্পত্তি কিভাবে করা যায়। ব্যাংকের কাজ না মামলা মোকদ্দমা করা ; আর ব্যবসায়ীদের কাজও নিশ্চয়ই মামলা করা নয়। বিষয়টি অনেকটাই প্রধান কার্যালয়ের কাছে চলে গেছে , আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কথা বলে আপনাকে জানাবো।’

 

প্রথমেই আইন বিভাগে কথা বললাম , যতদূর মনে পড়ে তখন শওকত আলী ভাই আইন বিভাগের দায়িত্বে। তিনি বললেন , ‘আপনি কামাল উদ্দিন চৌধুরীর সাথে কথা বলেন। ’ উল্লেখ্য যে , তখন জনাব চৌধুরী আন্তর্জাতিক বিভাগের সাথে বিনিয়োগ বিভাগেরও দায়িত্বে ছিলেন। এখানেই আমার হেড অফিসে তিন বছর কাজ করার বিষয়টি কাজে লাগলো। যেহেতু আমি তার সাথে তিন বছর কাজ করেছি , তিনি আমাকে জানতেন এবং আমিও কিছুটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে তার সাথে কথা বললাম। তিনি আমাকে কিছু গাইড লাইন দিলেন এবং বললেন ‘মাথা ঠান্ডা আছে তোমার ; বুঝে শুনে ব্যাংকের স্বার্থ এবং সম্মান বজায় রেখে পারলে মীমাংসা করে নাও। ’ এর পরে হুজুরের রূমে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক , এলাকার গন্যমান্য ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসলাম। আমি ব্যাংকের শর্তগুলো বললাম এবং বললাম ব্যাংকের এগুলো শর্ত হলেও প্রস্তাব দিতে হবে গ্রাহককে। হুবহু এই শর্তগুলো মেনে নিয়ে আপোষ প্রস্তাব দিলে আমরা বিবেচনা করে দেখবো এবং তা আমি সুপারিশ করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠাবো এবং তারা অনুমোদন করলেই বিষয়টি নিস্পত্তি হতে পারে। আমি শুধু আপনাদের নিশ্চয়তা দিতে পারি , আপনার ব্যবসায়ে আমার আন্তরিক ও নিরবিচ্ছিন্ন সাপোর্ট পাবেন , যদি আপনি ওয়াদা ঠিক রাখেন। সেই আপোষ ফর্মুলার প্রস্তাব সম্বলিত কাগজের একটি কপি উপস্থিত সদস্যদের স্বাক্ষরসহ আজও আমার ফাইলে সংরক্ষিত আছে। কামাল উদ্দিন চৌধুরী সাহেব আমাকে বার বার জিজ্ঞেস করেছিলেন , ‘ওরা আন্তরিক আছে তো ? তুমি সামলাতে পারবে তো ? আমি চাই না তুমি কোনো ঝামেলায় পড়।’ বললাম , স্যার ! সমস্যাটির সমাধান না হলে এখানে ব্যাংকিং করারই পরিবেশ তৈরী করা যাবে না।’

 

গ্রাহকের প্রস্তাবনা অনুমোদনের জন্য হেড অফিসে পাঠালাম। চার দফা প্রস্তাবনা ছিল , ঢাকাতে ছিনতাই হওয়া দুই লক্ষ টাকাসহ সমুদয় টাকার দায় গ্রাহক বহন করবেন এবং তিন বছরের মধ্যে পরিশোধ করবেন মাসিক কিস্তিতে। দুই লক্ষ টাকার মালামাল যেহেতু কেনা যায়নি ,তাই সে টাকার উপর কোনো প্রফিট চার্জ হবে না ।নতুন করে তাকে চার লক্ষ টাকার বিনিয়োগ সুবিধা দেয়া হবে। ব্যাংকের মনোনীত উকিলের মাধ্যমে মামলা তুলে নেয়া হবে এবং যাবতীয় খরচা গ্রাহক বহন করবেন। এই প্রস্তাবনার সাথে আমি অতিরিক্ত যোগ করে দিলাম , চাকরিচ্যুত গোডাউন গার্ড আবুল কালামের চাকরি পূনর্বহাল করার। কামাল উদ্দিন চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন , কেন তার চাকরি পূনর্বহাল করতে হবে ? বললাম , স্যার! গোটা বিষয়টিই তো গ্রাহকের সৃষ্ট। ওর চাকরিটা না থাকলে একটি পরিবার ভীষন ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু ওনাকে রাজী করানো কি চাট্টিখানি কথা ! সে ডায়লগ গুলো আমার এখনও মনে আছে। ওনি বলছিলেন , ওর নিশ্চয়ই যোগসাজশ আছে , না হলে ব্যাংকের মালামাল গ্রাহক নিল কিভাবে ? যোগসাজশ না থাকলে তার গাফলতি আছে। বললাম , স্যার ! ওর যোগসাজশ নেই তবে গাফলতি থাকতে পারে। আসলে ওই গ্রাহকের সাথে পেরে ওঠার মত ও ছিল না। এখানে ব্যাংকের কিছু ভুল ছিল। মালামাল কিনতে ব্যাংকের ক্রয় প্রতিনিধি করা উচিত ছিল একজন অফিসারকে , গোডাউন গার্ডকে পাঠানোই তো ঠিক হয়নি। হেসে দিলেন তিনি। বললেন , তুমি গ্রাহকের পক্ষে কথা বলছো ? বললাম , না স্যার ! সত্যটা তুলে ধরছি। বললেন , তুমি একমত যে ওর কোনো ম্যালাফাইডি ইনটেনশান ছিল না ? বললাম , জ্বি স্যার। ‘আর ইউ শিওর ?’ ‘ইয়েস স্যার’- আমার জবাব। বললাম , সেই গ্রাহকের সাথে যখন আমরা ব্যবসা করছি , তখন ওর চাকরি যাওয়া উচিত না। তিনি শেষ পর্যন্ত আমার যুক্তি মেনে নিলেন এবং তাকে পূনর্বহাল করলেন। ছেলেটি পরে প্রমোশন পেয়ে অফিসার পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। এরপর ব্যাংকের কি কাজে ঢাকা আসার পথে হঠাৎই হার্ট এ্যাটাক করে মারা গেল। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন। আমার সাথেই সে প্রায় পাঁচ বছর বরিশালে ছিল। খুবই পরিশ্রমী ও আন্তরিক ছিল সে তার কাজে।

 

এভাবেই একটা জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। ব্যাংকের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি ফিরে এলো। আলহামদুলিল্লাহ ! আমি যখন দায়িত্ব হস্তান্তর করে যাই , তখন শাখার পজিশানটা অনেক ভাল । আসলে সমস্যা সবটাই মামলা করে সমাধান করা যায় না। প্রয়োজনে মামলা করা লাগে হয়তো ; কিন্তু ওভারডিউ হলেই মামলা করা আমার মনে হয় কোনো সমাধান নয়। কোর্টের বাইরে ,সামাজিক চাপ ও নৈতিক চাপ প্রয়োগ করেই ব্যাংকারদের সমস্যার সমাধান করতে উৎসাহী হওয়া উচিত।

 

লেখকঃ সাবেক ডেপুটি ম‍্যানেজিং ডিরেক্টর , ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড 
আরও পড়ুন