পেশায় ভালো ক্যারিয়ার গড়তে হলে

জামান শামস 

সমাজের সার্বিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করলে প্রতিভাবান অনেক ফুটন্ত গোলাপ অঙ্কুরেই ঝরে যেতে দেখা যায়। যথেষ্ট মেধা এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে এখনকার তরুন-তরুণীরা অনেকেই আশানুরুপ ক্যারিয়ার গড়তে পারেন না। ব্যাংকিং ক্যারিয়ার তো আরো জটিল, সমস্যা সংকুল এবং তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ। অভিজ্ঞতার আলোকে ক্যারিয়ারের বিষয়ে  কয়েকটি কথা বলা জরুরী মনে করছি।

১. নিজের  প্রতিভা এবং দক্ষতা শনাক্তকরন

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেকে নিজের মেধা এবং দক্ষতা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে উপনীত হয়। বস্তুত, নিজের উপর যথেষ্ট অনাস্থা থেকেই এ ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্মপর্যালোচনা (Self-evaluation) এবং তার উপর ভিত্তি করে নিজের অবস্থান (Positioning yourself) নির্ধারণ করা, নিজের দক্ষতা এবং পারদর্শিতা শনাক্ত করা। বড় হবার স্বপ্ন থাকবে তবে অপরিপক্ক স্বপ্ন কিংবা কল্পনা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। 

২. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রণয়ন

নিজের অবস্থান নির্ধারণ এবং ক্যারিয়ার গঠনের পথ উদ্ভাবন করার পর, একজনের পরবর্তী কাজ হল জীবনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য প্রণয়ন করা। আপনি ত্রিশ বছরে কোথায় পৌঁছাতে চান, আপনি কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে চান? যেমন একজন লোকের তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহ এবং কিছুটা পারদর্শিতা আছে। বলে রাখি এর মানে এই নয় যে আপনি ঐ বিষয়েই আপনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবেন।

৩. স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ 

লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করার পরের ধাপ স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। ধোঁয়াশাচ্ছন্ন নয়, পরিকল্পনা হতে হবে সুনির্দিষ্ট, যথাযথ এবং অর্থবোধক; ক্যারিয়ার গঠনের পথ পরিক্রমার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এ ধাপে অন্তর্ভুক্ত থাকবে কি করতে চাই, কিভাবে করতে চাই, কখন করতে চাই, আগামী পাঁচ বছর বা দশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চাই ইত্যাদি? বহু জুনিয়রকে দেখেছি এখানে এসে দম হারিয়ে ফেলে। বলে,স্যার আমি পরিকল্পনা করে ফায়দা কি ? হেড অফিস তো আমাকে চিনেই না।

৪. শিক্ষা অর্জন ও মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার

সাবলীল ক্যারিয়ার গঠনে শিক্ষার বিকল্প নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় এবং দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও পরিপূর্ণ শিক্ষার অভাবে অনেকেই সে দক্ষতা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপশি প্রয়োজন প্রচুর ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণ করা। নিজেকে মেধাহীন কিংবা অন্যদের চেয়ে কম মেধাবী মনে করলে চলবে না, বরং যতটা সম্ভব লেখাপড়া করতে হবে নিঃসংকোচে। ব্যাংকিং নিয়মাচার, হাল নাগাদ সার্কুলার, বিবিধ ম্যানুয়েল ব্যংকারের মুখস্থ থাকা বাঞ্ছনীয়। 

৫. সময়ের যথাযথ ব্যবহার

সময়ের গুরুত্ব সর্বসময়েই অনস্বীকার্য। তবে ক্যারিয়ারে সময় অন্যরকম গুরুত্ব বহন করে। বস্তুত, এখানে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে অপারগ হলে, না পাওয়ার বেদনায় বাকি জীবনটা হতাশাগ্রস্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। যেসব প্রিপারেশান জুনিয়র স্টেজে সম্ভব সেগুলো বিলম্বিত হলে পরে দায়িত্বের ভারবহতার কারণেই আর সম্ভব হয়ে উঠেনা। আমি নিজেই এর প্রমাণ। প্রবেশনার থাকাকালেই আমার সংগীরা প্রায় সকলেই ডিপ্লোমা কমপ্লিট করেছে কিন্ত আমার তখনো হয়নি,পরেও হয়নি।

৬. অগ্রাধিকার নির্ধারন

সময়ের সাথে অগ্রাধিকার বিষয়টিও বেশ গুরুত্বের দাবী রাখে। সময় এবং অগ্রাধিকার নির্বাচন বিষয় দুটি একে অপরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করতে পারার ভিত্তিটাই হলো অগ্রাধিকার নির্বাচন করা। নবীশরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে সঠিক সময়ে সঠিক কাজ কিংবা সময়ের কাজ সময়ে করা কারো কারো পক্ষে কখনও কখনও সম্ভবপর হয় না। স্থান, কাল এবং পাত্রভেদে অগ্রাধিকার ভিন্নতর হতে পারে।

৭.ম্যানেজমেন্ট ডিজায়ার বিবেচনা করা

সফলতা লাভে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার সাথে সাথে “ম্যানেজম্যান্ট আমাকে নিয়ে কি ভাবছে, তাদের প্রত্যাশা আমার কাছে কি” তার প্রতি লক্ষ্য রাখাটাও অত্যন্ত জরুরী। সমকালীন প্রচলিত ধারাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে ক্ষেত্র বিশেষে চলমান ধারার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারাটাও বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে। সফল ক্যারিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে হলেও নীতির বিষয়ে আপোসরফা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

৮. হতাশাগ্রস্ত না হওয়া

যথেষ্ট মেধা এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও গৌরবময় ক্যারিয়ার গঠনের কোন নিশ্চয়তা নেই। সেক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থা মেনে নিয়ে আরও চেষ্টা সাধনা করাটাই অধিকতর যৌক্তিক। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটা খুবই প্রাসঙ্গিক। জীবনের যে কোন পর্যায়ে হতাশ হওয়ার কোন সুযোগ নেই, চাই সেটা ছাত্রজীবনই হোক কিংবা পেশাগত জীবন। হতাশা থেকে মানুষের মধ্যে আস্তে আস্তে নিজের উপর অনাস্থা বৃদ্ধি পেতে থাকে, স্বীয় মেধা এবং পারদর্শিতা নিয়ে নিজের মধ্যেই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

৯. অনৈতিক লোভ লালসা থেকে দূরে থাকা

অপরাধের উৎপত্তির কথা চিন্তা করলে আমরা প্রধানত যেসব কারণ দেখতে পাই, এর মধ্যে ‘লোভ’ অন্যতম। সীমাহীন লোভ-লালসা মানুষকে তার সামর্থ্যের বাইরে ঠেলে দেয়। তার বিবেক-বুদ্ধি লোপ করে তাকে দুর্নীতি ও অপরাধের পথে পরিচালিত করে। অনেক ভালো ব্যাংকারও দেখেছি লোভের কবলে পড়ে অকালে ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আপনার হাজারো ভালো গুণ থাকলেও কোন ফায়দা নেই যদি লোভ সম্বরণ করতে না পারেন। 

১০.সব সময় আল্লাহর  উপর নির্ভরশীলতা

ব্যাংকিং ব্যবসা সব সময় অতিরিক্ত ঝুঁকি বহন করে। যে কোন সময় বিপদে পড়ে যেতে পারেন। তাই প্রতিদিন কাজে বেরুনোর আগে দু’রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করুন। নিয়ম-কানুন, মানুষের চিন্তা-চেতনা কিংবা আশা-আকাঙ্খার মধ্যে অনেক সময় বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যায়। ফলে অনেকেই নিয়তি  কিংবা প্রকৃতিকে দোষারোপ করে থাকেন। এটা ঠিক নয়।

সব সময় সব প্রাপ্তি সুফল নাও দিতে পারে, বিশ্বাস করুন, আমি আমার দিকে তাকিয়েই বলছি। আমার ভালো সবচেয়ে বেশী আমার রবেরই জানা।

লেখকঃ প্রাক্তন ব্যাংকার, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট 

আরও পড়ুন