মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার অন্তরায়সমুহ

মহীয়সীর কলাম

হোসনে আরা মেঘনা

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। কবির ভাষায় বলতে গেলে —
” বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”।
অতএব, দেশ তথা জাতির উন্নয়নে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা অগ্রগামী ভুমিকা পালন করে।
কিন্তু মেয়েরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়। সর্বপ্রথম বাধা আসে পরিবার থেকে। সরকার নারী পুরুষের সমান অধিকার দিলেও সামাজিক পরিবেশ সমান অধিকার দেয়নি। মেয়েরা লিখা-পড়া শিখে চাকরি করলে বিয়ের পর স্বামীর বাড়ির লোকজনকে খাওয়াবে —- এমন মানসিকতা থেকে উচ্চ শিক্ষায় পরিবার হতে বাধা আসে। এছাড়া উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে গেলে মেয়ে অনেক বয়সী হয়ে যায়। তখন তার বয়সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিয়ের বর খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। এচাড়া বড় মেয়েদের সমাজে অনেক দূর্নাম -কলঙ্কের ভয় থাকে, বড় হলে চেহারার লাবণ্য কমে যায়। এটা বিয়েতে প্রভাব পড়ে। তাই পরিবার থেকেই প্রথম উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে বাধা আসে।
এছাড়াও আরও অনেক কারণ আছে। সেগুলো হলো : ——
১. জেন্ডার বৈষম্য :
সমাজে নারী পুরুষের বৈষম্য নীতি মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার একটি বড় অন্তরায়। একটি পরিবারে ছেলেকে বড় মাছের মাথাটা, মুরগির রান, কলিজা আর মেয়েকে মাছের লেজ, মুরগির গলা আর পাখার হাড় দেয়া হয়। ছেলেদের উৎসাহভরে উচ্চ শিক্ষা দেওয়া হয় তাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে। আর মেয়েদের যৎতৎ পড়ানো হয় একটা ভাল বিয়ে দেবার জন্য। পরিবার তথা সমাজে এমন একচোখা রীতি মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার একটি বড় অন্তরায়।

২. অর্থনৈতিক অবস্থা :
পিতা-মাতার অর্থনৈতিক অবস্থা যদি খারাপ হয় তবে মেয়েকে লিখা-পড়া করানোর পরিবর্তে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ তাঁরা মনে করেন মেয়ে লিখা-পড়া করে চাকরী পেলে পরের ঘরে চলে যাবে। তাদের কোন উপকারেই আসবেনা। তাই সংসারের হাল ধরবে বলে ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে। এমন চিন্তা চেতনা মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার অন্তরায়।

৩.অধিক বয়স :
উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে গেলে মেয়েদের বয়স কুড়ি বছর পার হয়ে যায়। লোকে তখন বলে, “এই মেয়েতো কুড়িতেই বুড়ি হয়ে গেছে, একে কে বিয়ে করবে? মোটা অংকের যৌতুক দিলে হয়ত এর বিয়ে হতে পারে।” তখন বাবা মা সামাজিক লজ্জা ও যৌতুকের ভয়ে জোর করে অথবা বুঝিয়ে রাজি করে মেয়ের বিয়ে দেয়। তার উচ্চ শিক্ষা গ্রহন তখন লাঠে উঠে।

৪.পর্দা ও নিরাপত্তাহীনতা :
উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে গিয়ে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে পর্দাপ্রথা বাধাগ্রস্ত হয়। আবার অনেক মেয়েরা নিজেকে স্মার্ট প্রমান করার জন্য ইচ্ছে করেই ছোট -খাটো পোষাক পরে বে-আব্রুভাবে চলাফেরা করে। এ সকল কারণে নানা দূর্ঘটনার স্বীকার হয় কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রীরা।
আজকাল আবার সমাজে বখাটে ছেলেদের উপদ্রব এতই বেড়েছে যে, দিনে দুপুরেও মেয়েদের শ্লীলতাহানি করছে ও ইভটিজিং এর মত অপরাধ সমাজকে উপহার দিচ্ছে। এ সকল কারণে অভিভাবকেরা মেয়েদেরকে উচ্চ শিক্ষার জন্য বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছে।

৫.বৈবাহিক কারণ:
যে সকল মেয়েরা এস,এস,সি, অথবা এইচ,এস,সি, পাস করে বিয়ে হয় স্বামীর বাড়ি থেকে তাদের লিখা-পড়া করতে বাধা দেওয়া হয়। কারণ, স্বামীরা মনে করে — এ মেয়ে আরও বেশি লেখা পড়া করে তার যোগ্যতাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং চাকরী পেলে তাকে আর মানবে না। এমন মানসিকতা থেকে ঐ মেয়েকে আর পড়তে দেওয়া হয়না।

৬.স্বামীর পারিবারিক বাধা :
কপালগুণে ভাল স্বামী পেলেও দেখা যায় তার পরিবারের শ্বাশুড়ি, ননদ, জা, শ্বশুর, দেবররা বলে — বিয়ে হয়েছে সংসার করবে, সন্তান লালন করবে, বাড়ির কাজকর্ম করবে, সকলের সেবাযত্ন করবে —- বউয়ের আবার লিখাপড়া করে কাজ কী বাপু ?
ঐ বউটির তখন উচ্চ শিক্ষা নামক স্বপ্নের পাখিটি উড়াল দেয় খাঁচা ভেঙ্গে।

৭.সরকারী সুযোগের অধিকার হতে বঞ্চিত :
মেয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারী সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত হয়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের নিবাস সংখ্যা বেশি থাকে। আবার শিক্ষার্থীদের জন্য যে বাস সার্ভিস চালু থাকে তাতে ছাত্রদের আধিপত্যই বেশি থাকে। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের খেলার মাঠ, সহপাঠ্যক্রমিক, চিত্ত বিনোদনমূলক এবং খেলাধুলার সরঞ্জামাদি কম থাকে। এতে মেয়েদের সার্বিক শিক্ষা ব্যহত হয়।
লাইব্রেরীতে যথেষ্ট বই না থাকায় মেয়েদের প্রাইভেট পড়তে হয়। এতে তারা অনেক বিভ্রান্তি ও বিরুপ পরিস্থিতির শিকার হয়।

৮.শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের নিরাপদ পরিবেশের অপ্রতুলতা :
অধিকাংশ হাইস্কুল, কলেজগুলোতে ছাত্রীদের জন্য যথেষ্ট ওয়াশরুম, বিশ্রামাগার, কমনরুম না থাকায় ছাত্রীরা নিরাপত্তাহীণতায় ভোগে এবং ছাত্রদের দ্বারা ছাত্রীদের শ্লীলতাহানি ঘটে।
এ সকল সমস্যার কারণে পিছিয়ে পড়া, মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার হতে মেয়েদের লিখা-পড়া ব্যহত হয়।

পরিশেষে বলতে পারি, বাংলাদেশ সরকার মেয়েদের শিক্ষার যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা করে দেওয়ার পরও জেন্ডার বৈষম্য, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার কারণে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।
এ সকল বাধা হতে উত্তোরণের জন্য সমাজের সকল প্রকারের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই আমরা নেপোলিয়ন বোনাপোর্টের ” তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো ” —— এই বাক্যটিকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হবো এবং মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার অন্তরায়সমুহ ডিঙ্গাতে পারবো ইনশাল্লাহ!

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং অ্যাডমিন, মহীয়সী প্যানেল

আরও পড়ুন