শ্রমিকের অধিকার, ইসলাম ও বাংলাদেশের নাস্তিকতা

আরেফিন আল ইমরান

১) কার্ল, মার্কস, রবার্ট ওয়েন বা সাঁ সিমোঁদের মত দার্শনিকদের অনেক আগে শ্রমিক অধিকার নিয়ে মহানবী (সাঃ) শক্ত অবস্থান গ্রহন করেছিলেন। মানব ইতিহাসে এ বিষয়ে তাঁর চেয়ে সোচ্চার ব্যক্তিত্বের নজির পাওয়া কঠিন। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনদের আগমন অনেক পরে। শুধু মুখের বচন নয়, নবীজী (সাঃ) এর জীবন ও চরিত্রেও ছিল মেহনতি মানুষের প্রতি অগাধ ভালবাসা। বহুবার তিনি সেসবের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যদিও নাস্তিককূলের চোখে এগুলো কোনোদিনই ধরা পড়বেনা। জড়বিদ্যার টিনের চশমায় পৃথিবীকে তারা বিজ্ঞানময় দেখে। পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে বার্ট্রান্ড রাসেল, রিচার্ড ডকিন্স কিংবা স্টিফেন হকিন্সে তারা কোনো ত্রুটি খুঁজে পায়না। বহুকাল আগেই পচে যাওয়া অরিজিন অফ স্পিসিজ আর ডারউইনের ত্রুটিময় উপাখ্যানসমূহ তাদের কাছে অমূলক মনে হয়না। অন্তরাত্মা অন্ধ হলে, শেষতক এইই হয়।শিল্প বিপ্লব, শ্রমিকদের জন্য আইন-কানুন― এইসব তো বেশিদিন আগের কথা নয়। একটা মানুষ বাইবেল আর ওল্ড টেস্টামেন্ট কপি করে কিভাবে অটোমেটিক্যালি একটা স্বতন্ত্র্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করতে পারেন― এটা লজিক্যালি ভাবার মত প্রজ্ঞা তাদের নেই। তারা পড়ে আছে নবীজী (সাঃ) কেন ১৪টি বিয়ে করলেন, কেন আয়েশা (রাঃ) এর মত পুতুল খেলা বালিকাকে স্ত্রী করলেন―এইসব নিয়ে। আরজ আলীর মত ইললিটারেট নাস্তিক আর প্রচুর পড়াশোনা করা ….. মধ্যে এজন্য কোনো গুণগত পার্থক্য নেই।  সর্ব সাকুল্যে বাংলার নাস্তিক সমাজ গোটা বিশ-তিরিশেক প্রশ্নের বাইরে নতুন কিছুই আমদানী করতে পারেনি।

২) এসবের মূলটা আবার লুকিয়ে আছে আল্লাহতায়ালাকে কেন দেখা যায়না টাইপ― প্রিমিটিভ লেভেলের বালখিল্যতায়। এরা আল্লাহতায়ালাকে মানবীয় আবেগ ও দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বুঝতে চায়। নাহলে মানুষের জন্ম হয়, মানুষের পিতা-মাতা আছে; তবে আল্লাহতায়ালার কেন নেই ? বা তাঁকে কে সৃষ্টি করল, এইসব অবান্তর প্রশ্ন নিয়ে― এরা আজো পড়ে আছে। কুরআন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে একটা আয়াত নিয়ে কিংবা হাদিস শাস্ত্রের সনদ, মতন, ইসনাদ, রেওয়াত সম্পর্কে কিছুই না জেনে, আকস্মিকভাবে একটা হাদিস নিয়ে তারা বসে যাবে ইসলাম কপচাতে। ইসলামিক জ্ঞান ও চিন্তার যে ঐতিহাসিক পরম্পরা ও একটা ডিসেন্ট একাডেমিক প্রসেস আছে, এটা তারা কখনোই বুঝতে চায়না। বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে গেলে হিসেব করেই বলে। কিন্তু যেই ইসলামের প্রসঙ্গ আসবে অমনি রেফারেন্সবিহীন ও কনটেক্সটবিহীন আক্রমণ শুরু করবে। যেমন তারা বলে―কুরআনে তো বলাই হইছে নারীরা হইল শস্যক্ষেত্র….এইরকম প্রসঙ্গবিহীন উদ্ধৃতি দিয়ে খুব মজা নেয়ার চেষ্টা করবে। যেন এরচেয়ে খারাপ কথা― সে জিন্দেগীতেও শোনেনি বা দেখেনি। না আগের আয়াত পড়বে। না পরের আয়াত পড়বে। আর না তাফসীর পড়ে, শানে নুজুল পড়ার চেষ্টা করবে। নবীজী (সাঃ) বা সাহাবীগণ― এই আয়াতের কী ইন্টারপ্রিটেশান দিয়েছেন অথবা তাদের বাস্তব জীবনে ঐসব আয়াতকে কিভাবে জীবন ও কর্মে প্রয়োগ করেছেন― সেটা বোঝার মত মানসিক ঔদার্য তাদের মাঝে কোনোদিনই দেখা যায়না। যেন সব একাডেমিক ডিসিপ্লিন কেবল জড়বিজ্ঞানের জন্য আলাদাভাবে সংরক্ষিত।

৩) তাদের ভাষ্যমতে― ইসলাম হল নবীজী (সাঃ) এর স্ব উদ্ভাবিত একটা ধর্ম, যা ওল্ড টেস্টামেন্ট, বাইবেল ও প্যাগানিজমের সমন্বয়ে গঠিত। যুক্তির খাতিরে যদি মেনেও নিই, তবু এই ত্রিমুখী বিদ্যাকে এক করতে হলে বিরাট পাণ্ডিত্য দরকার। তারপর সেখান থেকে একটা স্বতন্ত্র্য সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়ে, এমন সুসমন্বিত মতাদর্শ দাঁড় করানো― যেটা আবার হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীতে আধিপত্য চালাবে এবং পরবর্তীতে প্র্যাকটিসিং রিলিজিয়ন হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে―এটা কি এতোই সামান্য একটি বিষয় ? ৪০ থেকে ৬৩, এই ২৩ বছরের সময় মাথায় নিয়ে তাঁর ব্যক্তি ও পরিবারজীবনসহ একবার সুস্থভাবে চিন্তা করুন তো― ঠিক কতোটা মেধা ও পরিশ্রম এক জায়গায় হলে, এটা করা সম্ভব হতে পারে ? তাও আবার সেই আরব থেকে যেখানে না ছিল প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া আর না কোনো সুসহংত জ্ঞানচর্চা। এটা কি মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নাকি, সত্যিই এর পেছনে ঐশী প্রত্যাদেশের অমোঘ শক্তি বিদ্যমান―তা কি আমাদের দেশের নাস্তিক সমাজ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করেছেন ?

৪) আমি জানি, নাস্তিকতা একটা ডাইন্যামিক সাবজেক্ট। এর প্রকারভেদ ও ব্যাপকতা নিয়ে জীবনভর স্টাডি করা সম্ভব। তুলনামূলকভাবে আমাদের দেশের নাস্তিকতা অত্যন্ত সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ। গোঁড়া কাঠমোল্লা আর আমাদের নাস্তিক সমাজ― বেসিক্যালি দুটোই কট্টোর ও কূপমণ্ডূক। নিজের গন্ডির বাইরে এরা আর কিছু দেখেনা। বহির্বিশ্বের নাস্তিকতা কিন্তু অনেক ডাইন্যামিক। নোংরামি বা আক্রমণাত্মক মানসিকতা ওদেরও আছে। তবে তারপরও ওরা পড়াশোনা করে। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, নাস্তিক হোক বা আস্তিক; চাইলে যেকোনো মতাদর্শ বা ধর্মেরই খুঁত বের করে যুক্তি-তর্ক চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। মানুষের আর সব বিদ্যার মত নাস্তিকতাও এজন্য থেমে থাকবেনা। ধর্মকে আক্রমণ করবার জন্য সে নিত্য-নতুন থিওরি হাজির করবে। তবে এটাকে নেগেটিভলি ডিল করার কিছু নেই। কারণ, আল্লাহতায়ালাও ইসলাম এবং তাঁর ঐশী প্রত্যাদেশ কুরআনের মাঝে এগুলোকে মোকাবেলার অপরিসীম শক্তি দিয়ে রেখেছেন। আপনি সিস্টেম্যাটিক প্রসেসে কুরআনের গহীনে অনুপ্রবেশ করুন। তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, তৎকালীন অর্থ, পরম্পরাগত সাযুজ্য, প্রায়োগিক ব্যবহারবিধি একদম গোড়া থেকে যোগ্য আলেমদের তত্বাবধানে তালিম নিতে থাকুন, দেখবেন সাম্প্রতিক সময়ের চ্যালেঞ্জগুলোও আপনার কাছে পরিষ্কার হতে থাকবে। এটাই আল কুরআনের কালোত্তীর্ণ ও অপরাজেয় শক্তি। তবে এর জন্য অপরিসীম ধৈর্য ও স্পিরিচুয়াল ইনোসেন্স দরকার, যেটা প্রাথমিক অবস্থায় অত্যন্ত কঠিন। তবে লেগে থাকলে অবশ্যই সম্ভব।

৫) বাংলাদেশে ঐ মানের ইসলামিক স্কলার নেই বলে যে, পৃথিবীতেও কেউ নেই—এরকমটা ভাবার কোনো কারণ নাই। শেষ করার আগে নবীজী (সাঃ) এর শ্রমিকের মর্যাদা বিষয়ক কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করছি। শুধু এটা জানবেন যে, এই হাদিসের কথাগুলোই যদি কার্ল মার্কস, লেনিন, ট্রটস্কি, বারট্রান্ড রাসেল, জাঁ পল সার্ত্রে বা মিশেল ফুকোরা বলতেন―তো দেখতেন নাস্তিক সমাজের আস্ফালন !! এরা কনফুসিয়াস, প্লেটো, এরিস্টটল সবার মাঝেই মাহাত্ম্য খুঁজে পায়, কেবল নবীজী (সাঃ) এর মাঝেই কিছু পায়না। এরচেয়ে সেলুকাস কিছু দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া বড্ড কঠিন !! যাই হোক, হাদিসে আসা যাক―

১) শ্রমিকের মজুরি যথাসময়ে পরিশোধ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মজুরকে তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি পরিশোধ করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ)

২) মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মজুরদের সাধ্যের অতীত কোনো কাজ করতে তাদের বাধ্য করবে না। অগত্যা যদি তা করাতে হয় তবে নিজে সাহায্য কর।’ (বুখারি) ৩) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘মহান আল্লাহ বলেন, ক্বিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। তাদের মধ্যে একজন হ’ল- وَ رَجُلٌ أسْتَأْجَرَ أَجِيْرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ- ‘যে শ্রমিকের নিকট থেকে পূর্ণ শ্রম গ্রহণ করে অথচ তার পূর্ণ মজুরী প্রদান করে না’।বুখারী, মিশকাত হাদিস নং-২৯৮৪। ৪) মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কারো জন্য স্বহস্তের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য আর নেই। আর আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ) স্বহস্তে জীবিকা নির্বাহ করতেন’। বুখারী, মিশকাত হাদিস নং-২৭৫৯

৫) হযরত সা‘দ (রা.) কামারের কাজ করতেন, হাতুড় দিয়ে কাজ করতে করতে তার হাত দু’টি বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। একদিন নবী করীম (সা.)-এর সাথে করমর্দন করার সময় সাদকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, হাতুড় দিয়ে কাজ করতে গিয়ে এ অবস্থা হয়েছে। নবী করীম (সা.) তার হাত চুম্বন করে বললেন, “এ হাতকে কখনো আগুন স্পর্শ করবে না” (সহীহুল বুখারী, পৃ. ৪)।

৬) ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির চেয়ে শ্রমিকদের মর্যাদা অধিক হিসেবে বর্ণনা করেছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ঘোষণা করেন, “ঐ সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমাদের কারও পক্ষে এক গাছা রশি নিয়ে বের হওয়া এবং কার্য সংগ্রহ করে পিঠে বোঝাই করে বয়ে আনা কোনো লোকের কাছে গিয়ে ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম। অথচ সে ব্যক্তি তাকে দান করতেও পারে অথবা তাকে বিমুখও করতে পারে।” (সহীহুল বুখারী, ১ম খন্ড পৃ. ৩২৫; জামি‘উত্-তিরমিযী, ১ম খন্ড পৃ. ১৪৭; সুনানুন্-নাসা’ঈ, ১ম খন্ড পৃ.৩৬২)।

লেখকঃ  সাংবাদিক ও সঙ্গীত পরিচালক

আরও পড়ুন