সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা কি, কেন, কিভাবে?

সুইটি শিলা

‘গবেষণা’ শব্দটিকে আমার কাছে একটি গাম্ভীর্যপূর্ণ শব্দ মনে হয়। শব্দটিতে একটা ভারিক্কী ভাব আছে। গবেষণা কথাটি বললে স্বভাবত মনে হয়, একটা বিশাল বড় ঘর তাতে অসংখ্য যন্ত্রপাতি আর তার মাঝে মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া এক ব্যক্তি বসে কাজ করছে। এরকইম একটি চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অর্থাৎ গবেষণা বলতেই আমরা একটি ল্যাবরেটরীকে বুঝি, বুঝি অসংখ্য পদার্থের সন্নিবেশ, দিনরাত সেসব নিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা।

গবেষণা শব্দটি বাংলা ব্যাকরণ মতে রূঢ়ি শব্দ। অর্থাৎ রূঢ়ি শব্দ বলতে আমরা সেসকল শব্দকেই বুঝি, যেসব শব্দ প্রত্যয় বা উপসর্গযোগে মূল শব্দের অনুগামী না হয়ে অন্য কোনো বিশিষ্ট অর্থ জ্ঞাপন করে। “গবেষণা” তেমনই একটি শব্দ। গো+এষণা=গবেষণা অর্থ গরু খোঁজা, তবে সত্যি সত্যি গবেষণা বলতে কি গরু খোঁজাকেই বোঝায় নাকি? একেবারেই না। এর গভীরতম অর্থ হলো ব্যাপক অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করা।

গবেষণা বিষয়টি আসলে কি? শুধু ল্যাব, বিজ্ঞান এসবই? না, গবেষণার আরো অনেক দিক রয়েছে। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন উপায়ে গবেষণা হতে পারে। বৈজ্ঞানিক উপায়ে পদার্থ, রসায়নে যেমন গবেষণা হয় তেমনি সামাজিক বিজ্ঞানের আওতায় সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও গবেষণা হয়। যেহেতু আমি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী তাই আমি সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা নিয়েই বলতে চাই।

আচ্ছা ধরুন, আপনার গবেষণার বিষয় হলো “বাংলা ভাষায় চর্যাপদের অবদান ” অথবা “বাংলা ভাষায় মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অবদান”। কিংবা ধরুন আপনি গবেষণা করতে চান বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠিদের খাদ্যাভাস নিয়ে, সেক্ষেত্রে আপনি চাকমা সম্প্রদায়কে বেছে নিলেন। একটু খেয়াল করে দেখুন তো এই তিনটি বিষয়ের একটিতেও কি আপনাকে বৈজ্ঞানিক কোন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে? উত্তর হলো ‘না’, চাকমাদের খাদ্যাভাস জানতে হলে আপনাকে চাকমা জাতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে, সে বিষয়ে পড়াশুনা করতে হবে এমনকি আপনাকে তাদের সাথে একইসাথে থাকতে হতে পারে, তাহলে আপনি খুব কাছ থেকেই তাদের সম্পর্কে জানতে পারবেন। এই কাজটি কি একজন বিজ্ঞানের ছাত্রই করতে পারবে? না বিজ্ঞানের বাইরের ছাত্ররাই শুধু পারবে? যদি এই প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হয় তাহলে আমরা বলতে পারি

গবেষণা শুধু ল্যাবরেটরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণা যে কোন মানুষ যে কোন বিষয় নিয়েই করতে পারে।

এবার আসা যাক, গবেষণা বলতে আমরা কি বুঝি সে প্রশ্নের উত্তরে।
কোন তাত্ত্বিক সংজ্ঞায় না গিয়ে সহজ কথায় বলা যায়, নতুন কোন বিষয়, ঘটনা, তথ্য জানার জন্য একটা চেষ্টা হলো গবেষণা, তা হতে পারে বৈজ্ঞানিক উপায়ে, হতে পারে সমাজতাত্ত্বিক উপায়ে। জ্ঞান অনুসন্ধানের অন্যতম আদর্শিত বা মানসম্মত পদ্ধতির প্রয়োগই হলো গবেষণা। গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়া এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে সেই জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠা করা।

সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে আমি স্বাভাবিকভাবেই সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করতে চাই। বৈজ্ঞানিক গবেষণার (পদার্থ, রসায়ন ইত্যাদি) সাথে সামাজিক গবেষণার বেশ কিছু ফারাক রয়েছে। তবে বিজ্ঞান কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের বাইরে গিয়ে সব বিষয়ে পড়াশুনা করা ব্যক্তির ক্ষেত্রে গবেষণার প্রাথমিক পদ্ধতি কিন্তু একই। আপনি সমাজবিজ্ঞানে পড়েন নি বলে যে কোন সামাজিক সমস্যা নিয়ে গবেষণা করতে পারবেন না বিষয়টি তেমন নয়। আপনি যে বিষয়েই পড়াশুনা করুন না কেন আপনার গবেষণার বিষয় নির্ধারণে তার কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারেনা। সাধারণভাবে একজন গবেষককে গবেষণা করতে হলে যেসব বিষয়ে আলোকপাত করতে হয় কিংবা গবেষণার কাঠামোটি সাজাতে হয় সে বিষয়েই এখন বলছি।

গবেষণা করার একদম প্রাথমিক পর্যায়ে যা করতে হয় তা হলো সমস্যা নির্ধারণ। অর্থাৎ আপনাকে ঠিক করতে হবে আপনি কোন বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে চান আর এই বিষয়টিকে বলা হয় “সমস্যার সংজ্ঞায়ন” (Defining the problem)।

আপনি যে বিষয়ে গবেষণা করবেন তার একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা দরকার অর্থাৎ আপনাকে একদম সঠিকভাবে বিষয়টিকে নির্ধারণ করতে হবে।

ধরুণ, আপনি ঠিক করলেন আপনার গবেষণার বিষয় হবে “বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যাঃ প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়”। এই বিষয়টি গবেষণার জন্য যথাযথ বিষয় হলো না। কারণ হলো বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা বলতে আপনি ঠিক কোন বিষয়টিকে বোঝাতে চাইছেন? সামাজিক সমস্যার তো আর শেষ নেই। তাই এমনও হতে পারে যে গবেষণা করতে করতে আপনার জীবন শেষ কিন্তু গবেষণা শেষ হয় নাই। আমি বরং সামাজিক সমস্যাগুলির ধরন বলি, যেমন- দুর্নীতি, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সমস্যা, বাল্যবিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ ইত্যাদি।

এর যেকোন একটি বিষয়কে নির্ধারণ করে গবেষণা করা যেতে পারে। এতে করে যে কোন একটি বিষয়েরই চমৎকার একটি গবেষণা হতে পারে। তাই শুরুতেই সঠিক বিষয় নির্ধারণ হলো একটি গবেষণার অন্যতম প্রাণ।

বিষয় নির্ধারণের পর আপনাকে গবেষণার দ্বিতীয় ধাপে আসতে হবে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো “সাহিত্য পর্যালোচনা” (Literature review) সাহিত্য পর্যালোচনা গবেষণার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনি যে বিষয় নির্ধারণ করেছেন সেটি সম্পর্কে আপনাকে বিশদভাবে পড়তে হবে। এক্ষেত্রে আপনাকে দেখতে হবে, এর আগে আপনার নির্ধারিত বিষয়টিতে কিকি কাজ হয়েছে, এ সম্পর্কিত কিকি বই আছে, কোন জার্নাল আছে কিনা। তারপর আপনাকে সেগুলি পড়তে হবে যাতে করে ঘটনার মুল বিষয়টা জানতে আপনার সুবিধা হয়। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী গবেষণাপত্র গুলোও আপনার পড়াশুনা করে দেখতে হবে। কারণ এটা বলা হয়ে থাকে যে, ” পূর্ববর্তী গবেষণা পরবর্তী গবেষণার দ্বার খোলে”। এই বিষয়টি আপনাকে আরো বিস্তৃতভাবে জানতে সাহায্য করবে।
উদাহরণ হিসেবে বলি, আপনি যদি “আত্নহত্যা ” সম্পর্কিত বিষয়ে গবেষণা করতে চান তবে আপনার অবশ্যই এমিল ডুর্খেইম এর “Suicide” গ্রন্থটি পড়া উচিত বলে আমি মনে করে।

তৃতীয় ধাপে এসে আপনাকে ঠিক করতে হবে আপনি ঠিক কোন পদ্ধতিতে গবেষণা করবেন সে বিষয়ে। এক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই গবেষণার পদ্ধতি গুলো সম্পর্কে জানা থাকতে হবে। সমাজবিজ্ঞানে মূলত পরিমাণগত এবং গুণগত এই দুই পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি গুলো নিয়ে পরবর্তীতে বিশদ আলোচনা করা যেতে পারে।

পরবর্তী ধাপে এসে আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘Hypothesis ‘ বা পূর্বানুমান এর আকার গঠন ও চলক নির্ধারন। এই ধাপে এসে আপনাকে পুরো গবেষণার কাঠামোটাকে নির্ধারন করতে হবে, যাকে বলা হচ্ছে ‘Research Design ‘। এই অংশে থাকবে আপনার গবেষণার ‘পপুলেশন’ বা সমগ্রক এবং ‘sample’ এবং আপনি কোন পদ্ধতিতে sampling করবেন সেটি।

পরের ধাপে এসে আপনাকে ঠিক করতে হবে গবেষণার মূল বিষয় অর্থাৎ গবেষণা পদ্ধতি। যেহেতু আপনি ইতিপূর্বেই গবেষণার বিষয় ঠিক করে নিয়েছেন, সে বিষয়ে সাহিত্য পর্যালোচনাও করেছেন তাই আপনি কোন পদ্ধতিতে গবেষণা করবেন তা ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনি গুণগত বা মানগত পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন, এই পদ্ধতি গুলো নিয়ে আলাদাভাবে অন্য লেখায় পরবর্তীতে আলোচনা করা যাবে।

এর পরের ধাপে আপনাকে যা করতে হবে তাকে বলা হয়া Data collection বা তথ্য সংগ্রহ। তবে তার আগে আপনাকে ঠিক করতে হবে আপনি কোন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করবেন। প্রথমত আপনাকে জরিপ করতে হবে। এই জরিপ আপনি কিভাবে করবেন? কোন পদ্ধতিতে করবেন? ‘ইন্টারভিউ’ এর মাধ্যমে নাকি ‘কোয়েশ্চেনেয়ার’ এর মাধ্যমে। আপনি ‘সার্ভে’ করবেন নাকি ‘ফিল্ড রিসার্চ’ করবেন? এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব বিষয় নির্ধারনের আগে আপনাকে জানতে হবে, কোনটির কি সুবিধা বা কি অসুবিধা এসব সম্পর্কে অবশ্যই ভালো ধারণা রাখতে হবে।

পরবর্তী ধাপে এসে আপনাকে সংগৃহীত তথ্যগুলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে যাকে আমরা বলছি Data Analysis । অর্থাৎ আপনার সংগৃহীত তথ্য গুলোকে সাজাতে হবে, বিশ্লেষণ করতে হবে, এবং বিশ্লেষণ করে আপনি কি পেলেন তা লিখে ফেলতে হবে। অর্থাৎ আপনি এখন আপনার গবেষণার শেষ ধাপে চলে এসেছেন, আর এই শেষ ধাপ Report writing। আপনি তথ্যগুলোকে বিশ্লেষণ করে যে রেজাল্ট পেলেন সেটিই আপনার গবেষণার ফলাফল।

সমাজবিজ্ঞান এর ছাত্রী হিসেবে সমাজবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে, Research project, Research Design, Research Methodology এসব বিষয়ে পড়তে গিয়ে আমি যা জেনেছি বা জানতে পেরেছি তারই ক্ষুদ্র প্রয়াস আমার এই আনাড়ি লেখাটি। নিজের ভাষায় সহজভাবে গবেষণা সম্পর্কে শুধু একটু ধারণা দিতে চেষ্টা করেছি মাত্র। জানিনা এতে করে একটু হলেও কারো উপকার হবে কিনা বা কেউ নতুন কিছু কিংবা ন্যুনতম কিছু শিখতে পারবেন কিনা।

লেখকঃ কলাম লেখক ও সাবেক শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

আরও পড়ুন