কুরবানীর গোশত সমাচার….

মো ইব্রাহীম খলিল

আমার এক পরিচিত বড় ভাই (সোহেল ভাই) মফস্বল শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। কিন্তু আর্থিক দৈন্যতার কারনে কুরবানী তিনি দিতে পারেন না।
একদিন ঐ বড় ভাই কুরবানী প্রসঙ্গে কথা উঠলে দুঃখ করে বলেন, আমি প্রতি কুরবানীর ঈদের পূর্বেই বাজার থেকে ৩/৪কেজি গরুর গোশত কিনে আনি।অথচ আমার চার পাশে সব প্রতিবেশিরা কুরবানী দেয়, ইচ্ছে করলে তারাও তো আমাকে কুরবানীর গোশত থেকে কিছু সৌজন্যমূলক দিতে পারতো। অথচ তারা কুরবানী দেওয়ার পর সবগুলো মাংস ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখে।

শহরের বাসা বাড়িতে সবার তো গেইটই তালা মারা থাকে,যেনো কোনো ফকির মিসকিন বাসায় ঢুকতে না পারে। সোহেল ভাই গত কুরবানীর ঈদের দিন একটা বিষয় দেখে খুব কষ্ট পেলো। উনার প্রতিবেশি চারতলা বিশিষ্ট বাড়িওয়ালা এক লক্ষ বিশ হাজার টাকায় গরু আনেন। ঈদের দিন উনার বাসার সামনে অনেক ফকির এসেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান,কারণ বাসার মূল গেইটে তালা ঝুলানো ছিলো। ঠিক বিকেল বেলা এক ল্যাংরা মুরব্বী ঐ বাড়ির গেইটে চিল্লাইয়া বলতাছে,তাকে যেনো দু তিন টুকরা গোশত দেওয়া হয়, অনেক ডাকা ডাকির পর বাড়িওয়ালা ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে গরুর গোবর মিশ্রত ভুড়ির উচ্ছিষ্ট অংশগুলো ঐ লোকের দিকে ছুড়ে মেরে বলতে লাগলো, এগুলো নিয়া বিদায় হও। সোহেল ভাই ঐ দৃশ্যটি দেখে আর সহ্য করতে পারলেন না, উনি উনার ফ্রিজে রাখা কেনা মাংস থেকে এক কেজির একটা পুটলি লোকটিকে দিয়ে বিদায় করেন। এই হলো আমরা তথাকথিত বর্তমান পয়সাওয়ালাদের কুরবানী।

আমাদের লোকাল অফিসের সামাদ ভাই আগে বংশ পরম্পরায় কুরবানী দিতেন।ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় গত দুই বছর তিনি কুরবানী দিতে পারেন না। অথচ তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ঈদের পরে তো মেয়েরা জামাই নিয়ে বেড়াতে আসবে, তাদেরকে তো মুরগীর গোশত দিয়ে খাওয়ানো যায় না। এমনিতেই গোশতের বাজার খুব চড়া। সামাদ ভাইকে কে যেনো বলল,রেলওয়ে স্টেশনে বিকালে গেলে সেখান থেকে ১০০টাকায় কেজি গরুর গোশত পাওয়া যায়। স্থানীয় ফকির মিসকিনরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করে যে গোশত গুলো সরবরাহ করে,সব গুলো গোশত তো রাখার মতো তাদের ফ্রিজ নেই,তাই তারা প্রয়োজনীয় কিছু গোশত রেখে বাকীটা পথচারী ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেয়।

সামাদ ভাই বিকালে বাজারের একটি ব্যাগ নিয়ে চলে গেলেন রেল স্টেশনে। ঐখানে গিয়ে উনার তো চক্ষু চড়াক গাছ!গিয়ে দেখেন, শহরের নামী দামী হোটেল রেস্টুরেন্ট এর মালিক পক্ষরা সেই ভিক্ষালব্দ গোশতগুলো কম টাকায় কিনে নিচ্ছে। ঈদের পর ঐ হোটেলগুলোতে এই গোশত গুলো চড়া মূল্যে হোটেলে বিক্রি করা হবে।

হোটেল মালিক পক্ষরা সব ফকির থেকে যে যার মতো গোশত নামে মাত্র টাকায় কিনে নিচ্ছিলো। একেক জন আধ মন করে নিয়ে যাচ্ছে। সামাদ ভাই ফকিরদের থেকেও গোশত কেনা থেকে ব্যার্থ হয়ে ঘরে ফিরে এলেন। আমাদের এলাকার লালু কসাই ঈদের দিন কন্টাকে গরু কেটে সাইজ করে দিয়ে আসেন। একদিন লালু কসাইকে বললাম, শহরের বাসা বাড়িতে যে গরু কাটতে যান, তারা ঠিক মত গোশত বন্টন করে তো?

লালু কসাই বলল, শহরের ৮০%লোক নামের কুরবানী দেয়, শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষের ইনসাফ আছে। শহরের লোকেরা তো আমাদেরকেও দেয়না, যে টাকায় কন্টাক করেছে,সেটা দিয়েই বিদায় করে।

আমরা না হয় টাকার বিনিময়ে আসি, কিন্তু কোনো ফকির গেলে গরুর বাদ যত আত্, চর্বি,উচ্ছিষ্ট অংশ আছে, সেগুলো গেইটের ফাক দিয়ে ফকির বিদায় করে।

লালু মিয়া দুঃখ করে বলেন, আমার লাইফে আমি শহরে যত গুলো কুরবানীর গরু কাটতে গিয়েছি,একটাও হালাল কুরবানী দেখলাম না। এরা নামে কুরবানী দিয়ে পুরো গরুটাই ডিপ ফ্রিজে ভরে নেয়।কেউ কেউ তো আত্মীয়দেরকেও দেয় না।

এই হলো আমাদের বর্তমান কুরবানীর সমাজ ব্যবস্থা। অথচ আমরা কুরবানীর বন্টন পদ্ধতি সবাই জানি,কিন্তু মানিনা। সুদ খাওয়া যেমন হারাম,অথচ আমরা সবাই কোনো না কোনো ভাবে সুদের সাথে সম্পৃক্ত। তেমনি কুরবানী গোশত যেমন তিন ভাগ করে বন্টন করার নিয়ম আমরা সবাই জানি,তবুও তথাকথিত সবাই পরিপূর্ণ সেটা মানি না।

সোহেল ভাই,এবং সামাদ ভাইদের মতো মধ্যবিত্তরা কুরবানী দিতে পারেনা বলে ফকিরদের মতো কারো বাসায় মাংসও খুঁজতে পারে না, আবার পাড়া প্রতিবেশিরাও তাদের পূর্ণ হক্ব আদায় করেনা বলে,সোহেল ভাইয়েরা নীরবে অন্ধররুমে কুরবানীর স্বাদ থেকে বঞ্চিত হন।
আমাদের বোধোদয় আর কবে হবে তা আল্লাহই ভালো জানেন।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলাম লেখক 

আরও পড়ুন-

জীবনসায়াহ্ণে মৃত্যুকে ভালোবেসেছি

আরও পড়ুন