বিশ্বসভ্যতায় নবি-রসূলগণের রাজনীতি ও কল্যাণ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন-১

||  জি মোস্তফা ||

 

এইচ.জি. ওয়েলস লিখেছেন-
“ডেভিড (দাউদ) অধিকতর সফল ও রাজনীতি জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন। ডেভিডের শাসনকালই ছিলো হিব্রু জাতির একমাত্র উন্নতির কাল।”( বিশ্বের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস,এইচ.জি. ওয়েলস,পৃ.৬৭)
যখনই নবি-রসূল কর্তৃক পরিচালিতি কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হয় তখনই আমাদের মনে ভেসে ওঠে-
*আল্লাহ তাকে নিজ অনুগ্রহে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছেন,রাষ্ট্রক্ষমতা ছিলো সৎকাজের পুরস্কার। এতে উক্ত নবির কোনো সক্রিয় ভূমিকা ছিলো না;অর্থাৎ নবি রসূলগণ ছিলেন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রীয়।
*নবিগণের পরিচালিত রাষ্ট্র ছিলো শুধু আধ্যাত্মিক রাষ্ট্র। এতে বস্তুগত উন্নয়নের কোনো পদক্ষেপ ছিলো না।
*নবিগণের রাষ্ট্র ছিলো সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। অর্থাৎ বিশেষ একটি জাতিকে কেন্দ্র করেই সেই রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়েছিলো।
কিন্তু উপরিউক্ত ধারণার কোনোটিই সঠিক নয়। বরং নবিগণ দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়মেই চড়াই উৎরাই পেরিয়ে রাষ্ট্রগঠন করেছেন এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। দুনিয়ার সূচনাকাল থেকে শেষাবধি পর্যন্ত এই একই নিয়ম বিদ্যমান থাকবে। এর কোনো পরিবর্তন নেই। কোরআন মজিদ অধ্যয়নকালেই এই বিষয়টি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। যারা  “ভাঙ্গা ও গড়া” এবং “ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি” পড়েছেন তারা এই স্বতসিদ্ধ নিয়মটি সম্পর্কে সুষ্পষ্টরূপেই অবগত আছেন।
নবিগণ আদালতভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং অগ্নিপরীক্ষায় নিখাদ প্রমাণিত হয়েছেন। হযরত ইউসুফ (আ.), হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত মুসা (আ.) এর দৃষ্টান্ত আমাদের সম্মুখে রয়েছে। অভাবনীয় জুলুম পীড়ন মাড়িয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং নতুন সভ্যতা নির্মাণ করেছিলেন। তাদের ওই আন্দোলনে সাংগঠনিক শৃংখলা, উন্নত পরিকল্পনা,বিকল্প প্রস্তাবনা ও সুষ্পষ্ট লক্ষ্য সামনে ছিলো।
নবিগণের পরিচালিত রাষ্ট্র নিছক আধ্যাত্মিক কোনো রাষ্ট্র ছিলো না, কিংবা ছিলো না ঈশ্বরতান্ত্রিক কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো। এ রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিলো আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উন্নয়নের সমন্বিত ধারা।
এধরনের রাষ্ট্রের মডেল আল্লামা ইবনে খালদুনের “সিয়াসা দীনিয়া” শ্রেণির অনুরূপ। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণও সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলো। মানব কল্যাণের বাস্তব চিত্র এরূপ রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেই অন্তর্নিহিত ছিলো।
নবিগণের রাষ্ট্র কোনো সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ছিলো না। এটি ছিলো মানুষকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্বোত্তম নজির। শুধু মানুষই নয় বরং অন্যান্য প্রাণিরা পর্যন্ত এ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহশ করতো ।
সুলাইমান (আ.) এর রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই তাঁর রাষ্ট্রব্যবস্থায় পশু পাখিরা শরিক হয়েছিলো ।সুলাইমান (আ.) এর রাজসভায় হুদহুদ পাখি সংবাদবাহক হিসেবে কাজ করতো।
হযরত দাউদ (আ.)ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর শাসিত ভূ-খণ্ডকে তিনি সিয়াসা দীনিয়ায় রূপ দিয়েছিলেন। এ ধরনের কল্যাণকর রাষ্ট্রই মূলত প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্র। তিনি পারলৌকিক ও জাগতিক উভয় ধরনের কল্যাণধারায় সমন্বিত উন্নয়নব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর শাসনকাল ছিলো হিব্রুদের সোনালি যুগ।
দাউদ (আ.) এর সোনালি শাসন ব্যবস্থার স্বীকৃতি দিয়ে এইচ.জি. ওয়েলস লিখেছেন-
“ডেভিড (দাউদ) অধিকতর সফল ও রাজনীতি জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন। ডেভিডের শাসনকালই ছিলো হিব্রু জাতির একমাত্র উন্নতির কাল।”( বিশ্বের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস,এইচ.জি. ওয়েলস,পৃ.৬৭)
*কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করেছিলেন দাউদ (আ.)-
وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآَتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ
“এবং দাউদ জালুতকে হত্যা করলো, আল্লাহ তাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দিলেন এবং যা তিনি ইচ্ছা করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন।
(সূরা বাকারা,আয়াতঃ২৫১)

 

হিব্রুদের নেতা হযরত মুসা (আ.) তাদেরকে ফারাওদের কবল থেকে মুক্ত করে পবিত্র ভূমি জেরুজালেম নিয়ে আসার পর স্বল্পকালের মধ্যে তিনি ইন্তেকাল করেন। ফলে ইসরাইলিরা তাওরাতের পথনির্দেশ ভুলে যেতে থাকে । তারা প্যালেস্টাইনের সমগ্র এলাকা দখল করার পর তাকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিবর্তে ১২ টি গোত্রের মধ্যে বণ্টন করে নেয়।
ক্রমান্বয়ে তারা গোত্রীয় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যায়। ফলে তারা ওইসব এলাকার পৌত্তলিকদেরকে সমূলে উৎখাত করতে সক্ষম হয় নি। উল্টো বরং তাদের কালচার ও আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। এদিকে ফিলিস্তিনি পৌত্তলিকরা ও তাদের মিত্রশক্তি ঐক্যবদ্ধরূপে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে । ফিলিস্তিনীরা ছিলো একটি যুদ্ধপ্রিয় জাতি। (পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতা, হাফিজ উদ্দীন আহমেদ,পৃ.৮৮)। তারা সম্মিলিত আক্রমণের মাধ্যমে একের পর এক ইসরাইলিদের দখলভুক্ত এলাকা কুক্ষিগত করতে থাকে ।
এ অবস্থায় তাদের বোধোদয় হয় যে, একজন শাসকের অধীনে তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। সমকালীন নবি ছিলেন হযরত শামূইল (আ.)। শামূইল (আ.) এর নিকট তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনি তালুতকে তাদের শাসক নিয়োগ করেন। (তাফহীমুল কুরআন,১৭ঃ৫ আয়াত, টীকা-৭)

 

তালুত ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী ও যোগ্য নেতা। তিনি দৈহিক গঠনে, শারীরিক সৌন্দর্যে,জ্ঞান গরিমায় ও আত্মপ্রত্যয়ে এক বলিষ্ঠ যুবক ছিলেন। তিনি আকৃতিতে ছিলেন দীর্ঘদেহী। বাইবেলের বর্ণনামতে, ইসরাইল সন্তানদের মধ্যে তার অপেক্ষা সুন্দর কোনো পুরুষ ছিলো না এবং তিনি অন্য সকলের তুলনায় এক মস্তক দীর্ঘ ছিলেন। (১ম শমূয়েল, ৯ঃ২ ও ১০ঃ২৩)
তালুত শাসক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর নবি শামূইলের নির্দেশক্রমেই স্বৈরাচারী জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং ফিলিস্তিনি পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এরপর অধিকাংশ ইসরাইলিরা যুদ্ধ থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে এবং তালুতের নেতৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করে। অথচ তারা নিজেরাই তাদের হীনতম অবস্থা বদলানোর জন্য নবি শামূইলের কাছে গিয়ে একজন শাসক নিয়োগের জন্য ধরনা দিয়েছিলো। কোরআন মজিদে তাদের এসব স্ববিরোধী আচরণের কথা বর্ণিত হয়েছে-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلَإِ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى إِذْ قَالُوا لِنَبِيٍّ لَهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِكًا نُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلَّا تُقَاتِلُوا قَالُوا وَمَا لَنَا أَلَّا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أُخْرِجْنَا مِنْ دِيَارِنَا وَأَبْنَائِنَا فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ (246) وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا قَالُوا أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (247)
“তুমি কি মুসার পরবর্তী বনি ইসরাইল প্রধানদের দেখনি? তারা নিজেদের নবীকে বলেছিল আমাদের জন্য একজন নেতা নিযুক্ত কর যাতে আমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করতে পারি। তিনি (নবি) বললেন, এমন তো হতে পারে যে,যখন তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেয়া হবে তখন তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বলেছিল, আমরা তো আমাদের ঘরবাড়ী ও সন্তানদের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়েছি,কাজেই আমরা কেন আল্লাহর পথে সংগ্রাম করব না? এরপর যখন তাদেরকে যুদ্ধ করতে বলা হলো, তখন তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলো। আল্লাহ অপরাধীদেরকে ভালভাবেই জানেন।
বনি ইসরাইলদের নবি তাদেরকে বলেছিলেন আল্লাহ তালুতকে তোমাদের শাসক নিযুক্ত করেছেন। তারা বলল: সে কিভাবে আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে যখন আমরা নিজেরাই শাসন কাজে তার চেয়ে বেশি যোগ্য এবং তার প্রচুর ধনসম্পদও নেই? তিনি (নবি) বললেন, আল্লাহই তাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাঁকে দৈহিক শক্তি ও জ্ঞানের দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও প্রজ্ঞাময়।( সূরা বাকারা-২৪৬-২৪৭)

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে ইসরাইলিরা শামূইল (আ.) এর নিকট তাদের একজন শাসক নিয়োগের আবেদন করলো এবং তৎপ্রেক্ষিতে তিনি তালুতকে আল্লাহর নির্দেশমতে তাদের শাসক মনোনীত করলেন, সেখানে তার বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি উত্থাপনের কারণ কী ছিলো? এর কারণ হচ্ছে বনি ইসরাইলের ১২ টি গোত্রের মধ্যে দুইটি বিশেষ গোত্র ছিলো। লেবি বংশের ছিলো নবুওয়ত প্রাপ্তির বিশেষ অধিকার এবং যিহুদা বংশের ছিলো রাজত্ব ও সেনাপ্রধান পদ প্রাপ্তির বিশেষ অধিকার। তালুত এই দুই বংশের কোনোটিরই লোক ছিলেন না ;বরং তিনি ছিলেন সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও অখ্যাত বংশ বিন ইয়ামিন গোত্রের লোক।(সীরাত বিশ্বকোষ, ইফাবা,৩য় খণ্ড, পৃ.৩৭) ফলে তারা তালুতের নেতৃত্বে যুদ্ধে যোগদানের পরিবর্তে আনুগত্যহীনতার পথ বেছে নিয়েছিলো ।

 

তালুত বনি ইসরাইলের অধিকাংশ লোকদের আনুগত্যহীনতার দৃশ্য দেখে বিচলিত না হয়ে জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিলেন। তিনি ৮০ হাজার সৈন্য প্রস্তুত করে যুদ্ধাভিযানে রওনা দিলেন। পথিমধ্যে সেনা সদস্যরা তৃষ্ণার্ত এবং ক্লান্ত হয়ে পড়লো। তাদের সামনে একটি নদীর দেখা পাওয়া গেলো। এটি বর্তমানের জর্দান নদী অথবা এর কোনো শাখা-নদী বা ফিলিস্তিন নদী। নদীটি ততো বড়ো নয়,সোজা মাপে ৬৫ মাইল এবং বাঁকসহ ২০০ মাইল প্রায়। নদীটি উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত এবং পথিমধ্যে গালীল হ্রদ ও তাবারিয়া উপসাগর অতিক্রম করে মৃত সাগরে পতিত হয়েছে। উৎপত্তিস্থলে এর পানি স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও মিষ্ট হইলেও মোহনার দিকের পানি অপরিচ্ছন্ন, দুর্গন্ধময় ও ক্ষতিকর। (তাফসীরে মাজেদী,১ খ.পৃ.৪৮১)
সৈন্যরা এই নদীর পানি পান করার জন্য মনস্থির করলে তালুত তাদেরকে জানিয়ে দিলেন, নদী অতিক্রমকালে কেউ তা থেকে পানি পান করবে না, এক দুই আঁজলা ব্যতীত। এটা ছিলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য পরীক্ষা। কিন্তু সেনাপতির নির্দেশ অমান্য করে অধিকাংশ সৈন্য উদরপূর্তি করে পানি পান করে এবং নদী অতিক্রম করার পর তারা যুদ্ধ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
তাফসিরকার সুদ্দী বলেন,”তালুত ৮০ হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে রওনা হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৭৬ হাজার সৈন্য সেনাপতির নির্দেশ লঙ্ঘন করে উদরপূর্তি করে পানি পান করেছিলো । আর মাত্র চার হাজার সৈন্য অবশিষ্ট ছিলো ।”

 

পানি পান করার পর সৈন্যরা যুদ্ধ করার সক্ষমতা হারালো এবং তালুতকে জানিয়ে দিলো, জালুত ও তার বিশাল সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সামর্থ তাদের নেই। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে একদল সাচ্চা মুমিন যুদ্ধ করার জন্য দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করলেন এবং জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য গর্জে উঠলেন। তাদের পূর্ণ ভরসা ছিলো আল্লাহর ওপর। তারা বিশ্বাস করতেন বিজয় দানের মালিক আল্লাহ।
তালুত স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হলেন এবং দোয়া করলেন, আল্লাহ যেন তাদের ধৈর্য দান করেন, তাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচল রাখেন এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেন। (সূরা বাকারা,আয়াতঃ২৪৯-২৫০)

 

জালুতের সঙ্গে ছিলো বিশাল সামরিক বাহিনী। জালুত নিজেই ফিলিস্তিনি বীরযোদ্ধা। সাড়ে ছয় হাত দীর্ঘ দৈত্যাকার মানব। মস্তকে পিতলের শিরস্ত্রাণ। সমগ্র দেহে পিতলের বর্মে সুসজ্জিত।জালুত তালুতের বাহিনী লক্ষ্য করে দাম্ভিকতার সঙ্গে তালুতকে মোকাবেলায় অবতীর্ণ হতে বললেন। কিন্তু তালুত বাহিনীর কেউই তার মোকাবেলায় অবতীর্ণ হতে সাহস করলো না। তালুতের সেনাবাহিনীতে যু্বক দাউদ নবি শামূইলের সঙ্গে যোগাযোগ করে যোগদান করেছিলেন। দাউদ ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী এক বলিষ্ঠ যুবক। তিনি সাহস করে জালুতের বিরুদ্ধে মোকাবেলার জন্য এগিয়ে গেলেন। দাউদ (আ.) লৌহ দ্বারা বিশেষ যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করেছিলেন। সেসব অস্ত্র জালুতের ওপর নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করলেন। সেনাপতির মৃত্যু দৃশ্য অবলোকন করে জালুত বাহিনী পলায়ন করলো। এই দুঃসাহসিক ঘটনায় দাউদ (আ.) সমগ্র ইসরাইল জাতির নিকট মহাবীররূপে খ্যাতি লাভ করলেন এবং তাদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। সমগ্র জাতি দাউদের সমর্থক হয়ে গেলো । তালুত তার কন্যাকে দাউদের সঙ্গে বিয়ে দিলেন এবং তাকে তালুত সেনাবাহিনীর সেনাধ্যক্ষ্য নিযুক্ত করলেন।

 

কোনো বর্ণনায় আছে যে, দাউদ (আ.) অপরিচিত ব্যক্তি হিসেবেই এই যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। এমনকি তালুতও তার সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব প্রদর্শনের মাধ্যমেই তিনি সমগ্র জাতির কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

 

তালুত পরবর্তী সময়ে সমগ্র ইসরাইল জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাউদকে তাদের শাসক হিসেবে মনোনীত করে। এক্ষেত্রে নবি শামূইল (আ.) এর পৃষ্ঠপোষকতা ছিলো।সুতরাং একটি স্বাভাবিক পদ্ধতির মাধ্যমেই দাউদ (আ.) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করেছিলেন এবং অবিভক্ত রাষ্ট্রগঠন করেছিলেন।

 

সম্মিলিত রাষ্ট গঠন ও সাম্রাজ্য বিস্তারঃ
নবি দাউদ (আ.) জুদাহ ও ইসরাইল এ দুই রাষ্ট্রকে একত্র করেন এবং বনি ইসরাইলের ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভূত হন। তিনি ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিনি আমালেকাদের স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করেন এবং প্রতিবেশী ইদোম,মোয়াব ও আম্মুনের ওপর এবং সিরিয়ার আরামিয়ান রাজ্যের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। একই সময়ে তিনি টায়ার ও হামাহ এর শাসকগণের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তিনি সম্মিলিত জুদাহ ও ইসরাইল রাষ্ট্রের সীমা কতিপয় কানআনী শহর পর্যন্ত বিস্তৃত করেন এবং জেরুজালেম অধিকার করে সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন। তার রাষ্ট্রের সীমা ফোরাত নদী থেকে ভূমধ্য সাগর এবং দামেশক থেকে আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তিনিই ছিলেন ইসরাইলের প্রথম সফল শাসক। তিনিই সর্বপ্রথম ইহুদিদের ১২ টি গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি সুসংহত জাতি গঠন করেন। তিনি সাফল্যের সাথে হেবরোনে ৭ বছর এবং জেরুজালেমে ৩৩ বছর
রাজত্ব করেন।

 

জি.মোস্তফা

১৪ ডিসেম্বর ২০২১

 

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক 

 

 

 

আরও পড়ুন