আধুনিক আফগানিস্তানের ইতিহাস

এম আর রাসেল 

আধুনিক আফগানিস্তানের ভিত স্থাপন করেছিল দুররানি সাম্রাজ্য। নাদির শাহের দেহরক্ষী আহমদ খান আবদালী এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। আবদালীকে আফগান গোত্রপতিরা শাহ নির্বাচিত করে। তিনি দুররানি উপাধি গ্রহণ করেন। দুররানি শব্দের অর্থ ‘pearl of pearl’. এজন্য তাকে আহমদ শাহ দুররানি বা আহমদ শাহ আবদালি নামেও ডাকা হয়।

                                            চিত্রঃ দুররানি সাম্রাজ্যের মানচিত্র


আফগানিস্তানে তিনি আহমদ শাহ বাবা কিংবা বাবা-ই-আফগান নামেও পরিচিত। তিনি হলেন আধুনিক আফগানিস্তানের জনক। ১৮ শতকে উসামানিয়া সাম্রাজ্যের পর ২য় বৃহৎ মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল। এর বিস্তৃতি ছিল আমু দরিয়া থেকে আরব সাগর পর্যন্ত। আহমদ শাহ দুররানি সর্বপ্রথম ১৭৪৭ সালে আফগানিস্তানকে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসেন। অনেক শাসকের হাত ঘুরে দেশটি আজ আশরাফ গানির হাতে এসেছে।

উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কোনো বিদেশী শক্তিই এখানে স্থায়ী হতে পারেনি। এজন্য দেশটিকে সাম্রাজ্যবাদের গোরস্থান বলেও ডাকা হয়। কুশান, ঘুরি, খিলজি, মোগল সহ অনেকেই দেশটির পথ অতিক্রম করে ভারতবর্ষ শাসন করেছেন। কিন্তু কখনই স্থানীয়দের পুরোপুরি বশে আনতে পারেন নি।

গ্রিকো-পারসিয়ান যুদ্ধের পর দেশটির পথ ধরেই আলেকজান্ডার ভারতবর্ষে আক্রমণ করতে এগিয়ে গেছেন৷ পরে ফিরেও গেছেন,কিন্তু এখানে থিতু হননি। এক সময়ের ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটিশ এই দেশে বেশ নাকানিচুবানি খেয়েছে। ১৮৩৮ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তারা ৩ বার আফগানিস্তান আক্রমণ করে। এই তিনবারই তারা পরাজিত হয়। এজন্যই ব্রিটিশ ভাইসরয় বলেছিলেন, ‘আফগানিস্তান হচ্ছে বিষাক্ত পানীয়।’ 

আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের আক্রমণ ইতিহাসে অ্যাংলো আফগান যুদ্ধ বা আফগান যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৮৩৮ সালে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল জর্জ ইডেন সিমলা মেনিফেস্টো ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ান পন্থী দোস্ত মোহাম্মদ খান ও তার সহযোগীদের সরিয়ে শাহ সুজা দুররানিকে ক্ষমতায় বসানো।

                                           চিত্রঃ  প্রথম অ্যাংলো আফগান যুদ্ধ


শাহ সুজা ছিলেন দুররানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ শাহ দুররানির নাতি। ১৮০৯ সাল থেকে শাহ সুজা কাশ্মীর ও পাঞ্জাবে নির্বাসিত ছিলেন। শুজা নিমলার যুদ্ধে পরাজিত হন। যুদ্ধে জয় লাভ করে তার ভাই মাহমুদ শাহ। এর আগে শুজা মাহমুদ শাহকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর মাহমুদ শাহ জামান শাহকে অন্ধ করে দিয়ে নিজে ক্ষমতা দখল করেছিল। এখানে বলে রাখি এই শুজার সাথে বিখ্যাত ‘কোহ-ই-নূর’ এর ইতিহাসও জড়িয়ে আছে৷

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৩৯ সালে দেশটি দখল করে শাহ সুজাকে ক্ষমতায় বসায়। সে সময় ক্ষমতায় ছিল রাশিয়ান পন্থী দোস্ত মোহাম্মদ খান। দুই বছর পর ১৮৪১ সালে দোস্ত মোহাম্মদের ছেলে আকবর খানের নেতৃত্বে বিভিন্ন গোত্রপতিরা পাল্টা আক্রমণ করে ব্রিটিশদের পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য করে। ১৮৪৩ সালে পুনরায় দোস্ত মোহাম্মদ পুনরায় সিংহাসনে বসে। ব্রিটিশরা কাবুল ত্যাগের পর শাহ সুজাকে হত্যা করা হয়।

ইতিহাস বলে ১৮০০০ হাজার ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের মধ্যে মাত্র ১ জন প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছিল। ইতিহাসে এই ঘটনা ফলাও করে প্রচার করা হয়। হত্যার ঘটনায় আফগানদের বর্বর, উচ্ছৃঙ্খল, নির্দয় উপাধি দেয়া হয়। এই উপাধি শত বছর পেরিয়ে আজকের যুগেও মুছে যায়নি।

এখানে আরেকটি বিষয়ের কথা জানিয়ে দেই। প্রথম অ্যাংলো আফগান যুদ্ধের কাহিনী বর্ণনায় বৃটিশদের কাবুল দখল ও আফগান বাহিনীর এই হত্যাযজ্ঞের বাইরে আরো কিছু ঘটনা আছে যা কম আলাপ করা হয়। ব্রিটিশ বাহিনী কাবুল ছাড়াও ইস্তালিফ ও ছারিকার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এর মধ্যে ইস্তালিফে বৃহৎ গণহত্যা চালায়। তারা প্রতিটি আফগান যুবককে হত্যা করেছিল। শত শত আফগান যুবতীকে হত্যা করেছিল। আর্নল্ড ফ্লেচার তার বই History of Afghanistan বইতে এ নিয়ে আলাপ করেছেন।

                                                             চিত্রঃ ২য় অ্যাংলো আফগান যুদ্ধ

১৮৭৫ সালে লর্ড লিটন ভারতবর্ষে গর্ভনর জেনারেল হয়ে আসেন৷ কয়েক বছর পর ১৮৭৮ সালে রাশিয়া কাবুলে কূটনৈতিক মিশন প্রেরণ করে। ব্রিটিশরা এমন একটি মিশন পাঠাতে চাইলে শের আলি খান তা প্রত্যাখান করেন। এর ফলে ২য় অ্যাংলো আফগান যুদ্ধ শুরু হয়। থেমে থেমে বেশ কয়েকদফা এই যুদ্ধ চলতে থাকে ১৮৯৩ পর্যন্ত।

১৮৭৯ সালে গান্দামাকের চুক্তির মাধ্যমে আফগান শাসক ইয়াকুব খান ব্রিটিশদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়৷ কিন্তু কিছুদিন পর ব্রিটিশ প্রতিনিধি লুইস কাভাগনারি সহ কয়কজন কর্মকর্তা নিহন হয়। এর পর ১৮৯৩ সালে ডুরাল্ড লাইন টেনে ভারতবর্ষ ও আফগানিস্তানের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। এই সময় শাসক ছিলেন আব্দুর রহমান খান। তিনি ১৮৮০ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। আব্দুর রহমান গান্দামাক চুক্তি সমর্থন করেছিলেন৷

                                           চিত্রঃ গান্দামাক চুক্তি সইয়ের সময় আফগান শাসক ও ব্রিটিশ প্রতিনিধি 


গান্দামাক চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ‘অন্য দেশের সাথে আফগানিস্তানের বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন ব্রিটিশ সরকারের ইচ্ছা ও পরামর্শ অনুযায়ী হবে।’ পরবর্তী শাসকগণ এই চুক্তি মেনেই দেশ পরিচালনা করেন। আমানউল্লাহ খান ক্ষমতায় এই চুক্তির বাইরে পথ চলতে শুরু করেন।

আব্দুর রহমানের পর ক্ষমতায় আসে হাবিবুল্লাহ খান৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশটি জুড়ে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতি সমর্থনের জোয়ার দেখা দেয়। সেই সময়ের শাসক হাবিবুল্লাহ খান নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেন। ১৯১৯ সালে হাবিবুল্লাহ আততায়ীর হাতে মারা গেলে ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে আমানুল্লাহ। আমানুল্লাহ আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। গান্দামাকের চুক্তি থেকে সরে আসেন। এমনকি ব্রিটিশ শাসিত ভারববর্ষে আক্রমণের সিদ্ধান্তও নিয়েছেলিন বলে জানা যায়।

মাসব্যপী বিচ্ছিন্নভাবে কিছু হামলার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে ১৯১৯ সালের ৮ আগস্ট একটি শান্তি চুক্তি সই হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা আফগানদের স্বীকৃতি দেয়। রাওয়লাপিন্ডিতে এই চুক্তি সইয়ের পূর্বে আমানুল্লাহ বলশেভিক সাম্রাজ্যের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে। মনে করিয়ে দেই ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিকরা ক্ষমতায় ছিল। ১৯২২ সালে USSR গঠিত হয়।

                                        চিত্রঃ আমানউল্লাহ খান

আমানউল্লাহ আফগানিস্তানকে পশ্চিমা আদর্শে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনিই আফগানিস্তানে প্রথম সংবিধান চালু করেন। তাঁর সময়ে আফগানিস্তানে বেশ কয়েকটি সাময়িক পত্রিকা বের হয়। এর মধ্যে জাভান্দুন ও আদব ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯২৮ সালে তিনি এক অনুষ্ঠানে তাঁর স্ত্রীকে হিজাবমুক্ত হতে দেন। ধর্মীয় বিধিনিষেধ শিথিল করেন। আধুনিক শিক্ষার প্রসার ও সেনাবাহিনীর সংস্কারে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এসব কাজের মধ্য দিয়ে তিনি রক্ষণশীলদের চোখে শত্রু হয়ে যান।

১৯২৮ সালে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ডাকাত বাচ্চা সাকাত্ত কাবুল দখল করে। ১৯২৯ সালে আমানউল্লাহ ক্ষমতা হারায়। বাচ্চা সাকাত্ত হাবিউল্লাহ গাজী নাম ধারণ করে নিজেকে আমির ঘোষণা করে। একই বছরে মোহাম্মদ নাদির খান বাচ্চা সাকাত্তকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। গোত্রীয় সরদাররা তাকে শাহ নির্বাচিত করেন। নাদির শাহ ১৯৩১ সালে আমানউল্লাহ প্রবর্তিত সংবিধান সংশোধন করে নতুন সংবিধান প্রকাশ করেন। ১৯৩৩ সালে নাদির শাহকে হত্যা করা হলে তার ১৯ বছরের ছেলে জহির শাহ ক্ষমতায় আসে।

জহির শাহের আমলে আফগানিস্তান কৌশলী পন্থা অবলম্বন করে বর্হিবিশ্বের সাথে সম্পর্কের বিস্তার ঘটায়। নিজস্ব অর্থায়নে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নও চলতে থাকে। বিদেশী অর্থায়ন নিশ্চিতে উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছিলেন। আরিয়ানা নামে প্রথম বিমানসংস্থা তার আমলেই চালু হয়। নিয়মিত কাবুল থেকে ইউরোপে বিমান চলাচল করতো৷ এই চলাচলের পথ মার্কো পোলো রুট নামে পরিচিতি পেয়েছিল।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পশতুনিস্তান আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনে আফগানিস্তানের রক্ষণশীল গোত্র প্রধানরা মদদ দেয়। সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শাহ শাহ মাহমুদ এর বিপক্ষে অবস্থান নিলে ধর্মীয় নেতারা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। দাউদ খানকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন।

দাউদ খান পশতুনিস্তানের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। অনেককে অবাক করে দিয়ে দাউদ খান সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন করেন। পশতুনিস্তান ইস্যুতে পাকিস্তান সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। ১৯৬৩ সালে দাউদ খান পদ থেকে পদত্যাগ করলে পাকিস্তান সীমান্ত খুলে দেয়।

১৯৬১ সালে লয়া জিরগা নতুন সংবিধান অনুমোদন করে। দেশটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করে। এর ফলে ১৯৬৫ সালে বাম আর্দশের পিডিপিএ, ১৯৭১ সালে রক্ষণশীল দল হিসেবে ইসলামিক সোসাইটি আত্নপ্রকাশ করে। জাতীয় রাজনীতি ক্রমশই বিভক্ত হয়ে পড়ে৷ ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রাজা জহির শাহ ৫ জন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন।

বিভক্ত রাজনীতির ময়দানে গোল দিতে দাউদ খান ক্ষমতা দখল করে দেশটিতে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তানক রিপাবলিক রূপে আত্নপ্রকাশ করে।

এরপরের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাব সোভিয়েত আগ্রাসন, মুজাহেদীন বাহিনী সৃষ্টি, মুজাহেদীন থেকে তালেবান, আল কায়েদা সহ অন্যান্য সশস্ত্র বিদ্রোহীদের আত্নপ্রকাশ, নাইন ইলেভেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ – প্রভৃতি প্রতিটি ঘটনায় দেশটির সংযোগ। এর বাইরে পাকিস্তান নামক দেশটির রাজনীতির ইতিহাসের সাথেও আফগানিস্তান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

আরো পড়ুনঃআফগানিস্তানের তুলনায় সুইজারল্যান্ডের ইতিহাস লেখা ঢের সোজা   

আরও পড়ুন