চোখের অন্তরালে নিরব অশ্রুপাত(পর্ব-২)’

নারী-জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে ধারাবাহিক রচনা-
নয়নতারা

মেহেনাজ তাবাসসুম

সবে শিশুটির ছয় বছর হলো। মা-বাবার একমাত্র সন্তান। সঙ্গী-সাথীও তেমন নেই। খুব অন্তর্মুখী স্বভাবের বাচ্চাটি একা একা ছোট ছোট খেলনার সাথে কথা বলে ,
কথা বলে, প্রাচীরঘেরা ছোট্ট এক চিলতে উঠানে লাগানো ফুল গাছের সাথে, ফুলের সাথে। ঘরের দেয়ালের সাথেও মাঝে মাঝে কথা বলে। আচমকা যখন উঠোনের বাতাবি লেবুর গাছে অথবা পেয়ারা গাছের ডালে কোন পাখি ,প্রজাপতি কিংবা ফড়িং এসে বসে, তার সাথেও গল্প করতে শুরু করে সে। একা একা নিজের মনে ছড়া বলে, গান গায়, কখনোবা পেয়ারা গাছের ডালে বসে বসে অচেনা কারো সাথে কাল্পনিক কথাবার্তা বলে ।
আশেপাশের বাচ্চাদের সাথে কোন কোন বিকেলে খেলা করে হয়তো।
একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে মায়ের কাছে শোনা গল্প মনে করে ভাবতে থাকে, আল্লাহ ঠিক কোথায় থাকেন !আকাশটা ঠিক কত উঁচু!
বাসার কিছু দূরে প্রায় আট /দশ তলা সমান পানির ট্যাংকির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবতে থাকে বোধহয় ঐ বিশাল জিনিসটির উপর আল্লাহ থাকতে পারেন । কিছুতেই তার সন্দেহ যায় না ।আকাশ পানে তাকিয়ে ভাবতে থাকে, সত্যিই কি মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছেন আল্লাহ!
এরকম স্বপ্নবিলাসী, কল্পনাপ্রবণ শিশুটি যখন স্কুলে যায় ,তখন‌ও তার ভাবনার শেষ নেই।
স্কুলে যাবার পথেও পথের দু’পাশের গাছ-পালা, পুকুর, সবুজ ঘাস তার ভাবুক হৃদয় কেড়ে নেয় ।স্কুলে শান্ত ,ভদ্র ,স্বল্পভাষী কিন্তু স্কুল ছুটির পর যে কজন বন্ধু আছে তাদের সাথে কলকলিয়ে গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরে সে। বাড়ি ফেরার রাস্তাটুকুতে সে হয়ে যায় ঘাসফড়িংয়ের মতো চঞ্চল ।পথের পাশে নাম না জানা ফুল ,জলপাই গাছের লাল পাতা, চকমকি নুড়িপাথর ছোট হাত ভর্তি করে নেয় ইচ্ছামতো ।
বন্ধুরা মিলে কত গল্প !
একজন বলে,জানিস, আজ মা আমার জন্য পিঠা বানিয়ে রাখবে বলেছে।
আরেকজন বলে,আমার মাও অনেক কিছু রান্না করবে আজ ।আমার বাবা বলেছে আজ ঘুরতে নিয়ে যাবে।
ভাবুক শিশুটি ভাবনায় ডুবে যায়- আজ সকালে তেমন কিছু খেয়ে আসা হয়নি ।বাড়িতে মা কী রান্না করে রাখবে তাও তো জানা নেই । তবুও বন্ধুদের সাথে গলা মিলিয়ে বলে ওঠে আমারও খুব ক্ষুধা পেয়েছে আজ। বাড়ি গিয়ে পেট ভরে ভাত খাবো।
বাড়ির পথ আর একটু বাকি। রাস্তার ধার দিয়ে বেড়ার মত সারি দিয়ে লাগানো অচেনা ফুলের গাছ। শিশুটি তার ছোট্ট মুঠিতে কয়েকটি ফুল তুলে নেয়।এরপর ফুটে আছে নয়ন তারা ফুলের সারি ।সেখান থেকে কিছু ফুল তুলে নেয় মাকে দেবে বলে ।তারপর ঘাসফড়িংয়ের মত লাফাতে লাফাতে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির দরজায় গিয়ে দেখে দরজা খোলা ।কিছুটা অবাক হয় শিশুটি। এভাবে তো দরজা খোলা থাকেনা ! মা,মা বলে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকে ছোট্ট হৃদয়টা ভীষণভাবে কাঁপতে থাকে। খুব জোরে কলিজায় বাড়ি দিলে যেমন যন্ত্রণা পাওয়া যায় হয়তো তার চাইতেও বেশি ।
কী জানি !
সাময়িক অনুভূতিশূন্য শিশুটি ঘরের মেঝেতে তার মাকে পড়ে থাকতে দেখে। মায়ের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। নিজের ছোট্ট সন্তানটিকে দেখে মায়ের চোখ থেকে যেন নতুন করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
মা ! বলে হৃদয়ফাটা আর্তনাদ ঝরে পড়লো ওর কন্ঠে।
মায়ের হাতে, কপালে আঘাতের চিহ্ন। ছয় বছরের বাচ্চা হয়েও ও বুঝতে পারল,বাবা আজ‌ও মাকে মেরেছে। বাকরুদ্ধ শিশুটি নির্বাক চেয়ে থাকা মায়ের মাথার কাছে গিয়ে আছড়ে পড়লো।
মাকে ভালোবেসে স্কুল ফিরতি পথে ছোট্ট মুঠিতে নিয়ে আসা নয়ন তারা ফুলগুলি বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এখানে সেখানে। সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই।
ওর নয়ন তারায় কেবল একটিই ছবি-এক দুখিনী, নির্যাতিত,অসহায় মায়ের করুণ মুখচ্ছবি।
চলবে…

মেহেনাজ তাবাসসুম কবি, সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী।

১ম পর্বের লিংকঃ

‘চোখের অন্তরালে নিরব অশ্রুপাত’ (পর্ব-১)

 

আরও পড়ুন