আমাদের সালাতের প্রতি উদাসীনতা বনাম সাহাবাগণের সালাতে সিরিয়াসনেস (প্রথম পর্ব)

।।শামস জামান ।।
ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নামাজ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে বার বার নামাজের তাগিদ পেয়েছেন। কুরআনে পাকে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন জায়গায় সরাসরি ৮২ বার সালাত শব্দ উল্লেখ করে নামাজের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। রাসুল সা. সালাত পরিত্যাগকারীকে দ্বীন অস্বীকার কারী ( কাফির) বলেছেন। সালাত কাফির ও মুসলমানের মধ্যে দৃশ্যমান পার্থক্য টেনে দেয়।

 

নামাজই একমাত্র ইবাদত; যার মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার সব কাজ ছেড়ে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়ে যায়। এ নামাজই মানুষকে দুনিয়ার সব পাপ-পংকিলতা থেকে ধুয়ে মুছে পাক-সাফ করে দেয়। দুনিয়ার সব অন্যায়-অনাচার থেকে হেফাজত করে। নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া মুমিন মুসলমানরে ঈমানের দাবি ও ফরজ ইবাদত।যে ব্যক্তি নামাজের প্রতি যত্নবান থাকে; কেয়ামতের দিন ওই নামাজ তার জন্য নূর হবে এবং হিসেবের সময় নামাজ তার জন্য দলিল হবে এবং নামাজ তার জন্য নাজাতের কারণ হবে।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নামাজের প্রতি যত্নবান হবে না- কেয়ামতের দিন নামাজ তার জন্য নূর ও দলিল হবে না। তার জন্য নাজাতের কোনো সনদও থাকবে না। বরং ফেরাউন, হামান ও উবাই ইবনে খালফের সাথে তার হাশর হবে।

 

কিন্ত এই সালাত কি আমাদের সমাজে সেই গুরুত্বসহ মুসলমানগণ প্রাকটিচ করেন ? করেন না। তার সিম্পল কয়েকটি চিত্র দেখুন।
১.একটি অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেয়ে আমি নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে যাই। পর পর অন্য মেহমানগন আসতে থাকেন। অনুষ্ঠান শুরু হতে আরো আধঘন্টা বাকী। এরই মধ্যে বাইরে আজান ধ্বনিত হয়। আমি পাশের দু’জন যারা আমার পূর্ব পরিচিত, তাদের বললাম,চলুন সালাত পড়ে আসি। একজন বললেন-আপনি যান।আমার কাপড় ঠিক নেই।অন্যজন বললেন,বাড়ী গিয়ে একসাথে পড়ে নিবো।আমি ভীষণ ব্যথিত হলাম একারণে যে এরা কত ঠুনকো কারণে নামাজের মত একটি ফরজ ইবাদাতকে এড়িয়ে যেতে পারে ! অথচ সমাজে এরাই আমাদের নেতা ও শীর্ষ সিদ্ধান্তের মালিক।

 

২.কোন এক পৌর কর্পোরেশন অফিসে বাড়ীর হোল্ডিংস ট্যাক্স সংক্রান্ত কাজে মেয়র সাহেবের সাহায্য নিতে গেলাম।কাজ শেষ করে বের হবো,জোহরের আজান হলো। কর্পোরেশন অফিসের পাশেই মসজিদ। নামাজী হাতে গোনা প্রথম কাতার মাত্র।কিন্ত তখনো অফিস ভর্তি লোকজন।কর্মচারী ও সেবা গ্রহীতা মিলে হাজার মানুষ তো বটেই। তারা হয় কেউ গল্প করছিলেন,কেউ ধুমপান করছিলেন। একবারও কি তাদের মনে হলোনা যে এই মুহুর্তে মারা গেলে কি বেনামাজীর তালিকায় মৃত্যু হবেনা ? সেখানে অযু বাথরুম সবকিছুরই ব্যবস্থা বিরাজমান।

 

৩.আরেকদিনের ঘটনা। রমাদানের ঈদের আগে এক সুপার মার্কেটে কিছু একটা কিনতে গিয়েছি। প্রচুর নারী পুরুষ ও শিশুদের ভীড়,ঈদের কেনাকাটা বলে কথা। শপিংমলে নামাজের বন্দোবস্ত আছে।আসরের আজান হলো। বহু মানুষের সাথে আমিও নামাজ আদায় করলাম। কিন্ত তখনো মসজিদের বাইরে হাজারো পুরুষ কেনাকাটায় ব্যস্ত।নিশ্চয়ই এরা সবাই মুসলমান এবং কেউ অসুস্থও নন।রমজানে জানামতে,সরিষা পরিমাণও ঈমান আছে এমন লোকও নামাজ ছাড়ে না।তবে কি এদের ঈমানই নেই ?

 

৪.একবার কোন এক বিমান বন্দরে পৌছে দেখলাম ফজর ওয়াক্ত হয়ে গিয়েছে। ততক্ষনে আমরা ইমিগ্রেশন শেষ করে ব্যাগেজ লাউন্জে। একজন বললেন বের হতে হতে তো সূর্যোদয় হয়ে যাবে।চলেন,নামাজটা আদায় করে নিই। আমরা দু’ জন দাঁড়ালেও হতে হতে আট দশজন মুসল্লি হয়ে যায়। কিন্ত এখানে তো পূরো বিমানের তিনশত প্যাসেন্জার।আমি নিশ্চিত কয়েকজন ছাড়া বাকী সবাই মুসলিম পাশপোর্টধারী।তবে কি বাকীরা নামাজ না পড়ার কোন ছাড় আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন ?

 

৫.প্রায়ই দেখবেন,স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক খেলা উপভোগ করছে। এখন পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ ক্রিকেট চলছে। শুরু হলো জুম্মার দিন অথচ দিনটি মুসলমানদের জন্য খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। আমার বিশ্বাস নব্বইভাগ দর্শক মুসলমান,কর্মকর্তারা মুসলমান,এমনকি খেলোয়াড়গণও। আজান হলেও দেখা গেলো গ্যালারিতে এর কোন প্রভাব নেই। হয়তো হাতে গোণা কয়েকজন বাইরে নামাজের জন্য গিয়েছেন।খেলোয়াড়দেরও কেউ কেউ ফাঁকে আদায় করেছেন।একটা ফরজ ইবাদাত এভাবে গোষ্ঠিবদ্ধভাবে আদায় না করা জাতির দুর্ভাগ্যের আলামত বৈ কিছু নয়।

 

যেসব উপমাগুলো দিলাম সেগুলো কমন ফ্যাক্টর।নামাজের জন্য অযু প্রয়োজন। নিজ অবস্থানে পানি না থাকলে তায়াম্মুম করা যায়। জমিন পাক না থাকলে সিজদার জায়গায় এক টুকরা কাগজ বিছিয়েও সালাত আদায় করা যায়।দাঁড়াতে না পারলে বসেও পড়া যায়। এসব জায়গায় আমরা সবাই অপ্রয়োজনীয় ঘুরাফিরা ও গল্প গুজবেই ব্যস্ত থাকি।শুধু ইচ্ছা করলেই হয়। অথচ এতো নির্ভয় ও নিশ্চিন্তে থাকি,মনে হয় যেন নামাজ ছেড়ে দেয়া কোন ব্যাপারই না !
আপনি কি ভুলে গিয়েছেন যে সালাত আল্লাহর হক এবং ঈমানদারের পরিচয়। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এই সালাতেরই হিসাব নেয়া হবে। আপনার সেদিন পরীক্ষা হবে দুনিয়ায় আপনি রুকু সিজদা দিয়েছিলেন কিনা। ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দিলে আপনার কাছ থেকে দীন ও ঈমান চলে যায়।
নামাজে আল্লাহ এতটা সহজতা দিয়েছেন যা আর কোন ইবাদাতে দেননি। পন্চাশ ওয়াক্ত নামাজ থেকে কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত দিয়েছেন অথচ সওয়াবে কম করেননি। দিনে চব্বিশ ঘন্টায় সব মিলে এক ঘন্টাও যদি আল্লাহর জন্য দিতে না পারি তাহলে কোন মুখে কিয়ামতের দিন উঠবো বলুন ?
আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।

 

লেখকের  আরও লেখা পড়ুন –

 

লেখকঃ সাবেক অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড 

আরও পড়ুন