যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি

।। এম আর রাসেল ।।

 

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিশেষ একটি বাহনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।কারণ হিসেবে মানবাধিকার লংঘনের কথা বলা হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে এই নিষেধাজ্ঞা লঘু ব্যাপার মনে হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটির ব্যাপক তাৎপর্য রয়েছে।এটা পানির মতো স্বচ্ছ যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বাংলাদেশের চেয়ে অধিক মানবাধিকার বহির্ভূত কর্মকাণ্ড করে। তাই অন্য দেশের বিষয়ে নাক গলানোর নৈতিক অধিকার তার নেই।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এমন কার্যকালাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, কড়া সমালোচনাও করা যায়। কিন্তু এই কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপর অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়া বিশ্বের কোনো শক্তির পক্ষেই সম্ভব নয়।ডলার কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অমিত সব ক্ষমতা অর্পন করেছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার রকমফের রয়েছে। বাংলাদেশের উপর যেটা দেয়া হয়েছে সেটা শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের উপরই বর্তাবে। এর বাইরে বাণিজ্য বা কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না।তবে এই নিষেধাজ্ঞা একইসাথে বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা যৌক্তিক হবে। কেননা বিশ্বে এমন অনেক দেশ রয়েছে যেখানে মানবাধিকার পরিস্তিতি বাংলাদেশের চেয়েও গুরুতর।
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে সত্য, তবে কেন হঠাৎ করেই ইরান, উত্তর কোরিয়া, চীন ও রাশিয়ার মতো নিষেধাজ্ঞার প্রলেপ বাংলাদেশের গায়ে দেয়া হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বৃহৎ পরিসরে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।
ভূকৌশলগত অবস্থানই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের খবর শিরোনাম হয়েছে।এর আগে বাংলাদেশকে বাদ দিয়েই বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে। ভারতের চোখে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ভিন্ন কিছুর ইংগিত প্রদান করছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য যে চীন বিরোধী লড়াইয়ে বাংলাদেশের স্পষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করার চাপ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে ভারত হল প্রক্সি শক্তি। পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের মধুর প্রেম শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেয়সী হয় ভারত।কিন্তু, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের রসায়ন মধুর বলা যায় না। পুরানো মিত্র রাশিয়ার সাথেও ভারত সমানতালে সম্পর্ক রক্ষা করছে।এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের উপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। এর প্রমাণ হিসেবে অকাস চুক্তির কথা স্মরণ করা যায়।ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মিলিত জোট কোয়াডের কার্যকরী প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সন্দিহান। এর ফলে বাড়তি শক্তি হিসেবে অকাস জোটের সৃষ্টি হয়েছে। এই চুক্তি সই করে অ্যাংলো স্যাক্সন বিশ্বের মিত্রতাকে নতুন মাত্রা দেয়া হয়েছে৷
এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র দুটি বিকল্প নিয়েই কাজ করছে। (এক) ভারতের সাথে বাংলাদেশকে আরো অধিক যুক্ত করা, (দুই) বাংলাদেশি সীমানায় সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ হল চীনের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি রুখে দেয়া। চাপে রাখার কৌশল হিসেবে চীনকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলা (Containment Policy) ভূ-রাজনীতির বহু পরিচিত আয়োজন।দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর সরব উপস্থিতি রয়েছে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন, তাইওয়ান, সিংগাপুর ও পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চুক্তি রয়েছে।বলা যায়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে ঘিরে ফেলার কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। প্রতিতুলনা করলে দেখা যাবে বঙ্গোপসাগরীয় জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বড়ই নাজুক।

 

ভারত-মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপ-অঞ্চল হিসেবে বঙ্গোপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই সাগর তীরে প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের বসবাস। বিশ্ব নৌ-বাণিজ্যের এক চর্তুথাংশ এই সাগর পথে পরিচালিত হয়।অপরদিকে বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক তৎপরতায় চীন শক্ত অবস্থানে রয়েছে। মালাক্কা ডিলেমা এড়াতে মিয়ানমার চীনের জন্য বিকল্প একটি পথ তৈরি করেছে। এই ডিলেমা এড়াতে চীন থাইল্যান্ডে ক্রা ক্যনাল খাল খননের ব্যাপারে কাজ করছে।মিয়ানমারের কিয়াউপিউ বন্দর থেকে চীনের ভূ-খণ্ড পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপন জ্বালানির সরবরাহকে সহজ করেছে। কোকো দ্বীপপুঞ্জে চীনের সামরিক অবস্থান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে চীন এখান থেকে আন্দামান নিকোবর দ্বীপ ও মালাক্কা প্রণালীর আশে পাশে নজর রাখে।

 

কোকো দ্বীপপুঞ্জ বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মিলনস্থলে অবস্থিত। এই দ্বীপপুঞ্জ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এখানে মোট ৫ টি দ্বীপ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, দেশগুলোর যাবতীয় তৎপরতায় একিলিস হিল (ব্যাপক শক্তিমত্তা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে ওঠার মতো দুর্বল স্থান) হয়ে উঠতে পারে কোকো দ্বীপপুঞ্জের সর্ববৃহৎ দ্বীপ গ্রেট কোকো আইল্যান্ডস।

 

এমন পরিস্থিতিতে চীনের কার্যক্রমের উপর নজর রাখতে বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় প্রবেশ নিশ্চিত করতে চায়। এই জলসীমায় প্রবেশের জন্য দুটি দেশ মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বহুত পুরানো।
২০১২ সালে বারাক ওবামা মিয়ানমার সফর করেছিলেন। একই সালে ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র একইসাথে দুই দেশকে নিয়েই কাজ করেছে। বলা যায়, বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। এর পিছনে কারণও ছিল।চীনকে রুখতে বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারের সাথে সখ্য স্থাপনই যুক্তরাষ্ট্র অধিক লাভজনক মনে করেছিল। কিন্তু মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর চীন ও রাশিয়া প্রীতি যুক্তরাষ্ট্রকে হতাশ করেছে।
হিলারীর সফরের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি সই হয়। বিশ্লেষকরা বলেন, হিলারীর সফরের পরপরই বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি রচিত হয়েছিল।এই স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কার্যক্রমকে বিবেচনা করলে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে ‘আকসা চুক্তি’ সই করতে চায় এটা পুরানো আলাপ। জেনে রাখা ভালো, আকসা চুক্তির পূর্ব নাম ছিল ‘ন্যাটো মিউচুয়াল সাপোর্ট অ্যাক্ট’। পরে এর কিছু ধারা পরিবর্তন করে নন-ন্যাটো দেশগুলোর সাথে চুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।ওবামা আমলে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া–বিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল এর সফর আলোচিত ছিল। সেই সময় আকসা চুক্তির পাশে ‘সোফা চুক্তি’- র নামও উচ্চারিত হয়েছিল।
আকসা ও সোফা এই দুই চুক্তির মূল কথা হল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এই চুক্তির মাধ্যমে চট্রগ্রাম বন্দরে পোর্ট কল সুবিধা পেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
এতসব প্রচেষ্টার পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের একটাই উদ্দেশ্য চীনের প্রভাব কমানো। প্রখ্যাত মার্কিন কৌশলবিদ রবার্ট কাপলানের লেখাতেও এর সত্যতা পাওয়া যায়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা হল দক্ষিণ এশিয়ার মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত কে সাথে নিয়ে চীনের প্রভাব খর্ব করা৷ এখানে মিয়ানমারকে কাছে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
উপরন্তু মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ পূরণের পথে মূল প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। কেননা বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক চীনের অবস্থানের পুরোটা মিয়ানমারকে ঘিরেই পরিচালিত হচ্ছে। উপরে এ বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে।

 

বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত না হলে মালাক্কা প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগর কেন্দ্রিক তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হবে না। চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর, চীন-মিয়ানমার করিডোর চীনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।ভারতের দোদুল্যমান অবস্থা, মিয়ানমারকে কাছে টানতে না পারায় একটি দেশ বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হবে এটাই স্বাভাবিক।এখন বাংলাদেশকে নতুন কোনো চুক্তি সই করতে বাধ্য করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সর্বশেষ অনুদান পেতে হলে চুক্তি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রস্তাব উপরোক্ত অনুমানই জোরালো করছে।

 

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ যেন গিনিপিগ না হয় সেদিকে গভীর দৃষ্টি দেয়া উচিত৷ভারত মিয়ানমারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা করছে না। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরসার হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই ঘটনাও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

 

যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও জঙ্গি কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশকে বাগে আনার চেষ্টা করেছে। লক্ষণীয় বিষয় হল, যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রচারণায় ভারত প্রণোদনা দেয় এমন উদাহরণ রয়েছে।
জোট নিরপেক্ষ নীতি বর্তমান সময়ে অকার্যকর একটি কৌশল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আবার বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য কোনো এক পক্ষকে স্থায়ী মিত্র করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যান্য সময়ের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে অধিক কৌশলী কূটনীতির আশ্রয় নিতে হবে। নিজ নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ আদায়ে বাংলাদেশ কতটুকু সুবিধা নিতে পারে, সেটাই এখন লক্ষ করার বিষয়।

 

লেখকঃ আন্তর্জাতিক বিষয়ে কলাম লেখক 

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি – যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি – যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি
আরও পড়ুন