অং সান সুচিঃ নন্দিত, নিন্দিত ও অবিসংবাদিত এক নেত্রী

এম আর রাসেল  

মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এক সময় তিনি ছিলেন অগ্রগামী নেত্রী। অনেকেই তাকে প্রেরণার বাতিঘর মনে করতো। বিশ্বব্যাপী তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন। একজন আর্দশিক নেত্রী হিসেবে সবার প্রত্যাশা ছিল তিনি মানবিকতার সুর ছড়িয়ে দিবেন। কিন্তু তিনি সেই সুরে গান গাইতে পারেননি। তিনি সামরিক বাহিনীর নৃশংসতাকে রুখে দিতে পারেননি। নিষ্ঠুর জান্তা বাহিনীর জেনারেলদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

১৯৯১ সালে অং সান সুচি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। ঐ সময় তিনি গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৮৮ সালের বিখ্যাত ৮৮৮৮ আন্দোলনের পর থেকেই তিনি গৃহবন্দী ছিলেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার অনমনীয় মনোভাবের কারণে তিনি সর্বমহলে আদৃত হয়েছিলেন।

২০১৫ সালে মিয়ানমারের প্রথম নির্বাচনে তিনি জয়ী হন। তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়৷ সামরিক বাহিনীর সাথে মিলিমিশে তিনি স্টেট কাউন্সিলর পদ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। নামে গণতন্ত্র কাজে সামরিক কর্তৃত্ব এর উপর ভর করেই মিয়ানমার এগিয়ে চলছিল। ২০২১ সালে এসে সেই চলা বাধাগ্রস্ত হল। সামরিক বাহিনী পুনরায় তাকে বন্দি করে ক্ষমতা দখল করলো।

অভ্যুত্থান নিয়ে জানতে পড়ুনঃ মিয়ানমার অভ্যুত্থানঃ কি ঘটছে এবং কেন ঘটছে?

ক্ষমতার পথ

সুচি ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যকার সময়ে প্রায় ১৫ বছর গৃহবন্দী ছিলেন। সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন। নির্যাতনের বিপরীতে তার শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ তাকে আন্তর্জাতিক শান্তির প্রতীকে পরিণত করেছিল।

২০১৫ সালের নির্বাচনে সুচির দল ভূমিধস বিজয় পেয়েছিল। এরপরও মিয়ানমারের সংবিধান তাকে দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে বাধা দেয়। ১৯৮৮ সালের সংশোধিত সংবিধানে সুচির প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকাতে কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছিল।

সংবিধানের ৫৯-চ ধারাতে আছে – যে ক. যার পিতা বা মাতা কেউ বিদেশী হবেন; খ. যার বিদেশী স্বামী বা স্ত্রী থাকবে গ. যার বিদেশী স্বামী বা স্ত্রীর বংশজাত বিদেশি নাগরিক সন্তান থাকবে তাকে দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে দেয়া যাবে না৷

সুচি ভিন্ন দেশের নাগরিক বিয়ে করেছিলেন। তার দুই সন্তানের বিদেশী নাগরিকত্ব আছে। এতকিছুর পরেও সুচি দেশটির অবিসংবাদিত নেত্রী। তার প্রশাসনিক পদ ছিল স্টেট কাউন্সিলর। ২০২১ সালের অভ্যুত্থান পূর্ব পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টের সাথে সুচির সদ্ভাব ছিল।

এখানে একটি তথ্য জানিয়ে রাখি স্টেট কাউন্সিলর পদটি সৃজনের সময় জান্তা বাহিনীর প্রতিনিধিরা সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেছিল। আর এই পদটি তৈরির আইনগত পথটি দেখিয়ে দিয়েছিলেন সুচির আইনগত উপদেষ্টা উ ক নি। এই উ ক নি একজন মুসলিম ছিলেন। ২০১৭ সালে রেঙ্গুনে উ ক নি-কে হত্যা করা হয়।

২০২০ সালের নির্বাচনে সুচির দল এনএলডি ২০১৫ সালের নির্বাচনের চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে পুনরায় জয়ী হয়। বর্তমান ক্ষমতাসীন শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে এই ফল প্রত্যাখান করে৷ পার্লামেন্টের নতুন অধিবেশন শুরুর পূর্বে সামরিক বাহিনী সুচি ও তার দলের অনেক নেতাকে গ্রেফতার করে। এরপর জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে এক বছরের জন্য ক্ষমতা নেয় সামরিক বাহনী।

অবৈধভাবে যোগাযোগের সামগ্রী আমদানির অপরাধে সুচিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পুলিশ বলছে তারা সুচির কাছে ৭ টি ওয়াকিটকি রেডিও পেয়েছে, যা রাখার আইনগত অধিকার সুচির ছিল না।

হোয়াইট হাউজে বারাক ওবামার সাথে সুচি

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

সুচি মিয়ানমারের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক জেনারেল অং সানের মেয়ে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির সূচনালগ্নেই জেনারেল অং সান গুপ্তহত্যার শিকার হন।

১৯৬০ সালে সুচি তার মায়ের সাথে ভারত গিয়েছিল। সুচির মা খিয়ান চি দিল্লীতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মনোনীত হয়েছিলেন। চার বছর পর সুচি ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়৷ সেখানে সুচি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এখানেই মাইকেল আরিস নামের ব্যক্তির সাথে সুচির পরিচয় হয়। এই আরিসকেই সুচি বিয়ে করেছিলেন।

জাতিসংঘ, জাপান ও ভূটান সহ বিভিন্ন দেশে কাজ করে সুচি ব্রিটেনে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। দুই সন্তান কিম ও আলেকজান্ডারকে নিয়ে ছিল সুচির জীবন। কিন্তু মিয়ানমার তার চিন্তায় সদা জীবন্ত ছিল।

১৯৮৮ সালে সুচি রেঙ্গুনে তার অসুস্থ মাকে দেখতে আসেন। সেই সময় মিয়ানমার রাজনৈতিক অস্থির সময়ের মধ্যগগণে ছিল। হাজার হাজার ছাত্র, বৌদ্ধ ভিক্ষু, কর্মজীবী মানুষেরা গণতন্ত্রের দাবিতে রাজপথে অবস্থান নিয়েছিল।

অবস্থা প্রত্যক্ষ করে ১৯৮৮ সালের ২৬ আগস্ট এক বক্তব্যে সুচি বলেছিলেন, ‘এখানে যা ঘটছে তা দেখে আমার বাবার মেয়ে হিসেবে আমি উদাসীন থাকতে পারি না’। তিনি জেনারেল নে উইনের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে চলমান বিদ্রোহে নেতৃত্বের হাল ধরেন।

সুচি, মাইকেল আরিচ ও তাদের সন্তান আলেকজান্ডার

গৃহবন্দী সুচি

মার্টিন লুথার কিং, মহাত্না গান্ধীর অহিংস আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সুচি দেশজুড়ে সমাবেশ ও র‍্যালির আয়োজন করে। শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে সুচি আন্দোলন চালিয়ে যান।

সামরিক বাহিনী এই আন্দোলনকে নৃশংসভাবে দমন করে। ১৯৮৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন থান শুয়ে এবং সুচিকে গৃহে অন্তরীণ করে রাখেন। এখানে বলে দেই, এই থান শুয়েকে বার্মার রহস্য পুরুষ বলা হয়৷ তিনি ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত দেশ শাসন করেছেন।

মিয়ানমারের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় থান শুয়ের ব্যাপক ভূমিকা আছে। নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করার বুদ্ধি থান শুয়ের মাথা থেকেই আসে। বর্তমান জেনারেল মিং অং হ্লাই-কে কয়েক ডজন জ্যেষ্ঠ অফিসারকে ডিঙিয়ে সেনা প্রধান বানিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে ব্রিটেনের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্রয় করতে চেয়ে আলোচিত হয়েছিলেন।

সামরিক সরকার ১৯৯০ সালে নির্বাচন আয়োজন করে। এখানে সুচির দল এনএলডি জয় পায় কিন্তু জান্তা সরকার সুচির হাতে ক্ষমতা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ১৯৯৫ সালে সুচিকে মুক্তি দেয়া হয়। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মান্দালে শহরে ভ্রমণের চেষ্টা করলে ২০০০ সালে সুচি পুনরায় গ্রেফতার হন।

২০০২ সালে সুচিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয়। মাত্র এক বছর পর সুচির সমর্থক ও সরকার সমর্থিত দাঙ্গাকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে পুনরায় কারাবন্দী হন সুচি। তাকে বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়৷ এবার তিনি এনএলডি নেতাকর্মী সহ নির্ধারিত কিছু কূটনীতিকদের সাথে সাক্ষাৎ-এর অনুমতি পান। এর আগের সময়ে তিনি এই সুযোগ পাননি। এমনকি তিনি তার দুই সন্তান ও স্বামীর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি।

১৯৯৯ সালে সুচির স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অসুস্থতার চরম পর্যায়ে জান্তা সরকার সুচিকে ব্রিটেনে যাওয়ার প্রস্তাব করেছিল। পুনরায় দেশে ফিরে আসার অনিশ্চয়তা থাকায় সুচি সেই সময় ব্রিটেনে যাননি।

গৃহবন্ধী  দশা থেকে মুক্তির পর ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত সুচি

রাজনীতিতে পুর্নপ্রবেশ

২০১০ সালে কয়েক দশক পর মিয়ানমারের প্রথম নির্বাচন হয়। নির্বাচনে সুচিকে বাইরে রাখা হয়। কিন্তু নির্বাচনের ছয়দিন পর সুচিকে মুক্তি দেয়া হয়। তার সন্তান কিম এক দশক পর মায়ের সাথে দেখা করার সুযোগ পায়। নতুন সরকারের সংশোধন প্রক্রিয়ার সুচি ও তার দল পুনরায় অংশগ্রহণ করে। এর আগে ১৯৯০ সালেও এমন আলোচনা হয়েছিল কিন্তু ফলপ্রসূ কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। ২০১২ সালের এক উপনির্বাচনে সুচি জয়লাভ করে এমপি ও বিরোধী দলের নেতা হন। একই বছরের মে মাসে তিনি ২৪ বছর পর দেশের বাইরে যান।

রোহিঙ্গা সমস্যা

সুচির স্টেট কাউন্সিলর থাকাকালীন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। ২০১৭ সালে লাখ রাখাইন স্টেটে সামরিক বাহিনীর অভিযানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে গণহত্যার অভিযোগে মামলা চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত দেশটিতে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত করছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যা, ধর্ষণ থামাতে সুচির নির্লিপ্ততা ও এসব জঘণ্য কাজের মূল হোতা সামরিক বাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করায় সুচি বিশ্বব্যাপী তার পূর্ববর্তী সমর্থকদের দ্বারা নিন্দিত হয়েছেন।

স্বল্প সংখ্যক বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন, ‘জটিল ইতিহাস ও বহু-সংস্কৃতির দেশ শাসনে সুচি প্রয়োগবাদী নীতি অনুসরন করছেন’। এইদিকে, আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে জান্তা সরকারের পক্ষে সুচির অবস্থান তার আন্তর্জাতিক ইমেজকে নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সর্বোপরি অং সান সুচি বার্মার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়। বলা হয়ে থাকে, রোহিঙ্গাদের প্রতি তার কিঞ্চিৎ সহানুভূতি রয়েছে।

মিয়ানমার নিয়ে আরও জানতে পড়ুনঃ মিয়ানমারের একাল সেকালঃ নতুন করে সেনা শাসনের সূচনা

সবকিছু থমকে গেল

ঔপনিবেশিক যুগের আইন অনুযায়ী মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক নির্যাতনের জন্য সুচি ও তার দল ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছেন। সুচি এরপরও কিছু বিষয়ের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। তবে সামরিক বাহিনীর পুরো লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। সামরিক বাহিনী দেশটির তিন প্রধান মন্ত্রণালয় (পররাষ্ট্র, সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা) নিয়ন্ত্রণ করতেন।

২০১৮ সালে সুচি মন্ত্রীসভায় জেনারেলদের অন্তভূর্ক্তি নিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা বরং ভালো’। সেই সময় কিছু বিশ্লেষক বলেছিলেন, ‘এটা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার কর্ম থমকে যাওয়ার লক্ষণ’।

সবকিছু ছাপিয়ে বার্মায় সুচির জনপ্রিয়তা এখনও অনেক বেশি৷ ২০২০ সালের পিপলস অ্যালায়েন্স ফর ক্রিডিবল ইলেকশন এর জরিপ বলছে, ৭৯% মানুষ সুচিকে বিশ্বাস করে। গত বছরে এই হার ছিল ৭০%।

সুচি সম্পর্কে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেরেকে মিচশেল বলেছেন, ‘সুচির গল্প আমরা যা জানি তা এর চেয়েও ব্যাপক। তিনি সম্ভবত পরিবর্তন হবেন না। তার মাঝে সহনশীলতা আছে এবং তার ভিতরের জটিল রয়াসন সম্পর্কে আমরা এখনও অবগত নই। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে কিছু চিত্তাকর্ষক চিত্র দিয়েই একজন মানুষকে অলংকৃত করা উচিত নয়।’

তথ্যসুত্রঃ বিবিসি, আলতাফ পারভেজের বই ‘বার্মা জাতিগত সংঘাতের সাত দশক’

লেখকঃ গবেষক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন