অতৃপ্ত অবেলায়

মাহজেবিন মম

আম্মা টাকা দাও নতুন মোবাইল কিনব বলল রিফাত। একটু সবুর কর বাবা, তোর ভাইয়া কল করলেই বলব টাকা পাঠাতে। ঠিক আছে, তবে বেশি দেরি করোনা যেন। আমার মোবাইলের খুব দরকার।

রাজিয়া বেগমের দ্বিতীয় পুত্র রিফাত। টেনেটুনে এইচএসসি পাশ করেছে। এরপর আর পড়ালেখা করেনি। সারাদিন বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ায় আর টিকটক ভিডিও বানায়। এক বন্ধু নতুন মডেলের ফোন কিনেছে বলে তারও সেই মডেলের ফোন ই লাগবে বলে জেদ ধরেছে।

সারাদিন গাড়ি চালিয়ে রুমে ফিরেই বাবার ফোন থেকে ইমুতে কল দেখতে পেল রাহাত। জরুরি দরকার কিনা বা বিপদ আপদ হয়েছে কিনা মনে করে দ্রুত কল দিল দেশে। গত সাত বছর ধরে সৌদি আরবে ড্রাইভারের কাজ করে রাহাত। গ্রামে বাবা মা, স্ত্রী রুবি, ছোট্ট ছেলে রাফি আর ছোট দুই ভাই বোন রিফাত, রিয়া কে নিয়ে সংসার। ফোনের ও প্রান্তে বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে। রিফাতের নতুন মোবাইল কেনার জন্য টাকা পাঠাতে বলে ফোন রেখে দিয়েছেন রতন মিয়া। ক্লান্ত, অবসন্ন মনে টাকা যোগাড়ের চিন্তায় নিমগ্ন হলো রাহাত।

ছাত্র হিসেবে খুব একটা খারাপ ছিল না রাহাত। কিন্তু এইচএসসি পাশ করার পর সংসারের হাল ধরতে ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে চাইলেন রতন মিয়া। কিছু জমি বিক্রি করে আর গ্রামীণ ব্যাংক, আশা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ছেলেকে পাঠিয়ে দিলেন সৌদি আরব। ছেলের পাঠানো টাকায় ঋণ পরিশোধ করে বিশাল বড় দুই তলা বাড়ি করার কাজে হাত দিয়েছেন তিনি। বড় ছেলের টাকায় ঘর এবং জমিজমা কিনলেও সেগুলো লিখিয়েছেন দুই ছেলের নামেই। তাই ছোট ছেলে রিফাতও বিন্দাস ঘুরে বেড়ায়। টাকার প্রয়োজন হলে বড় ভাই তো আছেই৷

মাস শেষে উপার্জনের বেশিরভাগ টাকা বাবার হাতে তুলে দেওয়ার পর কিছু টাকা স্ত্রী রুবিকে পাঠায় রাহাত। সেই টাকা ছেলে রাফির চিকিৎসা, আবদার, নিজের জামা কাপড় সব কিছুর জন্য ব্যায় করে রুবি। কিন্তু এই টাকার উপরেও খবরদারি করে তার শ্বশুড় শ্বাশুড়ি। নিজের স্বামীর উপার্জনের টাকারও জবাবদিহিতা করতে হয় বলে রুবির খুব দুঃখ হয়। সে প্রায়শই রাহাত কে বলে কিছু টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে এসে ব্যবসা করতে। কিন্তু রাহাতের বাবা মা একটার পর একটা আবদার করেই চলে। দু তলা বাড়ি, নিজেদের পুকুর, জমিজমা কেনা সহ হাজারো দাবি তাদের। বাবা মায়ের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য, পরিবারের সদস্যদের একটু স্বচ্ছল জীবন উপহার দেওয়ার জন্য রাহাতও দেশে ফিরার ইচ্ছে মাটি চাপা দেয়।

ছেলে রাফি এখনও বাবা কে সরাসরি দেখেনি। আজও কোলে চড়েনি বাবার। রুবির সাথে বিয়ের চার মাস পর রাহাত যখন সৌদি আরব ফিরে যায় তখন রুবি গর্ভবতী। এরপর রাফি জন্মালো, দুই বছর বয়স হয়ে গেলো এখনও নিজের বাবাকে কাছে পায়নি৷ রাহাতও ছেলেকে ভিডিও কলেই দেখেছে। ছুটিতে দেশে আসার পরিকল্পনা করার পরেই করোনার জন্য বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷

এরই মাঝে গ্রামের বাজারে জমি বিক্রি হচ্ছে। রতন মিয়া বড় ছেলেকে টাকা পাঠাতে বললেন। করোনার লকডাউনে টাকা পয়সা হাতে নেই রাহাতের। এই কথা বলার পর মা রাজিয়া বেগম বললেন – বউমার এতগুলো গয়না শুধু শুধু পড়ে আছে। ওগুলো বিক্রি করে জমি কেনা যাবে। গয়না তো পরেও কেনা যাবে। শুধু শুধু গয়না জমিয়ে রেখে কি লাভ এমনটাও বললেন তিনি।

রুবির বাবার দেয়া গয়না গুলো তার মায়ের শেষ স্মৃতি। এগুলোকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজি নয় সে। রাহাতের কাকুতি মিনতিতে গয়না দিতে রাজি হয় সে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে জমি লেখা নিয়ে। রফিক সাহেব দুই ছেলের নামেই জমি রেজিস্ট্রি করবেন। কিন্তু রুবি এতে বাধ সাধে। ভবঘুরে রিফাতকে জমি দেওয়ার কোন মানেই সে খুঁজে পায়না। এর আগে কয়েকবার রাহাতের টাকায় রিফাতের নামে জমি কিনেছেন রতন মিয়া এবং রাজিয়া বেগম। এবার রুবি বলল জমি কিনলে রাফির নামে কিংবা তার নামে লিখে দিতে হবে। এসব নিয়ে ঝগড়াঝাটি চলতে থাকে সংসারে। অবশেষে রুবির নামেই জমি রেজিস্ট্রি করা হয়।

রাহাত কে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। দুইদিন আগে রুবিকে জানিয়েছিল কিছুটা ঠান্ডা লেগেছে আর জ্বর এসেছে। বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও রাহাতের খোঁজ না পেয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করা হয়। দূতাবাস থেকে খোঁজ নিয়ে জানানো হয় রাহাত সাতদিন আগে মারা গিয়েছে। মৃত্যুর আগে করোনার সব লক্ষণ স্পষ্ট থাকায় সরকারি ভাবে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। এই খবর শুনে মূর্ছা যায় রুবি। এত বড় দুনিয়াটা হঠাৎ ই সংকুচিত হয়ে যায় তার কাছে।

দুই মাস পর এক সন্ধ্যায় একমাত্র ননদ রিয়া রুবির ঘরে এসে দরজ বন্ধ করে দেয়। কিছুটা অবাক হয়েই রুবি বলল ‘ কি হয়েছে রিয়া? দরজা বন্ধ করলে কেন? ‘ রিয়া বলল ‘ ভাবি তুমি এই মুহূর্তে পালিয়ে যাও। বাবা মা তোমার সাথে ছোট ভাইয়ার বিয়ে দিতে চাইছে। তুমি রাজি হবেনা বলে জোর করে বিয়ে দেয়া হবে। তোমার নামে বাজারে যে জমিটা আছে সেটা হাত করতে আর বড় ভাইয়ার সব সম্পত্তি পেতেই এই পরিকল্পনা করেছে ওরা। তুমি রাফি কে নিয়ে পালিয়ে যাও’।

রিয়ার কথা শুনে রুবি হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর ধীরে ধীরে আলমারি খুলে বিয়ের মেরুনরঙা শাড়ি আর রাহাতের পাঞ্জাবিটা বের করল। বিয়ের পরের চারমাস সময় আর রাহাতের রেখে যাওয়া এই পাঞ্জাবিটাই তার একমাত্র অবলম্বন। স্বামী মানে রুবির কাছে শুধুই চার মাস সময়। স্বামী হিসেবে প্রবাসী কাউকে সে কোন কালেই চায়নি। কিন্তু ভাগ্যের জেরে রাহাতের সাথে বিয়ে হলো।

বিয়ের পর প্রবাসী স্বামী নিয়ে সব আক্ষেপ ঘুচে গিয়েছিল তার। রাহাতের আচরণের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে প্রাণপণে ভালবেসেছিল রুবি। সেই ভালবাসার মানুষটির আর দ্বিতীয় বার দেখা পাওয়া হল না তার। অতঃপর বিয়ের শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং ছেলেকে নিয়ে অজানার পথে রওয়ানা হল রুবি। রুবি জানেনা সে কোথায় যাবে। বিশাল এই দুনিয়ায় একটু খানি স্বার্থহীন জগতের সন্ধানেই তার এই অজানার পথে যাত্রা…………

লেখক- শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন