আমি রেনু বলছি

নাজমা বেগম নাজু

অসীম আদরের গোলাপ পাপড়ি
আমার বাচ্চারা, জানপাখি
সোনাবাবু আমার,
জীবন আমার,
আঁধার ঘরের আলো,
খু– ব কাঁদবে আমার জন্য।
বিশ্বাস করো—
বিশ্বাস করো——-
আমি ছাড়া যন্ত্রনাদগ্ধ বিক্ষত এই ত্রিভূবনে
কেউই নেই
ওদের কেউ নেই আর।
বছর দুয়েক হলো
ওদের বাবাটা অন্যের হয়ে গেছে।
পাষন্ড এক
পাষান হৃদয় সে–
কেঁদে যদি মরে অবুঝ বাচ্চা দুটি
কচি দুটি পেট ক্ষুধার আগুনে
পুড়ে অংগার হোক
তবু সে পাষাণ বলবে না কোনদিন
খাও বাছা সোনা মানিক আমার
একমুঠো ভাত খাও।
আর মেরোনা! উহ্!! বড্ড ভীষণ–
লাগছে, দোহাই তোমার,
একটু থামো, একটা নিমেষ একটু ভাবো,
মারো যত খুশি তারপর
একবার ভাবো – শুধু একবার
কি দোষ আমার??
দেখো চেয়ে আমি বিদূষী মেধাবী
বিদ্যাপিঠের সেরা একজন,
আমি শিক্ষিকা এক,
যত্নে পড়াই চাঁদ ছোঁয়া সব
স্বর্গের দূত সোনামনি সারাবেলা।
আর মেরো না পায়ে পড়ি শোনো
তুমিতো আমার ভাই-
মাগো তুমিও তো এক জননী
তোমারও রয়েছে আদরিনী এক দুচোখের মনি
তুমিও তো এক মা,
তুমি কেন মারো মাগো
তোমার লাঠিতে বড় বেশি ধার।
ছেড়ে দাও বাবা, জনক তুমি
এ ভাবে মেরো না,
শক্ত লাঠিতে শক্ত দু হাতে শক্তি দানব
উল্লাসে নাচে
অনেক শক্তি – কী ভীষন দেখো
ভাংছে আমার পাঁজরের হাঁড়–,
সবগুলো ঘর হৃদপিন্ডের ফুটো করে পিঠ ফেঁড়ে
বিদ্ধ করেছে মাটি।
শোনো, চিৎকার করার শক্তি তো বাকি নেই
এই গোঙানী, আর্তনাদের করুনাকামী সুর,
এটাই আমার কালভেদী চিৎকার।
দুটি পায়ে পড়ি
করজোড়ে করি মিনতি সবার কাছে,
পাষান পৃথিবী — পাষানী তোমার কাছে
বিনা দোষে আমি অপরাধী তবু
পায়ে ধরে আমি করছি মিনতি
ভিক্ষা চাইছি জীবন,
আমাকে ভিক্ষা দাও——-।
আর কত লাঠি ভাংবে আমার দেহে?
একটাও হাড় বাকি নেই আর
সব ভেংগে চুরমার।
একবার পাওয়া জনমের তরে
একটিই এ জীবন–
আমাকে ভিক্ষা দাও
আর কোনদিনো চাইব না কিছু—।
হৃদয়ে রেখেছি হৃদয়ের ধন
বুকের মানিক বাচ্চা যে দুটি,
শুধু একবার, একটিবারের তরে
যেতে দাও আমাকে, খুব কাছাকাছি–
যেন দুহাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিতে পারি,
যেন পাখির মত আরো একবার
ডানার পরশে ঢেকে দিতে পারি
সব ব্যথা- ক্ষুধা -ভয়।
আর মেরো না, এত ভাঙা চোরা হাড়
চুপসানো ফুসফুস, শত ছিদ্রের মৃতপ্রায় হৃদপিন্ড,
কি করে আমার কোল ভরে নেব
কি করে খাবার মুখে তুলে দেব
এত দেরি দেখে কাঁদছে ক্ষুধায়
জানপাখি যাদুমনি।
উহ্!! নিশ্বাসে এত কষ্ট দহন–
পৃথিবীর শ্বাস– বাতাস কোথায়—-
বাতাস–
একটু বাতাস—-

———————
———————-
———————-

এখন আমি
অনেক দুরের,
তারার আকাশে
নক্ষত্র রাত ছুঁয়ে থাকি।
আমি দেখছি
এখনো আমার
ধূলোয় পড়ে থাকা
নিথর শরীরে
শত হায়েনার লাথি।
জারজ পাথরের অবিরাম করাঘাতে
চুপসানো হৃদপিন্ড-
শত কোটি ক্ষত মৃতপ্রায় হৃদপিন্ডে।
কুকুর আর জানোয়ারের
লোমশ রাক্ষুসে হাতে
ভাংছে হাজারো লাঠি।
আমার দেহটা-
মৃতদেহ অনেক আগেই।
এখন আর ব্যথায় কাঁদে না
কাঁপে না আর্তনাদে-
মৃতদেহ কাঁদতে জানে না।
শুধু তুবা কাঁদে,
আমার ছেলেটা–
বুকের মানিক, জান পাখি আজো————

 

কবিঃ

সাহিত্যিক ও জাতিসংঘের প্রথম কন্টিনজেন্ট  নারী কমান্ডার

আরও পড়ুন