এইচ বি রিতা’র প্রথম উনন্যাস “বিনু’র পাঠ প্রতিক্রিয়া : আবদুল কাদের আরাফাত

এইচ বি রিতা’র প্রথম উনন্যাস “বিনু’র পাঠ প্রতিক্রিয়া : আবদুল কাদের আরাফাত

একজন এইচ বি রিতা, অনেক পরিচয় । পেশায় শিক্ষক হলেও কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী হিসেবে সমাদৃত । প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার নিয়মিত লেখিকা তিনি, সোস্যাল মিডিয়াতে তিনি ডার্ক এভিল নামে পরিচিত । চারটি কাব্যগ্রন্হের পাঠকপ্রিয়তার পর ২০১৯ সালের অমর একুশে বইমেলায় মলাটবদ্ধ হয়েছে এইচ বি রিতার প্রথম উপন্যাস “বিনু” ।
বই কিনে পাঠ শেষ না করা পর্যন্ত যেমন অস্হিরতা বোধ করি তেমনি কিছু বই পাঠে যদি পাঠক হৃদয়ের আত্নতৃপ্তি প্রকাশের চেষ্টা করা না হয় তবে কেমন যেন অস্বস্তি থেকেই যায় । “বিনু”তেমন একটি বই । বইটি পাঠে মোটেই মনে হয়নি এটা লেখিকার প্রথম উপন্যাস বিনু’র নির্মানশৈলী দ্যুতি ছড়িয়েছে স্বকীয়তায়। কবিতার বই পাঠের পর কয়েক লাইনের পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখা কঠিন কিছু নয়, কেননা প্রতিটি কবিতারই আলাদা বৈশিষ্ট থাকে, অনেকটা স্বল্প পরিসরেই আলোচনার ইতি টানা যায় । সেক্ষেত্রে উপন্যাস সম্পুর্ণ ভিন্ন, এখানে একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকে, ছোট ছোট আরও কিছু চরিত্র কেন্দ্রীয় চরিত্রকে ঘিরে রাখে, এখানে একে অপরের পরিপুরক, কেন্দ্রীয় চরিত্রকে এখানে রান্নার মুল উপাদান ধরলে বাকি চরিত্রের কেউ লবণ, মরিচ. মশলা ইত্যাদি । এই প্রথম কোন উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলছি, বুঝতেই পারছিনা কোন দিক থেকে শুরু করবো ।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিনু, । ‘বিনু’ যদিও মাত্র দুটি অক্ষরের ছোট একটি নামের তরুনী কিন্তু এই দুটি শব্দের মতই তার জীবনের প্রতিটা ক্ষত্রে রয়েছে দুটি ভিন্ন রুপ। কোন রাখঢাক ছাড়াই মায়ের মনে কষ্ট যেমন সে দিতে পারে, আবার উজাড় করা ভালবাসায় মায়ের চোখে আনন্দের জলে ভরে দিতেও সময় লাগেনা মেয়েটির। অন্যায়, মিথ্যাকে চরম ঘৃণা করা মেয়েটিই অনবরত মিথ্যা বলে যায় খালার সাথে, কখনো মায়ের সাথে। কাউকে কষ্ট দিয়ে, অযথা মিথ্যা বলে ভড়কে দিয়ে সে মানুষটার করুণ চোখ দেখতে ভালোই লাগে বিনুর। অন্যকে সহজেই পড়ে ফেলা মেয়েটি জানেনা জীবনের বাঁকে তার অপেক্ষায় কি রয়েছে। জীবনে হার না মানা মেয়েটি, যে অনেক প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং চলছে সে কেমন করে নিজ পরিবার ও পরিচিতজনদের সাথে অন্য একরুপে নিজেকে উপস্থাপন করে? সত্যিই কি বিনু এমনই? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোন রহস্য.?
এই ঘোর লাগা রহস্যের স্বরুপ উম্মোচনে বিনু পাঠ করেছি মনোযোগী পাঠক হয়ে , বেশ কয়েক বার মনে হয়েছে এই বুঝি বিনুর বাঁক বদল হবে, বিনু রহস্য বুঝি এবার ধরা দিবে, অথচ পুরা উপন্যাস জুড়ে মনে হয়েছে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের রং বদলে যেমনি আবার আকাশের নীল ফিরে আসে বিনু তেমনই । বিনুকে রহস্যময়ী করেই রেখেছেন লেখিকা, বিনুকে কোন ফ্রেমে বেধে রাখা যায় না ।
চিরচেনা বিনু কিভাবে মাঝে মাঝে এত অচেনা হয়ে উঠে তা ফুটে উঠেছে এভাবে –
‘’বিনু এবার চোখ খুলল। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকমের লাল। মঞ্জু বেগম আঁতকে উঠলেন। তিনি বহুদিন এমন চোখ দেখেননি। বিনু বলল,
‘খালা শোন! আমরা বহু বছর এক সাথে কাটিয়ে দেই, এক সাথে বংশ বিস্তার করি, একদিন একই বৃত্তে থেকে থেকে মরে যাই। এটাই নিয়ম। মানুষ বলেই নিয়ম মানি, ইচ্ছে না হলেও মানি। প্রতিটা মানুষের ভিতর সুপ্ত একটা পশুর বাস’’।
নিরেট বাস্তবতার কঠিন উচ্চারণে যে বিনু এগিয়ে থাকে সর্বদা, সে বিনুর কোমল হৃদয়ের ভিন্ন রুপ দেখা যায় খুব সহজেই-
‘’প্রচন্ড মাথা ব্যথা নিয়ে বিনু চোখ বন্ধ করে আছে। বাহিরে আজ ফকফকা জোৎস্না। ঘরময় ঘুটঘুটে অন্ধকার। যেন আলোর সাথে তার বড় বিরোধ। অল্প আওয়াজে নিকোলো প্যাগানিনির স্লো-ভায়োলিন সংগীত বাজছে! বিনুর চোখ বন্ধ। ঘরময় দারুন নিস্তব্দতার মাঝে হঠাৎ মনে হল, চোখের পাতায় কেউ স্পর্শ করে ডাকছে-
‘বিনু! চলো আজ জোৎস্নাস্নান করি। তারপর ভেজা শরীর শুকাতে দিয়ে, তোমায় ঘুম পাড়িয়ে দেই’’!
প্রকৃতপক্ষে এইসব রাতে বিনুকে খুব অন্যরকম মনে হয়, যেন খোলসের ভিতর হতে বেড়িয়ে আসা গ্রিক পুরাণের অরণ্যদেবী আর্টেমিস!
একটা পর্যায়ে চিত্রপটে বিনুর মামাতো ভাই সামিনের আগমনে মনে হয়েছিলো বিনু এবার হয়তো সামিনের তীরে নাও ভীড়াবে, সামিনকে পছন্দও করলেও বিনু নিজকে কোন অজানা অভিমানে সরিয়ে রেখেছিলো তা রহস্যই থেকে গেল ।
‘বিনু’ উপন্যাসের অন্যতম একটি চরিত্র বিনুর মা রাহেলা বেগম । ত্রিশ বছর আগে বিধবা হয়েও সঙ্গীহীন নিরন্তর যুদ্ধ করে চলেছেন সামাজিক বৈরিতা আর অনিয়মের বিরুদ্ধে । তিনি বিনুর দুষ্টুমিতে যেমনি ভড়কে যান তেমনি ঠিকই বুঝেন বিনু কখনো নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিবে না । বিনু যে মাকে ভীষণ ভালবাসে তাও বুঝে নেন অবলীলায় ।
আরও একটি অন্যতম চরিত্র বিনুর খালা মন্জু বেগম । আচরণে সরলতা আর প্রিয়জনদের প্রতি গভীর মমতা ফুটে উঠলেও সন্দেহপ্রবণতায় মন্জু বেগম দ্বিধায় ফেলে দেন, দ্বিমুখিতা ফুটে উঠে কখনো কখনো । পানখোর স্বামীর পান খাওয়া নিয়ে মন্জু বেগমের এত বিরোধ অথচ নিজেই স্বামীর জন্য নতুন পিকদানী কিনে আনেন । বিনুর খালু নতুন কোন মেয়ের প্রেমে পড়েছেন এই সন্দেহ থাকলেও নিদ্ধিধায় বিশ্বাস করেন- রায়হান আহমেদ প্রচন্ড ভালোবেসেই মন্জু বেগমের অদ্ভুত সব পাগলামী মেনে নেন ।
স্বল্প পরিসরে আরও কিছু চরিত্র রুপায়নে লেখিকা সফল হয়েছেন, যেমন- রায়হান আহমেদ, সালাউদ্দিন, রোকসানা ।
এটুকু বলতে পারি উপন্যাসটির ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণ করে পুন:পাঠের আবেদন তৈরীর অজস্র উপাদান। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদে ১১১ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে অন্যধারা প্রকাশনী । বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মৌমিতা ভট্টাচার্য্য ।

আরও পড়ুন