গল্প

ভারসাম্য

        -আনোয়ারা বেগম।
কবিগুরুকেই মনে পড়ে বেশী আজ।
ভালোবাসা আর মৃত্যু,দু’টোই নিমন্ত্রণবিহীন অতিথি।একজন এসে নিয়ে যায় মন, আরেকজন জীবন।
নীরব,নিস্তরঙ্গ অনন্যার জীবনে বিনা নিমন্ত্রণে কিভাবে ভালোবাসা এসেছে,সাতটি বছর তাকে ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত করে গিয়েছে,
অনন্যা জানেনা।
আর মৃত্যু ! প্রতিমুহুর্ত তার জন্য চলছে প্রতীক্ষা। কবে ওর দেখা পাবে সে ?
মনে পড়ে, সাতাশ বছর আগে বহু কষ্টে,উঁচু পর্যায়ে তদ্বীর করে, বিয়ের তিনমাস পরেই অনন্যা বদলী হয় তার স্বামী সজীবের জেলায়, একই কর্মস্হলে যোগদান করে।
তীব্র আনন্দে,উচ্ছাসে,উচ্ছল প্রাণবন্ত দু’জনেই।
একই কর্মস্হলে একই ক্যাডার সার্ভিসের দু’টো পদ শুন্য না থাকায় অনন্যাকে একটু নীচের পদেই যোগদান করতে হয়েছে, বেতনের হেরফের হবেনা ভেবেই অনন্যা রাজী হয়েছে ।
দীর্ঘ সাত বছর অপেক্ষার পর তাদের উভয়ের অভিভাবকদের মতের মিল হলে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বিয়েটা সম্পন্ন হলো। শুধু সামান্য চাকুরীর পদবীর জন্য দু’জন পৃথক বাস করবে? সজীব কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি।
অনন্যার বাবা মা সেই শুরু থেকে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে উদাসীন ও নিস্পৃহ থাকায় তাদের পরিচয়ের দীর্ঘ সাত বছর পর সজীব তার বাবা মার মত পাওয়ার সাথে সাথে দু’জনকে অনন্যার বাবা মার কাছে পাঠায় আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়ে।
সম্পর্কের শুরুতেই অনন্যা একটি কথাই বলেছিলো, দু’পরিবারের সংস্কৃতি,ঐতিহ্য ও সামাজিকতায় অনেকটাই মতপার্থক্য, অনেকটাই বেমানান।
 সজীবের পরিবার কিছুতেই রাজী হবেনা বলে অনন্যা আতঙ্কিত হয়েছিলো যে পরিবারের মতের বাইরে তাদের মিলন হবেনা কখনোই।
যদিও দু’জনেই যথাযথ চাকুরীতে নিয়োজিত ছিলো কিন্তু আশির দশকে এই সামাজিকতাকে অনন্যা এডিয়ে যেতে পারেনি।
হাসিখুশীতে উচ্ছল জীবনটা তিনমাসেই ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো সন্তান নেয়ার প্রশ্নে। অনন্যা  তখনি সন্তান নিতে চায়নি। সজীবের আশংকা তার ৩৭ ছাডিয়ে গেছে,অনন্যারও ৩২,আর দেরী করলে হয়তো সমস্ত স্বপ্ন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে ভেবে সে কোনো প্রতিরোধই নিলোনা, অনন্যাকেও নিতে দিলোনা।
হঠাৎ সকালে বমি,পেটব্যথা।
সজীব ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো, পরীক্ষাশেষে নিশ্চিত হলো।
সজীব ভীষণ উৎফুল্ল,তবে ডাক্তার তাদের বাসা ও অফিসের অবস্হান জেনে দৃঢ়ভাবে আদেশ দিলেন, তিনমাস পুর্ণ বিশ্রাম।
সজীব হাসে,দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে,এতো কাঠখড় পুড়িয়ে বিয়ে হলো। অফিসে যোগ দিলে,অফিসেও কাজের তাড়া।আমি তোমাকে যত্ন করে নিয়ে যাবো। অন্যান্য কর্মকর্তাদের সমালোচনা শুনতে আমি অভ্যস্ত নই। আর
তোমাকে নয়-দশ ঘন্টা না দেখে থাকতে পারবোনা।
অফিসে পাশাপাশি রুম,কাজের ফাঁকে দেখা হয়,কথা হয়,বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া দুপুরের খাবার একসাথে খাওয়া হয়।
অনন্যা বললো,পাহাড়ী পথ,উঁচুনীচু,সরকারী গাড়ীর অবস্হাও তথৈবচ। পুরো দশ মাইল পথ,স্টার্ট দিতে এক ধাক্কা,থামার সময় আরেক ধাক্কা,কিভাবে তোমার সন্তান টিকিয়ে রাখবো ?
সজীব কিছুই বুঝতে চাইলোনা।
সব চুপচাপ মেনে তিনদিন পরেই অনন্যা কাজে যোগ দিলো।
একমাস পরে অফিসের উদ্দেশ্যে সকালে সজীবের পছন্দের সাদার মধ্যে লাল ফুলের জামদানী শাড়ি পড়ে গাড়িতে ওঠে। গাড়ি ধাক্কা খেয়ে স্টার্ট দেয়ার সময়ই পেটে প্রচন্ড ব্যাথা, রক্তক্ষরণ শুরু। অনন্যা নেমে দাঁড়ায়। শাড়ি বদলে গাড়িতে উঠে ডাক্তারের কাছে যায়।ডাক্তার হসপিটালে নিয়ে জানান,গর্ভপাত হয়ে গেছে।পুরোটা ওয়াস করে ফেলে দিতে হবে। ওয়াসের প্রচন্ড যন্ত্রনা সহ্য করে অনন্যা ঘরে ফিরে।ডাক্তারের নির্দেশ তিনমাস বিশ্রাম, শারীরিক আদানপ্রদানও বন্ধ।
সজীবের অনুরোধে সাতদিন পরেই অনন্যা কাজে যোগ দেয়।
সজীব আবার একই খেলায় মেতে ওঠে। শরীরকে পোষ মানাতে চেস্টাও করেনা।
পরের মাসেই অনন্যা আবার কনসিভ করে। সজীবকে জানায়। ডাক্তার আসে,ঔষধ দিয়ে যায়।
সাতদিন পর আবার সজীবের সেই আকুতি। অফিস থেকে ফোনও করা যায়না। পাহাডী এলাকা। টেলিফোন লাইন সচল থাকেনা।
অনন্যা আবার অফিসে আসা-যাওয়া শুরু করে।
যা হওয়ার তাই হলো। গাড়িতে প্রচন্ড ঝাকুঁনি,আবার রক্তপাত।এবার অনন্যা আর ডাক্তারের চেম্বারে গেলোনা,রাগ করে বাসায়
ক’দিন রেস্ট নিয়ে কাজ শুরু করে। ডাক্তারের নির্দেশমতো আর ওয়াস নয়,ব্যাথার ঔষধ খেয়ে কস্ট নিবারণ করে।
সজীব হতাশ,আমাদের আর সন্তানের মুখ দেখা হলোনা।নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করে,তুমি শেষ হয়ে গিয়েছো। আমাকে অন্য কিছু ভাবতে হবে।
সব দোষ অনন্যার ঘাড়ে চাপিয়ে আলাদা কক্ষে দিনযাপন শুরু করে।
অনন্যা অস্হির হয়ে যায়।চরম অবহেলায় তার আমিত্ববোধ,তার আবেগ,আত্মসম্মান ভেংগে চুরমার হয়ে যায়।
প্রেমিক স্বামীর জীবনে সর্বস্ব,সর্বব্যাপী হয়ে থাকার বাসনা ধুলায় লুটিয়ে যায়।
হৃদয়ে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
হঠাৎ একঝলক সুশীতল বাতাসের মতো
 ব্যাচমেট শামীমার একটা ফোন আসে।
অনন্যা, ২১ মার্চ বৃটিশ কাউন্সিলে ইংরেজী ভাষা পরীক্ষা হচ্ছে,লন্ডনে ছয় মাসের কোর্স,দশটি মাত্র সুযোগ,৪০ জন মহিলা কর্মকর্তা পরীক্ষা দেবে,চলে আসো ঢাকা।
অনন্যা উৎফুল্ল,আশান্বিত। ঘন কালো মেঘের আকাশে একটুকরো আলোর ঝলকানিতে প্রাণ ফিরে পেলো।
কখনো বিদেশ যায়নি,তাও বৃত্তি নিয়ে স্বপ্নের দেশ লন্ডনে।
সজীব আপত্তি জানায়,এই শরীর নিয়ে এতোদুর ভ্রমণ করে যাবে কিভাবে ?
খুব কোমল স্বরে,অনেক বুঝিয়ে অনন্যা সজীবের মত আদায় করে।
ঢাকায় পরীক্ষা দিয়ে ফিরে আসে।
তিনদিন পরেই আবার ফোন।
অনন্যা তুমি টিকেছো,আগামী মাস হতে লন্ডনে প্রশিক্ষণ শুরু।
ভিসা ইত্যাদি করে ঠিক সময়মতো সহকর্মীদের সাথে  লন্ডন পৌছে যায়। পেটে তখনো ব্যাথা। পৌঁছানোর সাতদিন পরে ওখানে ডাক্তারের কাছে শরীরের পুরো বিষয়টা খুলে বলে।
ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে বলেন,তোমার সন্তান নস্ট  হয়নি।
আরো বলেন,এটা কারো কারো হয়,কনসিভ করার পর আঘাতে সামান্য ব্লিডিং হতেও পারে।
অনন্যা দু:খে পাগল হওয়ার উপক্রম।
তাহলে আগের সন্তানটিকেও সে বাচাঁতে পারতো!
অনেক ধৈর্য,শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে অনন্যা প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে। প্রশিক্ষণ হতে পাওয়া অর্থ সজীবকে পাঠায় টিকেট কেটে লন্ডন যাওয়ার জন্য।
তার আকাঙ্খিত সন্তানের মুখ তাকেই যে প্রথম দেখতে হবে।সজীব লন্ডনে যায়,মেয়েসহ দু’জন দেশে ফেরে।
মেয়ে বড় হয়। মেয়ে সুবর্ণাকে নিজ বেতনের বিপরীতে ঋণ নিয়ে কানাডায় অধ্যয়নের ব্যবস্হা করে।
সজীব অবসরে যায়।
অনুর আরো ছয়বছর কাজের মেয়াদ রয়েছে।
সজীব বললো,মেয়েটা কানাডায়,তুমিও চাকরী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে দু’জনে কানাডা চলো যাই।
অনন্যা আপত্তি করে। আমার আরো দুটো পদোন্নতি হতে পারে,বেতন বাড়বে,পেনশনে ভালো একটা এমাউন্ট পাবো।
আর মেয়ে মাত্র কানাডা পড়া শুরু করেছে, কেমিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং এর কঠিন পড়া,কোনো কাজ করে অর্থ আয় করতে পারবেনা। তার সমস্ত খরচ আমাকেই দিতে হচ্ছে।তারপরেও নিজেদের অর্থে দীর্ঘমেয়াদে সেখানে ব্যয়বহুল জীবনযাপন কি করে সম্ভব?
অনেকভাবে সজীবকে বোঝাতে চেস্টা করে অনন্যা।
ক্ষীণ হতে থাকা সম্পর্কের ভাংগন শুরু সেই থেকে।
সজীব কাজের সন্ধানে ব্যস্ত হলো।
কিছুদিন পরই একটা আন্তর্জাতিক সংস্হায় কাজ পেলো।
কাজের অজুহাতে কন্যার বয়সী সহকর্মী বিদেশী তরুণীর প্রেমে আজ সজীব আসক্ত,আকন্ঠ নিমজ্জিত।
সর্ববিধ বিচারেই কি অনন্যার চাইতে অধিক মোহনীয়া,আকর্ষণীয়া,অল্পবয়ষ্কা ঐ নারী?
সজীবের মোবাইলে শতো শতো টেক্সট আর যুগল রোমান্টিক ছবি দেখে অনু স্তম্ভিত, হতবাক!
দীর্ঘ তিনযুগের প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের বেড়া ডিংগিয়ে সে আজ নতুন বর্ণীল জীবনে অভ্যস্ত।
মেয়েরা বিদেশে পড়া শেষ করে,কর্মে নিয়োজিত,মায়ের সাথে কথা বলার সময় হয়না।
অনন্যাও আজ অবসরে।পেনশনের অর্থে একটা জীবন নির্বাহ হয়ে যাবে।
দু:খে,লজ্জায়,ঘৃণায় অনন্যা আলাদা একক জীবনে নিজেকে অভ্যস্ত করার আপ্রাণ চেস্টায় ব্যস্ত।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে অনন্যার আর বিস্ময় জাগেনা । নিরুত্তাপ মন শিখে গিয়েছে কিভাবে প্রত্যাশাকে বশে রাখতে হয়।
কস্টগুলো কি মাঝে মাঝে খুব হিংস্র হয়?
তার পাশবিক আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয় ভালোবাসার শরীর ?
একজীবনের সমস্ত পূণ্য দিয়ে ওকেই ভালোবেসেছিলো অনন্যা।
তারই আটঘাট বাঁধা প্রাণপণ নিমন্ত্রণে সজীবের জীবনে পদার্পণ ছিলো অনন্যার।
আজ কতো অবলীলায় ওকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য করে জড়িয়ে নিয়ে গেলো অন্য সম্পর্কে।
শিকড় উপড়ে ফেলার আগে একটুও ভাবলোনা তার বিস্তার কতোটা প্রসারিত হয়েছে !
যতোদিন বেঁচে থাকা ততোদিন কতো আপনজন পর হয়ে যাবে? কতো বিশ্বাসী ভেংগে দেবে বিশ্বাস? কতো স্নেহের ধন ধরবে রুদ্রমুর্তি? কতো চেনা হয়ে যাবে অচেনা?
মহাকালের দাপটে কিছুই থাকেনা।
ভেংগেচুরে তছনছ হয়ে যায়।
এর মধ্য থেকে নুতন কিছু গড়বার প্রত্যাশা কতোটা অমূলক,কতোটা ভিত্তিহীন তা’ যদি সে না বুঝে তবে তার সমস্ত বোঝাপড়াই বৃথা হয়ে যাবে।
০৫.১২.২০২০

আনোয়ারা বেগম,সাহিত্যিক ও ছোটগল্প লেখক।

আরও পড়ুন