জীবন যেখানে থেমে নেই

আরণ্যকে শবনম

উনচল্লিশটা বছর।উনচল্লিশটা বর্ষা পার হলো একে একে।আহমেদ সাহেব একাকী জীবনতরী বয়ে চলেছেন।এমন নির্ঝঞ্ঝাট, সহজ-স্বাচ্ছন্দ্য জীবন,বিলাসিতা নাই, নেই পরিবার-সংসারের ব্যস্ততা।শুক্রবারটা দিনটা এলেই বেশ তোড়জোড়, সুন্দর নীল পাঞ্জাবি পড়ে বের হন।একদম শহরের বাইরে।নিভৃত কবরস্হান। সেখানে কাছের মাসজিদে জুমুয়ার সালাত পড়ে,দীর্ঘ সময় ধরে দাড়িয়ে থাকেন হিজল গাছের নিচে।চোখের চশমা অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে,উষ্ণতায়।রুমাল দিয়ে চশমা মুছে চোখে দেন আবার।এখানে শুয়ে আছে তিনজন,যাদের দু’জনকে তিনি কখনোই দেখেননি।তবুও তাঁর হৃৎপিন্ড আজোও ছলাত ছলাত করে অনুশোচনায়।সেই,সময়টার কথা মনে করেন।মুনিরা-আহমেদ দুজনের পরিণয়, বিয়ের দিন।মুনিরার তখন কুড়ি,আহমেদের তখন বাইশ।ঢাকার একপ্রান্তে এক আবাসিক এলাকায় তাদের বাসা।আহমেদের বাবা-মা দুজনও তাদের সাথেই ছিলেন।শহরের অবস্হা তখন বেশ অস্হিতিশীল।সবাই বলছিলো তাদের গ্রামের দিকে চলে যেতে।আব্বা,আম্মাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলো আহমেদ।পরের সপ্তাহে ওদের যাওয়ার কথা।কিন্তু,শহরজুড়ে কারফিউ।পাশের বাসার ডাক্তার চাচাও চলে গিয়েছিলেন,না ঠিক ওনাকে পাওয়া যাচ্ছে না, কেউ বলতে পারছে না।মুনিরার দেখভাল করতো গ্রাম থেকে আসা ওর আত্মীয়া পনের বছরের রাহেলা।দিব্বি সুস্হ, হাসিখুশি দিন কাটছিলো মুনিরার,কতো গল্প করতো,স্বপ্ন দেখতো, বলতো,”দেখো তোমার জমজ কন্যা হবে,তোমার যা নরম কুসুমকোমল মন,আমরা একত্রে পড়ন্ত বিকেলে উদ্যানে হেঁটে বেরাবো,নৌকায় চড়বো,ঘুড়ি উড়াবো…,এমন ধৈর্যশীলা ছিলো মুনিরা,রাতে একটু ঘুম হতো না ব্যথায়,একা একা কথা বলতো দুজনের সাথে..
গল্প শুনাতো,প্রিয় “বিদ্রোহী” কবিতাও শোনাতো,আমি ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলতাম,ওদের কি বিদ্রোহী কন্যা বানাবে নাকি।শেষের দিকে ফযরের পর কুরআন পড়ে শুনাতো ওদেরো,তাতে নাকি ওরা বেশ সাড়া দিতো।এমনি এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় কারফিউ কমলে রওনা দেই,আমরা।শহর থেকে বের হয়ে,নৌপথে,গাঁয়ের কাছাকাছি পৌছতে বেশ সকাল হয়ে যাবে।মাঝরাত্রিরে ওর রক্তক্ষরন শুরু হলো,আমি কি করবো না করবো,বুঝতে পারছিলাম না।সঙ্গে রাহেলা আর গ্রাম থেকে মুনিরার ছোটভাই এসেছিলো।মাঝি ভাই বলেছিলেন,আর ঘন্টা দুই পর একটা এলাকায় ওর চেনা মহিলা কবিরাজ আছেন।সাথে আনা ওষুধপত্রে তেমন কাজ হলো বলে মনে হয় না।শেষের দিকটায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো,রাত চারটার দিকে যখন মহিলাকে নিয়ে নৌকায় আসা হয়,তখন অবস্হা সাংঘাতিক। আর লিখতে পারছি না।কিন্ত আমার মুনিরা আর ওর কন্যারা স্বাধীন দেশের বুকে হেঁটে বেড়াতে পারেনি।পরদিন ওদের ওখানেই দাফন করা হয়,আমি যুদ্ধে চলে যাই।ওদের গ্রামে পৌছে দিয়ে,ভেবেছিলাম,যুদ্ধে আমিও হয়তো চলে যাব,কিন্তু,যুদ্ধ আমাকে আরো কঠিন যুদ্ধে ফেলে চলে গেলো,সেই উনচল্লিশ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো স্মৃতি…।

আরণ্যকে শবনম কবি  ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন