তুমি রবে আমার হৃদয় গহ্বরে

শামিম হোসাইন

কি অদ্ভুত এই জাতি? আজ সারাদিন শুধু এটাই দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। তাই লেখা এতো রাতে দিলাম। এটা দেখতে চেয়েছিলাম যে দেখি তো কবি ‘আল মাহমুদ’ এর মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে তাদের আয়োজন কি হয়।

তথাকথিত সুশীল সমাজ ও চেতনাবাজ পাঠকমহলে কেমন একটা অবহেলিত ভাব। তাদের কাছে কবি ‘আল মাহমুদ’ তেমন কোনো ব্যক্তিই নয়! তিনি না-কি মৌলবাদী কবি। হায়রে রাজনীতি। যদি জানতাম এদেশের রাজনীতি এতো নোংরা তাহলে “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন”র কাছে বলতাম এদেশে আমাকে জন্ম দিবেন না।

একজন বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদকে শুধু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে অগ্রাহ্য? এরাই নাকি প্রগতিশীল চিন্তার জাতি। আজ থেকে একশ বছর পরের কথা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখবেন সে সময়কার গবেষকরা। কবিতায় যাদের অবদান, এ অধ্যায়ে এসে একটি নাম তাদের লিখতেই হবে। তিনি মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। যাকে আমরা কবি ‘আল মাহমুদ’ হিসেবেই জানি।

একশ বছর পর আল মাহমুদ সম্পর্কে একজন সমালোচক হয়ত লিখবেন, তিনি মৃত্যুর আগেও একবার মরেছিলেন। কারণ, তিনি তার আদর্শ থেকে সরে এসেছিলেন। আরেকজন হয়ত লিখবেন, পঁচা শামুকে পা কেটেছিলেন আল মাহমুদ। তাই মৃত্যুর পর আল মাহমুদের শূন্যতা অনুভব করেননি সেই সময়কার সাহিত্যিকরা।

আল মাহমুদ সম্পর্কে নিজেদের বক্তব্য সত্য প্রমাণে তারা হয়তো রেফারেন্স হিসেবে এখনকার ফেইসবুকের কিছু পোস্ট সংযোজন করবেন। অবশ্য নিজেকে সুশীল এবং বিজ্ঞ সাহিত্য সমালোচক হিসেবে প্রচারই যে এসব পোস্টদাতাদের আসল উদ্দেশ্য সেটা ফুটে উঠবে না এইসব গবেষণায়।

একশ বছর পর হয়তো আরেক দল সমালোচক লিখবেন, ব্যক্তি আল মাহমুদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু তার কাব্যপ্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নাই। যে বা যারা আল মাহমুদের নীতির প্রশ্ন তোলেন তাদের অনেকে হয়তো এটা জানেন না, আল মাহমুদ একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথবা জানলেও আল মাহমুদের কাব্যের স্বরুপ উন্মোচনের ক্ষমতা তাদের নেই।

পাণ্ডিত্যে নিজেদের ব্যর্থতা আড়ালে তাই এরা আল মাহমুদের চরিত্র নিয়ে টানাটানি করেন। অথচ একজন কবির প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার কাব্য কতটা সমৃদ্ধ সেটার বিবেচনায়।

তথাকথিত কবিদের নিয়ে সুশীলেরা ও সেই লেভেলের জ্ঞানীরা ফেইসবুক ও প্রেসক্লাবে বন্দনা ও ন্যাকামি করতে দেখা যায়। আর আল মাহমুদকে নিয়ে নেই কোনো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শোভা। কোন কোন কবি এক পংক্তি লিখেই অমর।

একজন আল মাহমুদও বেঁচে থাকবেন সোনালি কাবিন দিয়ে। সোনালি কাবিনেই বলেছিলেন, ‘পরাজিত হয় না কবিরা’। আল মাহমুদকে পরাজিত করা যাবে না। কোনো একদিন এই জাতি উপলব্ধি করে বলবে, আল মাহমুদকে ছাড়া বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতা কল্পনা করা যায় না।

সাহিত্যের অমূল্য সম্পদের সাথে এমন হীনমন্যতা! এসব তথাকথিতদের ইতিহাস কখনও ক্ষমা করবে না। তাই কবির ভাষাতেই বলি,

রাতের নদীতে ভাসা পানিউড়ী পাখির ছতরে ,
সৃষ্ট ঢেউয়ের পাল যে কিসিমে ভাংগে ছল ছল
আমার চুম্বন রাশী ক্রমাগত তোমার গতরে
ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জায় আগল
(সোনালী কাবিন)

কবি আল মাহমুদ আপনাদের কাছে অতীতে খুব ভালো ছিল। কিন্তু যখন তিনি ১৯৭৮ সালে হজ্বে গেলেন। হজ্ব করে আসার পর থেকেই তাঁকে ‘মৌলবাদী’ বলে আখ্যা দিয়ে দিলেন। আপনাদেরকে জবাব দেওয়ার জন্যই আমার কবি আল মাহমুদ লিখলেন ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কাব্যগ্রন্থটি।

আপনারা কি করলেন? এই কাব্যগ্রন্থের জন্য তাঁকে ‘মৌলবাদী’ আখ্যা দিলেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশ করা বন্ধ করিয়ে দিলেন। আপনারা কবিকে মৃত্যুর এক মূহুর্ত অব্দি পর্যন্ত শান্তি দেন নি। শুধু তাঁকে নিয়ে কুৎসা রটনা করে গেছেন।

লোকটাকে এত কষ্ট দিয়েছিলেন যে লোকটা বাংলা সাহিত্য থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। তাই কবি একবুক অভিমান নিয়ে বাংলাদেশ নামক আজব গুহা থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। আর লিখে ফেলেন,

‘ নিজের পক্ষের লোকেরা যখন ক্রমাগত দুঃখের আয়োজন করেন, তখন কবির জন্য অপার্থিব সুখের আয়োজন করেন তার রব।’

তাই এই নশ্বর পৃথিবী যন্ত্র মানবদের কাছে থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য কবি লিখেন,

‘কোনো এক ভোর বেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’

কবি এই উপরোক্ত লাইন এখনও তার কবরের নামফলকে ঝলমল করে জানান দিচ্ছে,আর বলছে, এই জাতি শোনো, তোমরা আর যায় করো, বাংলাদেশে যেনো সাহিত্য চর্চা করতে যাও না। এদেশে একদল শকুন আছে, যে শকুনগুলো সামন্য মতাদর্শের জন্য ভিতরে ঠুকরে ছিঁড়ে ফেলে। এই তীব্র যন্ত্রণা যে কতোটা ভয়াবহ তা তোমরা অনুভব করতে পারবে না। হে প্রজন্ম আমাকে ভুলে যেওনা।

প্রিয় কবি আল মাহমুদ, আজকের এই দিনে আপনার জন্য রইলো, বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন” আপনাকে জান্নাত নছিব করুক (আমীন)

আরও পড়ুন