তেলাপোকা

“টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়… অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।”
শরৎচন্দ্র যে সময়ে এই উক্তিটি করেছিলেন তখন হয়তো টিকিয়া থাকাতে সার্থকতা ছিলনা কিন্তু, এখন সময় পাল্টেছে, মেনে নেবার এবং মানিয়ে নেবার বিভিন্ন কৌশল আবিষ্কার করা হয়েছে। আজকাল টিকে থাকার ব্যাপারটি আর ততটা তুচ্ছ নয় বরং অধিকাংশ প্রাণীই টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত, আর সবচেয়ে বেশী টিকে থাকার যুদ্ধে রয়েছে মানবকূল।
এই ক্রিকেট খেলার কথাই ধরুন না – টেস্ট ম্যাচ খেললে টিকে থাকাই আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন। কেবল টিকে থাকতে পারলেই কিছুটা সার্থকতা আসে। আমরা যেহেতু হাতিকে দেখি তেলাপোকা দেখিনা তাই টিকে থাকার ইচ্ছেটাও ততটা জোরালো হয়না। আবার T20 ম্যাচ যখন খেলি কেবল টিকে থাকলেই হয়না পাশাপাশি ডিমও পাড়তে হয়- রান নিতে হয়।
তেলাপোকা টিকে থাকার পাশাপাশি ডিম পাড়ে যত্রতত্র, এতে বংশবৃদ্ধি হয় খুবই দ্রুত। সংখ্যার আধিক্য থাকলে কিছুটা গুরুত্ব কেড়ে নেয়া খুবই সহজ। তেলাপোকা কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো তার টিকে থাকার ইতিহাস এবং প্রবণতা দেখলেই কিছুটা অনুধাবন করা যায়। এই তেলাপোকাই অনেকের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কতশত গবেষণা, কত রাসায়নিক ঔষধ ব্যবহার করেও এই ক্ষুদ্র তেলাপোকা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা। তেলাপোকার টিকে থাকার সাথে গদিতে টিকে থাকার একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। টিকে থাকলেই বংশবৃদ্ধি, আর বংশবৃদ্ধি মানেই প্রভাব। তেলাপোকা হয়তো হস্তীর স্থান দখল করতে পারবেনা কিন্তু, রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পুরো পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলতে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে।
এক ছোটভাইয়ের দুঃখের গল্প বলে শেষ করবো। আমাদের এখানে তেলাপোকার অত্যাচার খুবই দুর্বিষহ বিশেষকরে গ্রীষ্মকালে। যে বাড়িতে কিংবা এলাকায় একবার তেলাপোকা হয়েছে তাদের যন্ত্রণা উপলব্ধি করা খুবই কঠিন। সারা ঘরময় কিলবিল করে ছুটে বেড়ায় অসংখ্য তেলাপোকা আন্ডা বাচ্চা সহ।
পরিচিত ছোটভাই দেশে গিয়েছিল গত বছর। লকডাউনের কারণে দীর্ঘ সময় পরে ফেরত আসলেও আমার সাথে দেখা হয়নি। আমারা এখনও অপ্রয়োজনে দেখা সাক্ষাৎ করিনা। সেদিন আসলো দেখা করতে একটি জরুরী প্রয়োজনে। এসেই হৈচৈ শুরু করে দিয়েছে – ভাই, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার পুরো বংশই নির্বংশ হবার উপক্রম। কীভাবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়?
– কী হয়েছে, আগে খুলে বলো?
– ভাই, একটি টিভি কিনে মাসখানেক ব্যবহার করেছিলাম। দেশে যাবার সময় সেই টিভি সাথে নিয়ে গেছি। বাড়িতে পৌঁছে যখন বক্স থেকে টিভি খুলছিলাম টিভির বক্স থেকে ছয় পেয়ে তেলাপোকাগুলো বের হয়ে এমনভাবে তাকাচ্ছিলো যেন দীর্ঘ ফ্লাইট আর ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষে খুবই ক্লান্ত। নতুন পরিবেশ বুঝতে একটু সময় নিচ্ছিল। সম্বিত ফিরে পেয়ে হা – করা মুখ বন্ধ করে যখনই ওদেরকে মারতে গেলাম ততক্ষণে ওরা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। নিমিশেই হারিয়ে গেল যে, যেদিকে পারে। শংকায় তখনই আমার বুক কেঁপে উঠেছিল – এই তেলাপোকার বংশবৃদ্ধি আমার পুরো বংশকে হুমকির মুখে ফেলবে।
কয়েকদিন আগে বাড়ি থেকে ফোন এসেছে; সেই তেলাপোকা বংশবৃদ্ধি করে পুরো মহল্লায় ছড়িয়ে পরেছে। কোনো ঔষধই তাদের টিকে থাকার কৌশলকে পরাস্ত করতে পারছেনা। আমার পরিবারকে এই বিপদ থেকে কীভাবে উদ্ধার করা যায়?
– বিমানের টিকিট কেটে এই উপদ্রব দেশে নিয়ে যাবার বুদ্ধি তোমাকে কে দিয়েছিলো? এখন, ঘটনা যেহেতু ঘটিয়ে ফেলেছো এই তেলাপোকা নির্বংশ করা সম্ভব নয় কেবল কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং আফ্রিকান এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কেমিক্যালটাও তোমাকে আফ্রিকা থেকেই নিতে হবে। রুক্ষ, খসখসে সেমি- ডেজার্ট এরিয়ায় যারা টিকে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী; নাতিশীতোষ্ণ, মৌসুমি ফলের ষড়ঋতুর দেশ তাদের জন্য এক উর্বর কোষাগার।
মনসুর আলম, সাউথ আফ্রিকা প্রবাসী লেখক-সাহিত্যিক ও এডমিন , মহীয়সী
আরও পড়ুন