তোমার শহর আর আমি

পলাশ পুরকায়স্থঃ

তোমার শহর আমাকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে দিয়েছে৷
এখন দিনক্ষণ ঠিক করে শুধু রুমাল নাড়া বাকি!
কেন দেখনি বাংলা সিনেমায়, ফাঁসির দৃশ্যায়ন?
খাঁজ কাটা হাতলে হাত থাকে জল্লাদের৷
আসামীর মুখ অবশ্য কালো কাপড়ে …
তোমার শহর আমার মৃত্যুদন্ডের সমনে দাসখত দিয়ে দিয়েছে৷
শহরের পলেস্তরা খসা দেয়ালে শ্যাওলার দাগ, নর্দমার ঘ্রাণ, হেলে পড়া অস্তমিত সূর্যের আলো,
রিক্সার টুংটাং ঘন্টাধ্বনি!
মনে হয়,
আচ্ছা বেগুনী জারুলের ঘ্রাণ কেমন?
আছে নাকি নেই?
খোঁজা হয়নি কখনও
খুঁজিনি হুডফেলা ত্রিচক্রযানে রোদের প্রখরতা, ঘামার্ত লোকটার প্যাডেলে পা,
ছিন্নবস্ত্রে নুনের শুকোনো দাগ
আর বাতাসের ঝাপটায় উড়ে আসা শ্রমের গন্ধ৷
তবুও বসন্তের শেষ বিকেলে রিক্সাই সম্বল, তুমি আর আমি, আমাদের প্রনোদনা!
সন্ধ্যের দাবদাহে ফুলার রোডের হলুদ আলোর স্মৃতি, প্রথম চুম্বনের শীতলতা,
বৃষ্টির ভাবাবেগ, দূরের দুপুরের হাতছানি
টিউশনীর টাকা পকেটে আসলে
গাউছিয়ার দ্বিতীয় বা তৃতীয়তলায় ভর্তা-ভাজি|
তখন কিন্তু ধুমপানে নিষেধ ছিল না!
রেস্তোরার পর্দাটানা আলাদা কেবিন ,
জ্বলতেই পারতো সিগারেট!
তোমার শহরে তুমি থাকো না
তোমার শহর তাই আমাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েই দিল?
শ্রাবণ ঘনঘোর
শীত কুয়াশা
বাতাসে লেপ্টে থাকা ধুলোর সাথে
হলুদ কমলায় বসন্ত বিলাস, বোশেখ
শরতের তিরতির জলে কাশফুলের ছায়া,
শেষমেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে পুঁতিগন্ধময় কালো জল পেরিয়ে সর্দার কলোনী; নিরেট উপোষী দিনের শুরু৷
টঙের চা, লাঠি বিস্কুট, বন-পাউরুটি
টীকাটুলী মোড়ে পরটা ভাজী, দুপুরের উদরপুর্তি৷
ভুলেগেছি সিমিট্রির পাশে বলধা বাগান ছিল নাকি
বলধা বাগানের পাশে সিমট্রি,
ওখানে দিনেরপর দিন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের পরীর গায়ে ঠিকরানো পথ বাতির আলোতে মধ্য রাতে পরীটাকে জীবন্তই মনে হতো!
কত পুরোনো কবর! পলেস্তরা খসা দেয়ালে হাত রেখে যেনো দাঁড়িয়ে থাকেন লেডি মার্লিন!
শেষত্বক পদ্মপাতায় ফড়িং গুণে একটা বিকেল কাটিয়েছি৷
একা!
শেষ কথাটাও জানবার কেউ ছিল না৷
তোমার শহর আমার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করল!
বিষাদবিভ্রমে বৃষ্টিস্নাত এই শহরটা ডুবে গেছে বসন্ত থমকে গিয়েছে, কুয়াশায় মোড়ে শহরের শোক প্রকাশ-
কোন একটা শ্বেতপাথরের সাদা ফলকে সময় আমার নাম লিখে রেখে গেছে!
তোমার শহর আর আমি!
আমি আর তোমার শহর!
আমাদের দীর্ঘঃশ্বাস প্রতিটি দেয়ালে আটকে আছে৷

লেখকঃকবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন