পরিশোধ

সুমাইয়া আফরোজ

মায়ের মুখের হাসিটা যেন আগের মত নয়,
যেমন করে হাসিমুখে রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ছুটে আসতো ঠিক সেরকম নয়,
কেমন যেন তাচ্ছিল্যের হাসি লেগে আছে ঠোঁটের কোণে,
নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকা এই মানুষটার হাসি যেন বলছে তোদের আর আমার প্রয়োজন নেই, এতদিন আমি তোদের জন্য অনেক করেছি এখন তোরা অন্যদের জন্য কর, আমার একাকী থাকার কষ্টটা আজ শেষ হলো।
সোহেলীর চোখে একফোঁটা পানি নেই, পাথরের মত বসে আছে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে।
পাড়া পড়শীরা তো হতবাক, ফিসফিসিয়ে বলছে,
… হ্যাঁ গো, এ মেয়ে না অন্যকিছু,  শহরে থেকে থেকে শরীরে মায়া দয়া কিছু নেই গো! একফোঁটা চোখের জলও ফেললে না মায়ের জন্য, এমনি পাষাণ।
সোহেলীর মনে পড়ছে সেদিনের কথা, শেষবার কথা হয়েছিল মায়ের সাথে,
ছেলের পরীক্ষার কথা জানিয়ে যখন জিজ্ঞেস করেছিল,
… মা,  তোমার কি বেশি কষ্ট হচ্ছে?
… না, মা আমি ভালো আছি, এই বুড়ো বয়সে আর এর চেয়ে কতভালো থাকবো?  আসতে হবে না এখন, আমার নাতির পড়ার ক্ষতি করিস না, ওকে অনেক বড় মানুষ হতে হবে।

না, ছেলের পড়ার ক্ষতি করে নি সোহেলী,  সবগুলো ক্লাশটেস্ট শেষ করেই এসেছে।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে ছেলে আর ছেলের বাবার সাথে বাড়ির পথে রওনা হয়, কিছুদূর এসে পিছন ফিরে তাকিয়ে মায়ের অদৃশ্য ছায়া অনুভব করে, যেন বলছে,
… পিছন ফিরে তাকাবার দিন শেষ, এখন শুধু সামনে এগিয়ে যা।

আর ফিরে তাকাবার সাহস হয় না।
গাড়ীতে উঠে বসে পাঁচ বছরের ছেলেটার দিকে তাকায় সোহেলী,  বুকের ভেতরটায় হাহাকার করে ওঠে,
ছেলেকে সজোরে বুকের কাছে নিয়ে বলে,
… বাপ, তুই তো বড় হয়ে বিদেশে চাকরি করবি, তখন আমি মরে গেলে আসবি তো দেখতে? তুই যদি তখন ছুটি না পাস? বেঁচে থাকতে অপেক্ষা করা যায় কিন্তু মরে গেলে  কারো জন্য অপেক্ষা করা যায় না রে, আসতে দেরি হলে যে পঁচে গলে শেষ হয়ে যাব।

পাঁচ বছরের অকালজ্ঞানী ছেলেটা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিমিষেই এতবড় সমস্যার সহজ সমাধান দিয়ে বলল,
… কোন টেনশন নেই মা, আমার সায়েন্স টিচার বলেছে মানুষ মরে গেলে তাকে যদি ফ্রোজেন করে রাখা হয় তখন আর কিছু হয় না। তাহলে আমার যখন ছুটি হবে তখনি আমি চলে আসতে পারব।

বুদ্ধিমত্তার চরম প্রমাণ দিয়ে সে হাসতে লাগলো,
আর এদিকে সোহেলীর শরীর ঠান্ডা হতে শুরু করেছে,
কিন্তু  সে তো এখনো জীবিত।

সুমাইয়া আফরোজ, সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন