পূর্ণতা ও অপূর্ণতার গল্প

মাহজেবিন মম

মনযোগ দিয়ে কাজ করছিল মরিয়ম। এই সময় রানু এসে বলল-” ছুটির পর থাকিস কিন্তু। আজকে নারী দিবসের মিটিং আছে। ” মরিয়ম ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। দুই বছর ধরে নাজমিন গার্মেন্টস এ চাকরি করে মরিয়ম। বড় বোনের পরিবারের সাথে থাকে সে। গত বছরও এই দিনে নারী দিবসের মিটিং ছিল। মিটিংয়ে কয়েকজন নারী নেত্রী, মহিলা পরিষদের সভাপতি এবং একজন অভিনেত্রী উপস্থিত ছিল৷ অতিথিরা নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন নিয়ে কি সব কঠিন কঠিন কথা বলেছিল তার কিছুই মাথায় ঢুকেনি তার। এবার আর মিটিংয়ে থাকার ইচ্ছে নেই মরিয়মের। তবে মিটিংয়ে কোন নায়িকা আসবেন তা নিয়ে কিছটা কৌতুহল হচ্ছে তার। 

ছুটির পর যাবে না যাবে না করেও মিটিংয়ে উপস্থিত হল সে। মহিলা পরিষদের সভাপতি বক্তব্য দিচ্ছেন- “নারীদের অবলা হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। নারীদের পূর্ণাঙ্গ মানুষের মর্যাদা দিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না নারীরাও পূর্ণাঙ্গ মানুষ।”

নারীরাও মানুষ এ কথা শুনে মরিয়ম মুচকি হাসলো। সে কি সত্যিই একজন পরিপূর্ণ মানুষ? সমাজ কি তাকে একজন মানুষ বলে ভেবেছে কখনও? মরিয়মের চোখের সামনে ভেসে উঠল অম্বিকাপুর গ্রামের একটি ছোট টিনের একচালা ঘরের ছবি। ঐ একচালা ঘরের একটা ছোট রুমে থাকত মরিয়ম আর ছোট ভাই হাফিজ। তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তার বাবা সবজির ব্যবসা করে আর মা দর্জি। সংসারে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলেও ভাতের অভাব হয়নি কখনও। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের পাট চুকিয়ে হাই স্কুলেও ভর্তি হয়েছিল মরিয়ম।

এসএসসি পরীক্ষার আগে নিয়ম করে তলপেটে ব্যাথা শুরু হল তার। মরিয়মের মা হাসিনা এটাকে মেয়েদের নিয়মিত অসুখ মনে করে খুব একটা গা করেনি। তবে ধীরে ধীরে ব্যাথার তীব্রতা এতটাই বাড়লো যে সদরের হাসাপাতালে ভর্তি করতে হল তাকে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাক্তার জানালেন মরিয়মের জরায়ুতে সিস্ট হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এটা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে পুরো জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হবে। তা নাহলে ক্যান্সারে পরিনত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অবশেষে সহপাঠীরা যখন এসএসসি পরীক্ষা দেয় তখন মরিয়মের ঠাঁই হয় অপারেশন টেবিলে। যখন বাড়ি ফিরে এল গোটা এলাকার মানুষ জেনে গেল সে আর কোনদিন মা হতে পারবে না।

বেশ কিছুদিন পর অম্বিকাপুর গ্রামে নতুন এক পাগলের আবির্ভাব হয়েছে। গায়ে লাল সালু কাপড়, মাথায় জটা চুল, আর গলায় হরেক রকম মালা জড়িয়ে সেই পাগল ঘুরে বেড়ায়। পাগলের আশেপাশে যাওয়া যায় না দূর্গন্ধের কারনে। তবে শরীয়তপুরের বিখ্যাত মাজার থেকে এসেছে বলে এলাকাবাসী বেশ খাতির করতে শুরু করেছে তাকে। অম্বিকাপুরের একমাত্র মাজারে সে রাতে ঘুমায়৷ খিদে পেলে গ্রামের যে কারো উঠানে বসে যায়, খাবার না দেওয়া পর্যন্ত বিদায় হয়না। এলাকার মুরুব্বিরা মনে করে পাগল সব সময় ধ্যানের মাঝে থাকে কিন্তু  তরুণ ছেলেরা বলে সে গাঁজা খেয়ে টাল হয়ে পড়ে থাকে। 

এই পাগল একদিন খাবার খেতে মরিয়মেদের বাড়ি গেল। মরিয়মের মা হাসিনাকে মা ডেকে ভাত খেতে চাইল। হাসিনা বেশ যত্ন করে পাগল কে খাওয়ালো। এরপর কি হল কে জানে, পাগল প্রতিদিন মরিয়মদের বাড়ি যাতায়াত শুরু করল। হাসিনা বেগম পাগলের কাছে মুরিদ হয়ে গেল। এরপর একদিন ঘোষণা দিল মেয়ে মরিয়মকে পাগলের কাছে বিয়ে দিবে। এলাকার সব মানুষ জোর আপত্তি তুললে হাসিনা বেগমের যুক্তি ছিল মরিয়মের জরায়ু নেই, সে কখনও মা হতে পারবে না। তাই তাকে তিনি বিয়ে দিতে পারছেন না। আর পাগল খুব কামেল মানুষ, তার সেবা করে জীবন কাটিয়ে দিলে মরিয়মের বরং সওয়াবই হবে।

মরিয়মের বড় দুই বোনের আপত্তি, মরিয়মের আপত্তির তোয়াক্কা না করেই বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেললেন তিনি। বিয়ের আগের রাতে মরিয়ম কেবলই ভাবছিল এই দুনিয়ায় কি মা হওয়া ছাড়া কোন মেয়ের কোন দাম নাই? এই জরায়ুটাই কি কাউকে মূল্যায়নের মাপকাঠি? যে পাগলের গায়ের দূর্গন্ধে কেউ আশেপাশে ভীরতে পারে না সেই পাগলের সাথে সে কেমন করে থাকবে? তারচেয়ে বরং আল্লাহ তাআলা তাকে নিজের কাছে ডেকে নিলেই পারেন। 

এলাকাবাসীর সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করে হাসিনা তার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন পাগলের সাথে।

নিজের বাড়ির কাছে ছোট এক চালা ঘরে মরিয়মের সংসার জীবন শুরু হল। হাসিনা খুব যত্ন আত্তি করতেন মেয়ে জামাইয়ের। মেয়েকেও সর্বদা স্বামীর মন যুগিয়ে চলার উপদেশ দিতেন।

বিয়ের দুই মাস পর এক ভোরে হাসিনার চিৎকারে ঘুম ভাঙল মরিয়মের। দৌড়ে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখল, যে ট্রাঙ্কে তার মা টাকা পয়সা জমায় তা পুরো ফাঁকা। এক জোড়া সোনার দুল ছিল হাসিনার সেগুলোও উধাও। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হচ্ছে, পাগল জামাই ও উধাও। সারাদিন শেষেও যখন পাগলের কোন হদিস পাওয়া গেল না তখন কারোরই বুঝতে বাকি রইল না যে পাগলই সব চুরি করে পালিয়েছে। 

লজ্জায়, অপমানে আর অব্যক্ত অভিমানে মরিয়ম একদম চুপটি মেরে গেল। কোন কিছুতেই যেন তার কোন বিকার নেই। মা হাসিনা বার বার ক্ষমা চাইলেও সে কোন প্রত্যুত্তর করেনা। এভাবে এক বছর কেটে গেলেও পাগলের কোন হদিস আর পাওয়া গেল না। একদিন মরিয়মের বড় বোন রুমানা এসে তাকে নিজের কাছে নিয়ে গেল। বোনের ফুটফুটে বাচ্চা দেখে মরিয়মের বুকের কোনে মোচড় দিয়ে উঠে। সে কখনও মা হতে পারবে না, এটা ভাবলেই বুক টা খাঁ খাঁ করে। রুমানা ছোট বোনের আবার বিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে বেশ কয়েকবার। অনেকে প্রথমে আগ্রহ দেখালেও, মরিয়ম কখনও মা হতে পারবে না শুনে কেউ আর রাজি হয়নি শেষ পর্যন্ত।

কয়েকমাস পর রুমানার স্বামী শামীম মরিয়মকে নিজে যে গার্মেন্টসে চাকরি করে সেখানে চাকরিতে ঢুকিয়ে দিল। কাজের মধ্যে থাকলে সবকিছু ভুলে থাকতে পারবে এমনটা ভেবেই তাকে চাকরিতে দেওয়া। গার্মেন্টসে মরিয়ম বাচ্চাদের কাপড় সেলাই করে। খুব অনুরোধ করে সে এই ডিপার্টমেন্টে কাজ নিয়েছে। বাচ্চাদের কাপড় সেলাই করার সময় সে ওই জামা বা প্যান্ট পরিহিত শিশুকে কল্পনা করে। নিজের হাতের স্পর্শ লেগে থাকা পোশাক কোন বাচ্চা পরবে এটা ভাবতেই তার ভাল লাগে। দিন যায় দিন আসে, পাগলের কথা আর তার মনে পড়েনা। দিনশেষে  শুধু বুকের গহীন কোণে লুকিয়ে থাকে মা হওয়ার আকুতিটুকু।

“জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা ” গানের সুরে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এলো মরিময়। জীবনের বিষাদময় দিনগুলোতে ঝটিকা সফর করে এলো যেন। গানের সুর ছাপিয়েও মরিয়মের কানে বাজছে সেই কথাটি -“নারীরাও পূর্ণাঙ্গ মানুষ”। সে ভাবছে সত্যিই কি সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ? একজন জরায়ু হীন নারী কি সত্যিই পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয়? যদি হতোই তবে তার জীবনটা এমন ছন্নছাড়া হল কেন? কেবল মাত্র মা হওয়ার অক্ষমতাই তাকে একজন অপূর্নাঙ্গ মানুষের কাতারে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি অঙ্গের অনুপস্থিতি যেন সকল পূর্ণতাকে ম্লান করে অপূর্ণতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বার বার……..

লেখক- শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন