প্রত্যয় ও প্রেরণার দিনগুলি (পর্ব-এক)

এস এম মুকুল

সাংবাদিকতা পেশায় আমার প্রথম অধ্যায় ২০০০ থেকে ২০০৬ সাল। এই ৬ বছরে তিনটি পত্রিকায় কাজ করি। শিক্ষাবিচিত্রায় সাড়ে ৪ বছরে প্রথমে স্টাফ রিপোর্টার, এক বছর পর চীফ রিপোর্টার। তার পরের বছর এসিস্ট্যান্ট এডিটর হিসেবে কাজ করি। শিক্ষাবিচিত্রার শ্রদ্ধেয় আবদার রহমান, আমাদের প্রিয় আবদার ভাইয়ের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি সহকারি সম্পাদক আব্দুল হাকিম চৌধুরী- ওরফে হাকিম ভাইয়ের কাছেও। সবচেয়ে বেশি অন্তরঙ্গতা ছিলো হাকিম ভাইয়ের সাথে। হাকিম ভাই আহাচৌ সাংকেতি নামেও লিখতেন। তিনি এখন আরটিভিতে আছেন। হাকিম ভাই আর আমি ম্যাগাজিন শিক্ষাবিচিত্রা প্রকাশের আগে কয়েক রাত জেগে অফিসে ম্যাগাজিনের মেকাপ করা। হাকিম ভাই আর আমার খোশগল্প। গভীর রাতে মালিবাগ মোড়ে গিয়ে চা খাওয়া। দারুণ ক্লান্তিহীন ছিলো সেই সময়। রাতে মেকাপ দিনে অফিস। সকালে উঠে গোসল করেই হেনা ভাবীর পাঠানো গরম পরোটা মাংস আর দুধ চা’র স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে। দিনভর বিজ্ঞাপনের জন্য ছুটাছুটি। বিকেলে অফিসে ফেরা। সন্ধ্যায় আবার হেনা ভাবির হাতের চা। আর আব্দুল বারেকের পরিবেশনায় গরম গরম পুরি অথবা চিতই পিঠা খাওয়ার তৃপ্তির টান এখনো পিছনে টেনে নিয়ে যায়। মনে পড়ে সার্কুলেশন ম্যানেজার হালিম ভাইয়ের রসিকতা। প্রতি বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যার এডিটোরিয়াল বোর্ড মিটিং। এফ এম খলিলুর রহমান (বর্তমান এডুকেশ ওয়াচের সম্পাদক), ইকবাল খান (শিক্ষক ও কবি), জাহাঙ্গীর কবির ( সর্বশেষ ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগারে জেলারের দায়িত্বে ছিলেন বলেই জানি), নূরনবী সিদ্দিক সুইন ( উচ্চশিক্ষা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা), রাজীব মহাজন (এডফার্ম ব্যবসায়ী), মোহাম্মদ শফিকুর রহমান শফিক, মো. বাদশা মিয়া (টিভি মিডিয়ার ক্রাইম রিপোর্টার), মোর্শেদ আলম সুমন (বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ী), নাসির উদ্দিন পলাশ (সাংবাদিক), মো. নিজাম উদ্দিন (ব্যবসায়ী), মো. জোনায়েত হোসেন, এম এ হালিম, মো. আব্দুল বারেক, তাপস মজুমদার সবার কথাই মনে পড়ে। ফেসবুকে অনেকেই আমার সাথে আছেন। কারো কারো সাথে হঠাৎই কথা হয়। শিক্ষাবিচিত্রায় আমি বছর দুয়েক ছিলাম যুদ্মভাবে সহকারি সম্পাদকের দায়িত্বে। খলিল ভাই ছিলেন ইভেন্টের দায়িত্বে আর আমি ছিলাম ম্যাগাজিন প্রকাশনার দায়িত্বে। এই দুই বছরে আমি সবচেয়ে বেশি শিখেছি দায়িত্ববোধ সম্পর্কে। টীম ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে শিখেছি। আচরণ বোধ আর বিনয় শিখেছি আবদার ভাইয়ের কাছ থেকে। পত্রিকা অফিসের সম্পাদনা থেকে শুরু বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনা ও ফকিরাপুলের প্রেস পাড়ার ভুতের গলিতে কেটেছে অনেক সময়। বাইন্ডিং কারখানায় শ্রমিকদের সাথে বসে যখন ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠা ভাজের কাজ করতাম ওরা তখন অবাক বিস্ময়ে তাকাতো। ওদের সবাইকে নিয়ে গরম গরম পুরি আর সিঙ্গারা খেতাম। আর তারা আমাকে চরম মিষ্টি দুধ চা খাওয়াতো। কী দারুণ ছিলো সেইসব দিনগুলো। উন্মাদনায় দিনরাত কাজ করতাম। সকাল ৯টায় অফিস, আমি প্রায়ই ৮টা গিয়ে কলিং বেল টিপলে হঠাৎ একদিন হেনা ভাবি বললেন- ‘কী ব্যাপার, বাসায় থাকতে মন চায় না।’ মুচকি হেসে অফিসে ঢুকতাম। তখন ধ্যানজ্ঞান ছিলো শিক্ষাবিচিত্রার সাংবাদিকতা। মাস শেষে ম্যাগাজিনটি হাতে পেলে সে কী যে উত্তেজনা কাজ করত, তা বলে বুঝাবার মতো নয়।

শিক্ষাবিচিত্রায় চাকরির শুরু থেকেই কয়েকটি বিভাগ আমি দেখতাম- কবিতা, শিশুদের পাতা সবুজ ভুবন, নারীদের পাতা আজও অনন্যা, স্বাস্থ্যপাতা স্বাস্থ্যকথা, চিঠিপত্র কলাম পাঠক সমাগম, পাঠক ফোরাম জলরঙ্গ ইত্যাদি। এসবাধে অনেক কবি ও লেখকদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। তারুণ্যের উন্মাদনায় কবিতা লিখতেন- রিয়াজ মাশরাফী, ইকবাল খান, ইব্রাহিম মিজি, রায়হান কবীর আরো কতজনের নাম মনে নেই। আমিও কবিতা লিখতাম। ইকবাল খান, রিয়াজ মাশরাফি, রায়হান কবির আর আমি আমাদের দেখা হলেই আলোচনা হতো কবিতা নিয়ে। ম্যাগাজিনে কভারস্টোরি (প্রধান প্রতিবেদন) লেখার দায়িত্ব অর্পিত হতো এডিটোরিয়াল বোর্ড মিটিংয়ে। অনেক অনেক কভারস্টোরি লিখেছি আমি। দারুন ছিলো সেই অনুভুতিগুলো। হাকিম ভাই সাংবাদিকদের পাঠানো সংবাদ থেকে নির্বাচন করতেন। বাকিগুলো ফেলে দিতেন ঝুড়িতে। আমি সকালে গিয়ে ঝুড়ি থেকে তুলে সেগুলোকে রিরাইট করে কম্পোজে দিতাম। মেকাপে গিয়ে হাকিম ভাই সেগুলো দেখে অবাক হতেন আর স্মিথ হেসে বলতেন- মুকুল, এগুলো আপনার কাজ। বাঁধা দিতেন না বরং আস্কারা দিতেন। ৫ শতাধিক সাংবাদিক ছিলো শিক্ষাবিচিত্রা ম্যাগাজিনের। একটি ম্যাগাজিনের এত সাংবাদিক থাকাটা বড় ধরণের রেকর্ড। ইকবাল খানের নেতৃত্বে ম্যাগাজিনের বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সাপ্লিমেন্ট ম্যাগাজিন স্কলারস ডাইজেস্ট বের করি আমরা। আমার দায়িত্বে বের হয় সাহিত্য নিয়ে বিশেষ বুলেটিন রৌদ্রছায়া। খলিলের দায়িত্বে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা এবং গরীব ও মেধাবিদের বৃত্তি প্রদানের বড় ধরণের সফল আয়োজন সম্পন্ন হয়। সবমিলিয়ে বলতে পারি শিক্ষাবিচিত্রা কেবল একটি ম্যাগাজিন ছিলো না। শিক্ষাবিচিত্রা একই সাথে শিক্ষা উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং ক্যারিয়ার গঠনে অনবদ্য ভুমিকা রাখার পাশাপাশি সাংবাদিক ও লেখক তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। শিক্ষাবিচিত্রার সাথে থেকে এসব জাতীয় পর্যায়ের কাজে সম্পৃক্ত হতে পারায় নিজেকে ধন্য মনে করি। সারাদেশের সাংবাদিকদের সাথে মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। যাদের কেউ কেউ এখন জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক ও লেখক। ভাবতে ভাল লাগে কালের ইতিহাসে স্বর্ণোজ্জ্বল এক অধ্যায়ের সঙ্গী ছিলাম আমিও।
আমি কম্পিউটার চালানো, টাইপিং শিখেছি হাকিম ভাই আর তাপসের কাছে। মেকাপ শিখেছি হাকিম ভাইয়ের কাছে। সম্পাদনা শিখেছি আবদার ভাইয়ের কাছে। এইসব সম্বল নিয়েই চলছি। প্রেরণায়, প্রত্যয়ে আমার সকল সহকর্মীরা, যাদের কাছে আমার অনেক ঋণ।তাদের কারোর এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে চাই না-‘চীরঋণী থেকে যেতে চাই’।
(চলবে)

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও উন্নয়ন গবেষক

আরও পড়ুন