বাবার জন্য উপহার

সামিন বিনতে ইয়াসির

জুনায়েদ সাহেবের তিন মেয়ে। নিলা, শিলা আর মিলা। তিন মেয়েকেই ওদের  বাবা অনেক ভালোবাসেন। তবে ছোট মেয়ে মিলাকে একটু বেশিই আদর করেন জুনায়েদ সাহেব। যদিও বাকপটু স্বভাবের জন্য মিলাকে অন্যরা একটু ভয় পায়। তবে সত্যি কথা বলতে মিলা কখনও পিছপা হয় না।

সেদিন রাতে জুনায়েদ সাহেব তিন মেয়েকে নিজের রুমে ডেকে বললেন,“ আমি দেখতে চাই তোমাদের মধ্যে কে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো? তাই ঠিক সাত দিন পর তোমরা তিনজন আমাকে উপহার দিবে । যার উপহার সবচেয়ে সুন্দর হবে, আমি তাকে একটি মূল্যবান রিটার্ন গিফট দিব।”

বাবার এই কথা শুনে তিন বোন চিন্তায় পড়ে গেল। নিজেদের রুমে ফিরে আলাপ করতে লাগল, কি গিফট দিলে তা অন্যরকম হবে!!!!!

সাতদিনে পর  তিন বোন তাদের নিজ নিজ উপহার নিয়ে বাবার রুমে গেল।  তিনজনই গোপনে গিফট কিনেছে। এখন সবাই  উত্তেজনা নিয়ে ভাবছে একজনের  সাথে আরেকজনেরটা আবার মিলে গেল নাতো!!

প্রথমে বড় মেয়ে নিলা তার গিফট খুললো। চমৎকার একটি ফ্রেমে ওদের ছোট বেলার পারিবারিক ছবি বাঁধাই করে এনেছে সে। ছবিটি দেখে ওরা সবাই নষ্টালজিক হয়ে গেল।

নিলা খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, “ছবিটা বাসার ড্রইং রুমে টাঙ্গিয়ে রাখবো।” বাবা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

এরপর এলো শিলার পালা ।  শিলা বের করলো চমৎকার একটি সিল্কের পাঞ্জাবী। বাবাকে দিয়ে বলল, “দেখো তো তোমার সাইজ ঠিক আছে নাকি!! আমিতো অনুমান করে কিনেছি।”

বাবা গায়ের সাথে মাপ দিয়ে বলল, “সাইজ ঠিকই আছে।”

যাক, শিলা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে বলল, “ তুমি তাহলে শুক্রবার জুমুআর নামাজ পড়তে গেলে এই পাঞ্জাবী পড়ে যাবে।” বাবা রাজী হলো।

সবার শেষে মিলা কি উপহার এনেছে তা দেখার জন্য সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে।  মিলা বের করল একটি হিজাব আর একটা জায়নামাজ।

বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা জায়নামাজটা তোমার জন্য আর হিজাব টা আমার জন্য। আমি কাল থেকে হিজাব পড়া শুরু করবো ইনশাআল্লাহ। আমি চাই না আমার জন্য তুমি ‘ দাইয়ূস’ হিসেবে কিয়ামতের দিনে পরিচিত হও।”

ওর এই কথা শুনে বাবা অবাক হয়ে বলল, ‘দাইয়ূস কে মা?”

মিলা বলল, “দাইয়ূস হলো সেই পুরুষ যে তার পরিবারের মেয়ে সদস্যদের বেপর্দা হয়ে চলা থেকে বিরত রাখে না।”

দাইয়ূসের পরিণতি সম্পর্কে মহানবী (সা:) বলেছেন-“ কিয়ামতের দিনে মহান আল্লাহ যে তিন ব্যক্তির  দিকে সুনজর দিবেন না তাদের একজন হলো দাইয়ূস ব্যক্তি।” (সূনানে নাসায়ী : ২৫৬২)

“তুমিই বলো বাবা, আমি কি এই কথা জানার পর তোমকে দাইয়ূস হিসেবে পরিচিত করতে পারি? তাই আমি ঠিক করেছি কাল থেকে পর্দা করে চলবো।”

ওর এই উত্তর শুনে বাবা  বললেন, “কিন্তু তুমি এত কিছু জানলে কিভাবে? “

তখন মিলা বলল, “আমি  মেঘ, রোদ্দুর, বৃষ্টি “ –নামে একটা গল্পের বই পড়ে এটা জেনেছি যেখানে অনেক ইসলামিক বিষয় গল্পের মাধ্যমে বলা হয়েছে।”

তাছাড়া আমি এখন আরও অনেক বিষয় জানি যেগুলো শুনলে হয়তো তোমাদের মন খারাপ হবে। কিন্তু আমি যা জেনেছি তা তোমাদেরও জানানো আমার কর্তব্য। ”

বাবা বললো,“ আর কি জেনেছো বলো আমাদের।”

মিলা বলল, “বড় আপু তোমাকে যে ছবিটা দিল সেটা যদি আমরা ঘরে টাঙ্গাই তবে রহমতের ফেরেশতা ঘরে ঢুকবে না। (১)

আর পুরুষদের জন্য কিন্তু রেশমের তৈরি কাপড় পরা নিষেধ ।(২) ”

মিলার কথা শুনে জুনায়েদ সাহেব খুশি হয়ে বললেন, “তাহলে মিলার উপহারটাই সবার সেরা। এবার বলো তুমি কি রিটার্ন গিফট চাও ?

উত্তরে মিলা বলল, “তুমি জায়নামাজে বসে আমার জন্য দুআ করবে এটাই আমার সেরা উপহার। কারণ সন্তানের জন্য পিতার দুআ কখনও বিফল হয় না।”(৩)

মিলার কথা শুনে শিলা ও নিলা  একসাথে বলে উঠলো, “তাহলে আমরাও পর্দা করা শুরু করবো বাবা। আমরাও চাইনা তুমি আমাদের জন্য দাইয়ূস হও।”

ওদের কথা শুনে মিলা খুশিতে দুই বোনকে জড়িয়ে ধরলো।

এই দৃশ্য  দেখে জুনায়েদ সাহেবের চোখ আনন্দে ভিজে উঠলো আর মনে মনে ভাবলেন,

আজ মেয়েরা তাকে এমন উপহার দিয়েছে যা শুধু একদিন বা একবছর নয় বরং অনন্ত জীবনের জন্য উপকারী হবে। এমন মেয়েদের বাবা হতে পেরে তিনি আজ গর্বিত।

লেখিকাঃ সামিন বিনতে ইয়াসির নয় বছর বয়স!

হাদীস সংযুক্তি  উম্মে সামিন:

১. যে ঘরে ছবি থাকে সেই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।(সহীহ বুখারী: ২১০৫)

২. যে লোক দুনিয়ায় রেশমি কাপড় পরবে, আখিরাতের দিনে তা পরতে পারবে না। ( সহীহ বুখারী:৫৮৩৪)

৩.মহানবী (সা: ) বলেছেন, “সন্তানের জন্য পিতার দুআ কবুল হয়।” ( তিরমিযী : ৩৪৪৮)

আরও পড়ুন