বিবেকের কাঠগড়ায়

মাহমুদা আক্তারঃ

হারুন শেখ একটা সময় অনেক ধন সম্পদের মালিক থাকলেও আজ সে নিঃস্ব। গত বছর গ্রামের ভিটেতে করা আধুনিক ডিজাইনের বাড়িটিতে আজ দুইদিন ধরে বসে আছেন। এই দুই দিনে একবারের জন্যও তিনি বাড়ি থেকে বের হননি। এমনকি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও তিনি ঘরেই পড়েছেন। গত পরশুদিন গভীর রাতে তিনি যে বাড়িতে এসেছেন এটা কেউ টেরও পায়নি। আজ হারুন শেখ বিবেকের কাঠ গড়ায় দাঁড়িয়ে ঘরে বসে তার সারাজীবনে করা পাপ পূণ্যের হিসেব কষছেন। কি কি হারিয়েছেন, কি কি করেছেন, কাদের কাদের বঞ্চিত করেছেন, হজ্জ্ব পালনের কথা বলে কিভাবে বৃদ্ধা মাকে নিরাশ করেছেন এক এক করে সব মনে করার চেষ্টা করছেন। হয়তো  বাবা-মায়ের চোখের জলের কারণে, হয়তো আত্মীয়-স্বজনের অধিকার রক্ষা না করার জন্য অথবা প্রতিবেশীর হক আদায় না করার জন্য তার এই বর্তমান অবস্থা।

কোটি কোটি টাকা তিনি নষ্ট করেছেন অহংকার, দাম্ভিকতা আর জুয়া খেলে। যাদেরকে সবসময় তার শত্রু ভেবেছেন তারাই আজ বিপদে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বিপদ বললে ভুল হবে, নিজেই নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছেন। হারুন শেখ টাকার অহংকারে এতোটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে, মানুষকে মানুষ মনে করতেন না। তিনি আট ভাই বোনের মধ্যে সবার বড় হয়েও কোন ভাই বোনের প্রতি দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেননি। তার আভিজাত্যের দাম্ভিকতার প্রভাব পড়েছিলো তার স্ত্রী সন্তানদের উপরও। তাদের চলাফেরাও ছিলো উগ্র ধাঁচের। সোসাইটিতে নিজের ইমেজ দেখাতে গিয়ে তার স্ত্রী হারিয়ে ফেলেছে নিজের ঘরের সুখ। স্বামী পথভ্রষ্ট হলে স্ত্রীর উচিত তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু হারুন শেখের স্ত্রী উল্টো তার স্বামীকে উৎসাহ যুগিয়েছে। আপন মা-বাবা, ভাই বোনদের কাছ থেকে তার স্বামীকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। কিন্তু আজ যখন সব হারিয়ে নিঃস্ব তখন তার বাবার বাড়ির কেউ খোঁজ-খবরও নেয়নি। সবসময় দূর দূর করা আর অবহেলা করা ননদ দেবর গুলোই আজ তার ভরসা। সবার সাহায্য সহযোগিতায় যে করেই হোক গ্রামের এই বাড়িটা তাকে ধরে রাখতেই হবে সন্তানদের নিয়ে মাথা গুজার জন্য।

জুয়া খেলায় এতোটাই মগ্ন ছিলেন যে, সে একবারও অনুমান করতে পারেননি এক এক করে হারাচ্ছেন তিল তিল করে গড়ে তোলা সম্পদ। সবকটা ব্যবসা, দোকান হারিয়ে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে করা আটতলা বাড়িটাও তার আজ নিলামে। হয়ত গ্রামের বাড়িতে দেড় কোটি টাকা খরচ করে গড়ে তোলা এই বাড়িটাও তার একদিন হাত ছাড়া হয়ে যাবে। তিনি বুঝতে পারছেন পাপ তাকে পুরোপুরি ভাবে গ্রাস করে ফেলেছে।

আজ তার সব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে একদিন ঝড়ের রাতে দুই মাসের বাচ্চা সহ ছোট ভাই আর তার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। মনে পড়ছে তার বৃদ্ধা মাকে পবিত্র হজ্জ্ব পালন করতে নিয়ে যাবার কথা বলে পাসপোর্ট করিয়েও তাকে না নিয়ে স্ত্রী সহ হজ্জ্বে চলে গিয়েছিলেন। মনে পড়ছে বিছানায় পড়ে থাকা অসুস্থ বাবাকে একদিনের জন্যও নিজের বাড়িতে না রাখার কথা। এক এক করে  তার সব মনে পড়ছে। তিনি বুঝতে পারছেন তার পাপের পাল্লা এতো ভারী হয়ে গেছে যে ইহজগতেই তার বিচার শুরু হয়ে গেছে। তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন আপনজনদের দূরে সরানোর ফল, তাদের হক আদায় না করার ফল, তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ফল, জুয়ার মতো পাপ খেলায় মেতে থাকার ফল। তার ভুলের জন্য আজ পুরো পরিবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কাঠগড়ায়। হঠাৎ করেই তার গভীর ঘুম পাচ্ছে। তিনি দেখতে পাচ্ছেন তার বাবার কাঁধে করে স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য। তার দাদার সাথে নৌকায় করে মাছ ধরার দৃশ্য। বাবার হাতের মারের ভয়ে দাদীর আঁচলের পিছনে লুকানোর দিনগুলির স্মৃতি। হারুন শেখ বুঝতে পারছেন ধীরে ধীরে তিনি বাবা আর দাদার অনেক কাছে চলে যাচ্ছেন। কেমন শীত শীত অনুভব হচ্ছে তার কিন্তু সেই সাথে প্রিয়জনদের কাছে যাবার আনন্দও টের পাচ্ছেন।

লেখকঃ বাউল মেলার প্রধান এডমিন।

আরও পড়ুন