বুখারেস্ট পুর্ব ইউরোপের প্যারিস

মাসুদুল হাসান রনি

রুমানিয়া নামে পূর্ব ইউরোপের একটা দেশ আছে। এই দেশের নামের সাথে ছোটবেলায় পরিচিত হই বিশ্বের সেরা জিমন্যাস্টিকস নাদিয়া এলেনা কোমানেসিকোর নাম শুনে। তাঁর কারনে শৈশবে রুমানিয়ার প্রতি একটা ভাললাগা জন্মেছিল। বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত হবার পর আধুনিক রুমানিয়ার জনক নিকোলাস চসেস্কুর সাথে পরিচয়। নব্বই দশকে রুমানিয়ার সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতনের পর চসেস্কুর নির্মম মৃত্যু আমাকে ব্যথিত করেছিল। তখন মনে মনে ভেবেছিলাম কোনদিন বুখারেস্ট গেলে চসেস্কুর স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করবো। রুমানিয়া আমি ঠিকই গিয়েছি কিন্তু তার সমাধিস্থলে যেতে পারিনি।

রুমানিয়া যাবার সুযোগ হয়েছিল ২০০৯ সালে। সেই সময় আমি এন্ড্রু গাডেসের আমন্ত্রনে জার্মান এসেছিলাম ইউরোশিয়া ইন্সটিটিউট ভিজিটে। বার্লিনে আমার তিনদিনের নির্ধারিত প্রোগ্রাম শেষ করে রুমানিয়া গিয়েছিলাম। রাজধানী বুখারেস্টের ওল্ডটাউনে ছিলাম তিনরাত চারদিন।

ইইউভুক্ত দেশ না হওয়ায় আমার সেনজেন ভিসার সাথে বার্লিন থেকে রুমানিয়ার ভিসা সংগ্রহ করতে হয়েছিল ৬০ ইউরো দিয়ে। বাংলাদেশে রুমানিয়ার কোন দুতাবাস না থাকায় ভিসা নিতে হয় নয়াদিল্লি থেকে।

জেটএয়ারে বার্লিন থেকে রুমানিয়া যেতে সময় লেগেছিল আড়াইঘন্টা। বুখারেস্ট এয়ারপোর্টটি শহরের বাহিরে অটোপেনিতে। দুপুর দুইটায় এয়ারপোর্টে নেমে ইয়োলো ট্যাক্সি চেপে সোজা হোটেল “ওল্ড সেন্টারুম বুখারেস্টে।” পুর্ব থেকে বুকিং দেয়ায় খুব সস্তায় মাঝারি মানের এই হোটেলে রুম পেয়েছিলাম মাত্র ৩০ ইউরোতে।

ট্যাক্সিতে বুখারেস্ট ওল্ডটাউন যেতে যেতে চোখে পড়ে ছোট বড় অসংখ্য বিল্ডিং। সাদা ও ধূসর ব্লকের। এসব ভবনের গঠন রুশ স্থাপত্যশৈলীর , যা কমিউনিস্ট শাসনামলকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বেশকিছু রুমানিয়ান সিনেমায় এই ধরনের ভবন দেখেছি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এগুলির ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে। ভবনগুলোতে রং চংয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। চলতি পথে সামান্য দেখায় বুখারেস্টকে আমার খুব সুন্দর পরিপাটি শহর মনে হলো না ।

শহরে ঢোকার মুখে বিশাল গেইট। অনেকটা প্যারিসের
আর্ক ডি ট্রায়ামফের অবিকল কপি। রাস্তাঘাট বেশ চওড়া। দু’পাশে অসংখ্য গাছ। সবুজ আর সবুজে মোড়ানো । শহরের মাঝে এই সবুজাভ মন ভরিয়ে দেয়।

হোটেলে ঢুকে লম্বা শাওয়ার নিয়ে সোজা দৌড় রুফটপ রেস্টুরেন্টে। ক্ষুধায় পেট শুধু নয়, মাথা ভারি হয়ে আছে। কিন্ত লাঞ্চ করতে এসে খাবারের তেমন কিছুই পেলাম না। ম্যানেজার জানালো, ওদের এখানে লাঞ্চ শুরু হয় বেলা বারোটায়। দুপুর দুইটায় অলমোস্ট লাঞ্চ শেষ হয়ে যায়। আর আমি লাঞ্চের জন্য এসেছি বেলা সাড়ে তিনটায়।

তারপরও ম্যানেজারকে বলি, কিছু একটা দাও। পেটের আগুন নেভাতে হলে জল ঢালতে হবে।

কিচেন থেকে ঘুরে এসে ম্যানেজার দুঃখি দুঃখি চেহারা নিয়ে জানায়, আমি খুবই দুঃখিত। তোমার জন্য লাঞ্চের কিছুই নেই। একটু সময় দিলে কিছু একটা খাবার দিতে পারি। ব্রেড, বাটার, চিকেন সসেস,সালাদ দেয়া যাবে।
কি আর করা, আপাতত ক্ষুধা মেটানো প্রয়োজন। মাথা নেড়ে জানাই, তাই দাও ।

দুপুরে খাবার পর আমার ঘুমানোর বদাভ্যাস। ব্রেড,চিকেন সসেস ও সালাদ খেয়ে রুমে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে ঘুমিয়ে পড়ি। সেই ঘুম ভাংগলো সন্ধ্যাবেলা।

২.
হোটেল থেকে ভর সন্ধ্যাবেলায় হাঁটতে বের হই। আমার হোটেলটি ওল্ডটাউনে। সেন্ট্রাল বাস ও রেলস্টেশন খুব কাছেই। হাঁটাপথে মিনিট দশ পনেরো লাগে।

বুখারেস্ট শহরের যানবাহন ব্যবস্থা খারাপ না৷ পাবলিক বাস, ট্রাম, রেল আছে ৷ ঝকঝকে প্রাইভেট গাড়ির পাশাপাশি পুরানো আমলের ভক্সওয়াগন গাড়িও চোখে পড়ে। বোঝা যায় নব্বই দশকে চসেস্কুর পতন ও সমাজতন্ত্রের বিদায়ের পর একদল নব্য ধনীর হাতে প্রচুর অর্থ চলে আসে।এরা রাতারাতি পুঁজিপতি বনে যান। সেই সময় তাদের হাতে রুমানিয়ার অর্ধেক সম্পদ চলে যায়। তারাই ঝকঝকে গাড়ি , আধুনিক স্থাপত্যের ফ্ল্যাট, বিশাল ভিলা, বিলাসবহুল বাড়ির মালিক বনে গেছেন। এদের সমর্থনপুস্ট বর্তমান পুঁজিবাদী সরকার বেকারত্ব দুর করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রশাসনের অন্দরে দুর্নীতি ছেঁয়ে গেছে। সমাজতন্ত্রের উত্থানের ভয়ে এরা চসেস্কুর নাম নিশানা মুছে ফেলেছে। তাঁর সমাধিস্থলে কোন বিদেশীকে প্রবেশ করতে পর্যন্ত দেয় না। ওদের ভয় বেঁচে থাকা চসেস্কুর চেয়ে মৃত চসেস্কু অনেকবেশী শক্তিশালী।

সেপ্টেম্বর মাসে এসেছি বলে ভয়ে ছিলাম আবহাওয়া কি রকম হবে ভেবে। পাতলা উইন্ডব্রেকার জ্যাকেট পড়ে রুম হতে বের হয়েছি। রাতেরবেলা খুব একটা গরম নেই ৷ দিনের বেলায় তাপমাত্রা খুব নীচে না নামলেও বিকেলের পর থেকেই বেশ ঠাণ্ডা লাগে৷
সারা বছরের গড় তাপমাত্রা ৭ .৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷

ওল্ডটাউনে হাঁটতে হাঁটতে রুমানিয়ানদের লক্ষ্য করি। পর্যটকদের দেখে হাই বা হ্যালো করা এবং সাধারণ মানুষের আতিথেয়তা, বন্ধুবাৎসলতা আর আন্তরিকতা সহজেই মুগ্ধ করে । তাই এদের জীবন যাত্রা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস , ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার আগ্রহটা বেড়ে যায়। কোন দেশে গেলে আমি সর্বপ্রথম রেস্টুরেন্ট , পাব , বারে ঢুকে এসব জানার জন্য মানুষের সংস্পর্শে আসার চেস্টা করি।এর ব্যতিক্রম হলো না বুখারেস্টেও ।

ওল্ডটাউনের একটা পাবে বসে বিয়ারের বড় গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে দেখি আশেপাশের মানুষগুলো
হৈ চৈ করে বিয়ার খাচ্ছে। উচ্চস্বরে কথা বলছে। বেজায় স্ফুর্তিবাজ মনে হলো। যা আমি এখানে আসার আগে বার্লিনে পাইনি।

পাবে পরিচয় হয় মারিয়াস্কুর সাথে। ত্রিশ ছুঁই ছুঁই
এই নারী বুখারেস্টে এক হাসপাতালে জব করতেন। মাস তিনেক আগে তাঁর চাকুরি চলে যায়। বুখারেস্ট থেকে ৪০ কিলোমিটার দুরের শহর ব্রাসাভায় তাঁর জন্ম ও বেড়ে উঠা। চাকুরির জন্য তাঁর বুখারেস্ট থাকা। বিয়ারের সোনালী পানীয়তে চুমুক দিতে দিতে নানান বিষয়ে গল্প হয়। রাজনীতি, সিনেমা, খেলা এই তিন বিষয়ে আমার মতন তাঁর সমান আগ্রহ। তাই আমাদের আড্ডা দারুন জমে উঠে। জিমন্যাস্ট নাদিয়া কোমেনিচি, কমিউনিস্ট নেতা চসেস্কু থেকে ফুটবলার হ্যাজি কি ছিল না আমাদের আড্ডার বিষয়ে!

রাত সাড়ে এগারোটায় বিদায় নেয়ার সময় মারিয়াকে বলি, যদি তুমি ফ্রি থাকো আগামী দুইদিন আমাকে শহর দেখাতে পারো। আমি অবশ্যই তোমাকে নিরাশ করবো না।
ইটস এ গ্রেট অপরচুনিটি এন্ড ফিল অনারড।
-হোপ ইউ উইল জয়েন উইথ মি ফর ব্রেকফাস্ট। দ্যান উই হ্যাভ টু গো আউট সাইড।
শিওর। আই উইল কাম।
মারিয়াকে আমার হোটেলের এড্রেস, ফোন নাম্বার দিয়ে উঠে পড়ি।
৩.
বিচিত্র সুন্দর দেশ রোমানিয়া হচ্ছে বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। দেশটির উত্তর-পূর্বে রয়েছে ইউক্রেন ও মোলদোভা, পশ্চিমে হাঙ্গেরি এবং সার্বিয়া, দক্ষিণে বুলগেরিয়া ও দানিউব নদী। রুমানিয়ার পূর্বদিকে রয়েছে কৃষ্ণ সাগর, আর কার্পেথিয়ান পর্বতমালার পূর্ব ও দক্ষিণাংশ রুমানিয়ার মধ্যভাগে অবস্থিত। রাজধানী বুখারেস্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের দশম বৃহত্তম শহর যাতে প্রায় ২ মিলিয়ন বা ২০ লাখ লোকের বসবাস।

মারিয়া সকাল সাড়ে সাতটায় হোটেলে চলে আসে। লবি থেকে ফোন করে আমার ঘুম ভাংগায়।
গুড মর্নিং ফ্রম কান্ট্রি অব ড্রাকুলা।
আমি দুস্টুমি করে বলি, নেভার সিন ড্রাকুলা বিফোর কেইম হেয়ার । ক্যান আই সি দ্যাট নাউ?
মারিয়া হো হো হো করে হাসে। কান পেতে ওর হাসির ঝংকার শুনি। মানুষ যে এতো সুন্দর করে হাসতে পারে, মারিয়াকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না !

ব্রেকফাস্ট টেবিলে মারিয়ার কাছে জানতে চাই, কম সময়ের ভেতর কাছাকাছি কোথায় কোথায় যাওয়া যায়।
মারিয়া একটা প্ল্যান দিলো। ওল্ডসিটি ও নিউসিটি আলাদা করে দেখার কিছু নেই। শুরুটা করা যাক৷ পার্লামেন্ট ভবন দিয়ে।
একটু বিরক্তি নিয়ে জিগেস করি, পার্লামেন্ট দেখার কি আছে?
– তুমি দেখি কিছু জানো না। রুমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্ট আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পার্লামেন্ট।

মারিয়ার কথায় ঈষৎ লজ্জা পেয়ে বলি, আসলে তোমার দেশ সম্পর্কে আমার খুব জানাশোনা নেই। নাদিয়া থেকে হ্যাজি পর্যন্ত আমার দৌড়।

মারিয়া হাসতে হাসতে তাড়া দেয়। চলো দ্রুত বের হয়ে পড়ি।বেলা করে বের হলে ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হবে।

৪.
আমরা প্রথমে চলে আসি রুমানিয়ান পার্লামেন্ট দেখতে। বিশাল আয়তনের পার্লামেন্ট ভবন দেখে আমার ভিমড়ি খাবার অবস্থা। আমেরিকা, কানাডাসহ বিশ্বের অনেক বড় বড় দেশে অনেক সুউচ্চবিল্ডিং ও ভবন দেখেছি। কিন্তু এরকম বিশাল আতনের ভবন দেখেছি কিনা মনে পড়ছে না।

বলা হয়ে থাকে, এ ভবনটি পৃথিবীতে এ যাবতকাল পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে ভারী নির্মাণ ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রশাসনিক ভবন। ১৯৮৪ সালে নির্মান কাজ শুরু হয়েছিলো । ১৯৯৭ সালে ভবনটির পূর্ন নির্মান সমাপ্ত হয়।

মারিয়া প্রফেশনাল গাইড না। আগেই বলেছি ওর জব চলে যাওয়া বেকার বলে আমাকে শহর ঘুরিয়ে দেখাতে রাজী হয়েছিল। আমার কৌতুহল মেটাতে সে মাঝেমাঝে নেট ঘেটে বিভিন্ন রিলেভেন্ট তথ্য দিয়ে দেখাটাকে স্বার্থক করে তুলেছিল। মুগ্ধ নয়নে আমি শুধু দেখি না, নিবিষ্ঠ শ্রোতা হয়ে মারিয়ার বর্ণনা শুনি।

-সকালে তোমাকে বলেছিলাম ফ্রম কান্ট্রি অফ দ্যা ড্রাকুলা। এদেশকে কেন ড্রাকুলা বলা হয় জানো?
আমি মাথা নেড়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করি। বিশাল ভবনের কিছু অংশে হেঁটে আমি ক্লান্ত। পা ভারি হয়ে গেছে। ভবনের ভেতর একটা টুল দেখে বসে পড়ি। মারিয়াও বসে পড়ে মেঝেতে।
-অনেকের কাছে রুমানিয়া ভাম্পায়ারের দেশ নামেও পরিচিত। এদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আইন করে ব্ল্যাক ম্যাজিককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসব কারনে ড্রাকুলার দেশ বলা হয়। এটাও জানো, রুমানিয়ানরা জিপসি। তাই অনেকে যাযাবরের দেশ নামেও ডাকে।।

পার্লামেন্ট ভবন দেখা শেষে আমরা চলে যাই পিয়ানা রেভোলুয়েইই দেখতে। বাংলায় অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায় বিপ্লব স্কয়ার । ১৯৮৯ সালের রুমানিয়ান বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া হয়েছিল এই চত্বর থেকে। বিপ্লবের সময় যারা মারা গিয়েছিল তাদের স্মরণে স্কয়ারের কেন্দ্রস্থলে একটি লম্বা স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
চসেস্কুর প্রতি আমার একধরনের ভালবাসা আছে। তাই এই চত্বর আমার ভাল লাগেনি।

আমরা ঘুরতে ঘুরতে ভীষন ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ক্ষুধাও লেগেছে। মারিয়া আমাকে নিয়ে ন্যাশনাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের কাছাকাছি একটা টার্কিশ রেস্টুরেন্টে ঢুকে। প্ল্যান হচ্ছে খাওয়া শেষে মিউজিয়াম দেখা। লাঞ্চের জন্য তরতিলা, কেবাব, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই অর্ডার করি। মারিয়া আলাদা করে ‘চরবা দে বুরতা’ অর্ডার করে। এটা রুমানিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। রুমানিয়ান ওয়াইনও বিশ্বব্যাপী বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয়। তাই খুব আগ্রহ নিয়ে রেডওয়াইন নেই।
গত দুইদিনে লক্ষ্য করেছি, এদেশের খাবারে তুরস্ক, গ্রীস, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, ইউক্রেন, ইতালির খাবারের যথেস্ট প্রভাব আছে।

খাওয়া শেষে কিছু সময়ের জন্য ন্যাশনাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ঢুকি। গত শতকের শেষের দিকে এই আধুনিক ভবনে মিউজিয়ামটি স্থানান্তরিত হয়েছে।বিশাল আয়তনের ভবনের ভেতর রয়েছে রুমানিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ঐতিহ্যের নির্দশন। তাদের ভূখণ্ডে প্যালিওলিথিক থেকে আজ অবধি সমাজের বিবর্তনকে ও তারা নথিভুক্ত করেছে।

এখান থেকে আমরা চলে আসি ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ আর্ট বিল্ডিংয়ে। অামার পরিচিত অনেকেই বলেন, এটা না দেখলে নাকি বুখারেস্ট আসাই বৃথা। তাদের কথাটা মাথা রেখে সকালেই প্ল্যান করেছি, এটা দেখব।সত্যি আমি নিরাশ হইনি। রুমানিয়ার শিল্পীদের চমৎকার কাজগুলো দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তৈল রং, এক্রেলিক, ওয়াটার কালার পেইন্টিংগুলোতে উজ্জল সব রঙের ছড়াছড়ি। আর্ট কালচার ভালবাসেন এমন মানুষ বুখারেস্ট এসে এই জাদুঘর যদি না দেখেন, সত্যি তারা অনেক বড় কিছু দেখা হতে বঞ্চিত হবেন।

ঘুরতে ঘুরতে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ক্লান্ত দেহে হোটেলে ফিরে আসি। কাল সকালে দেখা হবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মারিয়া বিদায় নেয় লবি থেকে।
৫.
বুখারেস্ট হচ্ছে শিল্প, সাহিত্য এবং বাণিজ্যসহ যাবতীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। পুরো শহর ঘুরে দেখার জন্য তিনদিন কোন সময়ই না। তবুও মারিয়ার কারনে দর্শনীয় স্থানগুলো দেখা হয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপ অন্যান্য দেশগুলো থেকে রুমানিয়া তুলনামূলকভাবে কম স্বচ্ছল অর্থনীতির দেশ।জনসাধারণের জীবন-যাত্রার মানও ইউরোপের অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে নিম্নমানের। তবে রুমানিয়ার মানুষেরা খুবই পরিশ্রমী। দেশটি খুব দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

এখানকার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মানুষের উদ্দামতা মন ভরিয়ে দেয়। মারিয়ার সাথে গত দুইদিনে ওঠাবসায় টের পাই ওরা কতটা আন্তরিক ও বন্ধুবৎসল।

একটু দেরী করে আমরা বের হয়ে ওল্ডটাউন যাই। সকাল থেকে আবহাওয়া একটু গরম। বারবার পানির পিপাসা লাগে। চলতিপথে একটা গ্রোসারি থেকে দু’টো পানির বোতল কিনি তিন ইউরোতে।

ওল্ডটাউনে প্রচুর পর্যটক ঘুরছে ফিরছে।তাদের মাঝে প্রাচ্যের অনেক পর্যটকও চোখে পড়ে। সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে গোথিক প্যার্টানের বিল্ডিংগুলোর অসাধারণ নির্মাণশৈলীর স্থাপত্যকলা দেখছে। এ শহরের গঠন, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এর সঙ্গে বিদ্যমান সাহিত্য এবং চিত্রকলার অপরূপ মেলবন্ধনের কারণে বুখারেস্টকে পূর্ব ইউরোপের প্যারিস বললে মোটেও ভুল হবে না।

ঘুরতে ঘুরতে মারিয়ার কাছে জানতে চাই , আচ্ছা তোমার দেশের জনসংখ্যায় আর কোন দেশের প্রভাব রয়েছে।

– গুড কোশ্চেন। আমিও ভাবছিলাম আমাদের জনগোস্টি নিয়ে তোমাকে একটা ধারনা দিব। অরিজিনাল রুমানিয়ানদের সাথে হাঙ্গেরিয়ান, জার্মান, রোমা, ইউক্রেনিয়ানসহ অনেক এথেনিক গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। শহরাঞ্চলে বসবাস করা মানুষেরা সাধারণত পাশ্চাত্য ভাবধারার পোশাক পরিধান করে থাকেন। তবে গ্রামাঞ্চলের দিকে বসবাস করা মানুষেরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করতে বেশি ভালোবাসেন।রুমানিয়াতে মেয়েদের চুল দেখে বলে দেওয়া যায়, সে কি বিবাহিত, নাকি অবিবাহিত। অবিবাহিত মেয়েরা চুল খোলা রাখতে পছন্দ করে এবং সাধারণত চুলে বেণী গেঁথে রাখে। আর বিবাহিত নারীরা মারামা নামক এক ধরণের কাপড় দিয়ে চুল ঢেকে রাখে।

একথা শুনে আমি মারিয়াকে লক্ষ্য করি। ওর চুল খোলা। এক বেনীতে গাঁথা।
– তাহলে তুমি….
মারিয়া আমার কথা কেড়ে নিয়ে বলে, আই এম নট এন আনমেরিড উইমেন। আই হ্যাভ টু কিডস। দে আর লিভিং উইথ মাই মামা ইন ব্রাসাভ। বাট আই ডিভোর্সড এন্ড সিংগেল। লিভিং হেয়ার।

আমি আসলে ওর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহ দেখাইনি বলে কিছুই জানতাম না। ওর কথা শুনে বুঝতে অসুবিধা হয় না চুল খোলা রাখার কারন।

ওল্ডটাউন থেকে আমরা চলে আসি পারকুল কিসেলফ। এটা মুলতঃ পার্ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত আমেরিকান সৈনিকদের স্মৃতিসৌধ রয়েছে ।২০০৭ সালে নির্মিত হয় সৌধটি। কিসেলফ পার্কের পূর্ব অংশে ছোট স্মৃতিসৌধটির অবস্থান।

পার্ক থেকে বের হয়ে আমরা যাই বুখারেস্ট কনসার্ট হল দেখতে। চমৎকার দৃষ্টিনন্দ ভবন । ভিতর ও বাহিরের খিলানে দারুন সব কারুকাজ করা। সারা বছর এখানে কনসার্ট বা অর্কেস্ট্রা উপভোগ করা যায়। হলের ভেতর দুই সহস্রাধিকের ওপর সিটিং ক্যাপাসিটি। লবি ও বাহিরে অপেক্ষামান আরো তিনসহস্রাধিক সংগীতপ্রেমী কনর্সাট উপভোগ করতে পারেন।

বুখারেস্টে আমার আজ শেষ দিন।কাল সকালে আমাকে চলে যেতে হবে বার্লিন । সেখান হতে দুইদিন পরে ঢাকায় ফিরবো। এই যাত্রায় জার্মান এসে রুমানিয়া ঘুরে যাওয়া আমার জন্য স্মরনীয় হয়ে থাকবে। মারিয়াকে পেয়ে যাওয়ায় আমার বুখারেস্ট ট্যুর সহজ হয়েছিল।

হোটেলে ফেরার পথে আমরা সেন্ট্রাল বুখারেস্টের একটা স্প্যানিশ রেস্টুরেন্টে ডিনারের জন্য ঢুকে পড়ি।ছিমছাম সুন্দর রেস্টুরেন্টটির দু’পাশের দেয়ালে লাগানো জায়ান্ট স্ক্রীনে ফুটবল খেলা দেখতে প্রচুর কাস্টমার আসে। খাওয়ার পাশাপাশি খেলা উপভোগ করে। ইউরোকাপের সময় এখানে তিলধারনের ঠাঁই থাকে না। আমরা অর্ডার করি বিফস্টেক, স্পেনিশ অলিভ উইথ ম্যাশ পটেটো , সালাদ, ওয়াইন। খাওয়ার সাথে গল্প করতে করতে মারিয়ার সাথে শেষ ডিনারটি দারুন উপভোগ করি। গত তিনদিন আমাকে সময় দেয়ায় তাকে অনারিয়ামের খামটি হাতে দিতে মুহুর্তে মারিয়ার চেহারা লজ্জায় লাল হয়ে যায়।খুব লাজুক কন্ঠে বললো, আমি খুব এনজয় করেছি তোমার সঙ্গ। জব থাকলে তোমাকে হয়তো এভাবে সময় দিতে পারতাম না। কিংবা দিতে পারলেও খামটি নিতাম না। যদি কিছু মনে না করো আমি ডিনারের বিল পে করতে চাই।

তাঁর কথা বলার মধ্যে একটা আর্ট আছে। ওর চোখে মুখে আকুতি আমি যেন বিলটা দিতে নিষেধ না করি। মনে মনে হিসেব কষে বের করি অনারিয়াম হতে ডিনারের বিল দিলে মারিয়ার হাতে অবশিষ্ট কত থাকতে পারে। একদিনের পারিশ্রমিকের কিছু কমবেশী বিল দেয়ার পর ভালই থাকবে।

মারিয়ার আন্তরিকতামাখা অনুরোধ আমি উপেক্ষা করতে পারি না। আমার সম্মতি পেয়ে ওর চোখমুখ আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠে। ক্ষনিকের পরিচয়ে মারিয়ার কাছে যে আন্তরিকতা পেয়েছি তা সারাজীবন মনে থাকবে। আবার কখনো বুখারেস্ট যাওয়া হলে মারিয়াকে খুৃঁজে বের করবো এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বুখারেস্ট ভ্রমন শেষ করেছিলাম।

ভাল থেকো মারিয়া। আবার হয়তো একদিন দেখা হবে। ভাল থেকে পুর্ব ইউরোপের প্যারিসখ্যাত বুখারেস্ট।

 

আরও পড়ুন