“মায়াবী পর্দায় আল মাহমুদ “

ওমর ফারুক

আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬ সালে, ব্রিটিশ যুগে।পরাধীন ভারতবর্ষের নাগরিক,  তাঁকে ত্রিকালজ্ঞ বলা চলে। তিনটি যুগ,সময়ের সাক্ষ্যবহন করেন।তিতাস নদীর চারপাশ ছাপিয়ে তিনি ধীরেধীরে বাংলাসাহিত্যে ঢুকে পড়েন।তাঁর পথ মসৃণ ছিলো না।বাংলাসাহিত্যে তখন রবীন্দ্র বলয়ের প্রভাব তীব্র। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের ভাবধারা অনুসরণ করে অনেকে লিখছেন।আল মাহমুদ সে পথে হাঁটেননি। তিনি তার নিজের জন্য আলাদা পথ তৈরি করলেন।বাংলা কবিতার বাঁক পরিবর্তন হলো। তিনি মুক্ত ছন্দকে আশ্রয় করে আধুনিক কবিতা এগিয়ে নিয়ে গেলেন।১৯২৩-২৪ এর দিকে ঢাকায় শিখা গোষ্ঠীর আর্বিভাব হয়।এই শিখা গোষ্ঠী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করতেন।আল মাহমুদ প্রথম দিকে এদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা তাঁকে উদারনৈতিক হতে পথ দেখায়।তিনি তাঁর কবিতার পথ খুঁজে পেলেন।১৯৬৩ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “লোক-লোকান্তর”  প্রকাশিত হয়।তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো, গ্রামীণ জীবন,বামপন্থী চিন্তাভাবনা, নারী। তাঁর কবিতার ভাষা আলাদা, আবেদন আলাদা।তিনি বলেন,”কবিতা কষ্টের কলা,কষ্টসমুদ্রে ডুব দিয়ে কবিতার রসদ সংগ্রহ করতে হয়।”আল মাহমুদ আরো বলতেন,”কবিতা চরের পাখি,কুড়ানো হাঁসের ডিম,গন্ধভরা ঘাস।”তিনি একুশে ফেব্রুয়ারি কবিতায় বলেছেন”,

প্রভাত ফেরি,প্রভাত ফেরি
নেবে আমায় সঙ্গে?
বাংলা আমার ভাষা, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।

স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।এতো ভূমিকা টানলাম তার কারণ আছে। আল মাহমুদ মূলত কবি।তিনি দেশ ও সমাজ বিরোধী ছিলেননা। ১৯৭৪ সাল অবধি “দৈনিক গণকণ্ঠ ” পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।পত্রিকাটি তখন সরকার বিরোধী জাসদ কর্তৃক প্রকাশিত হতো। আল মাহমুদ বামপন্থী কিংবা মার্কসবাদী নন, এটা তাঁর নিজের কথা।তিনি সাংবাদিক হিসেবেও নিজের পরিচয় দেয়া পছন্দ করতেন না।তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “সোনালী কাবিন” প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে।কবি তখন পরিণত এবং অনিবার্য। দেশ স্বাধীনের ফলে কিছু লোক পথে বসে যায়, অপাংক্তেয় হয়ে পড়ে।অথচ পাকিস্তান যুগে সবাই জিন্নাহ বন্দনা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের গুণকীর্তন করেছেন।দেশ স্বাধীনের পর সিকান্দার আবু জাফর, ফররুখ আহমদ চাকুরী হারান,সম্মান হারান।মানসিক অশান্তি নিয়ে অনেকেই গৃহবন্দী ছিলেন।আল মাহমুদ সে কাতারে ছিলেন না।তিনি তখন সোনালী কাবিনের জোরে পাঠকের হৃদয়ে।

মাহমুদ তাঁর লিখনি দিয়ে অনেক দূর গেলেন।তাঁর মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো কিন্তু তিনি সে পর্দায় নিজেকে আবৃত করে নিলেন।তাঁর চিন্তা,চেতনা, কাব্যের ভাষায় পরিবর্তন এলো। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলাতে লাগলেন।তাঁর কাব্যে নতুন বিশ্বাসের আর্বিভাব হলো। পানকৌড়ির রক্ত,বখতিয়ারের ঘোড়া, নীল নাকফুল,উপমহাদেশ,কাবিলের বোন,ইমাম খোমেনির প্রেমবাদ প্রভৃতি রচনা তাঁর বিশ্বাস আর মানসিক দ্বন্দ্বের ভিত্তি করও প্রকট করে তোলে।বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর শামসুর রাহমানের পর আল মাহমুদ অনিবার্য হয়ে উঠেছিলেন। সে আল মাহমুদ প্রগতিশীল সমাজের কাছে অপাংক্তেয় হয়ে উঠলেন।তাঁকে মৌলবাদের তকমা দেয়া হলো। তিনি অসহায় আত্মসমর্পণ করলেন।তাঁকে অনেকটা বয়কট করা হলো। কোনো সভা,সমাবেশ কিংবা তাঁর প্রিয় জায়গা বাংলা একাডেমিতেও তাঁকে ডাকা হতো না।আল মাহমুদ বলেছেন,আমি কোনো সময়ই নাস্তিক ছিলাম না।আমি সব সময়ই আস্তিক ছিলাম।আমার বিশ্বাস আমাকে মানসিক প্রশান্তি দিয়েছে।আসলে কোনো কবিকে বিচার করতে হয় তাঁর কবিতা দিয়ে,তাঁর বিশ্বাস কিংবা দর্শন দিয়ে না।কিন্তু আমাদের এখানে তেমনটাই হয়েছে। আল মাহমুদ ২০০৭-২০১৯ সাল অবধি দীর্ঘ সময় এই মানসিক শাস্তি ভোগ করেছেন।তাঁকে রাষ্ট্র একঘরে করে দিয়েছিল।আল মাহমুদ কেন মায়াবী পর্দার মতো আড়ালে চলে গেলেন, এ প্রশ্নের উত্তর তিনি বহুবার দিয়েছেন।তিনি বলতেন,”আমি যে পরিবারে জন্মেছি তারা সবাই ছিল খুবই ধর্মপ্রবণ লোক।কিভাবে যেন তাদের মধ্যেই যে রয়েছে সত্যিকারের পথের ঠিকানা এটা আমাকে দূর থেকে ইশারায় ডাকতো। “তিনি বাংলাসাহিত্যের গতি পরিবর্তন করেননি। তিনি তাঁর বিশ্বাস পরিবর্তন করেছেন।তাঁর বিশ্বাস তাঁর কাছে।তাঁকে বিবেচনা করতে হবে তাঁর কবিতা দিয়ে।বিদ্রোহী কবিতার মতো কবিতা বাংলাসাহিত্যে আর একটিও নেই।তালেব মাস্টারের মতো কবিতা আর কেউ লিখতে পারেনি।আল মাহমুদের ক্ষোভ ছিলো, তাঁর বন্ধু শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান,আহমদ ছফা,শামসুল হক,আসাদ চৌধুরী সবাই তাঁকে এড়িয়ে চলতেন।একটা সময় তিনি ক্ষোভের সাথেই বলেছিলেন,”কেউ কি আরেকটি সোনালী কাবিন লিখতে পেরেছে ? আল মাহমুদ এ আক্ষেপ নিয়েই চলে গেছেন।আমরা একজন কবিকে বিচার করেছি তার ধর্মবিশ্বাস দিয়ে।অথচ বাংলাসাহিত্যে তিনিই একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা কবি।তাঁকে বিচার করতে হবে তার কবিতা দিয়ে।নয়তো তিনি  মায়াবী পর্দার মতোই রহস্যময় থাকবেন উত্তর প্রজন্মের কাছে।

ওমর ফারুক – সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন