মুনীর চৌধুরীঃ বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র

এম আর রাসেল

একজন প্রতিভাধর নাট্যকার, শিক্ষক, বাম রাজনীতির কর্মী, সম্মোহনী বক্তা, বাংলা কি-বোর্ডের উদ্ভাবক, ভাষা আন্দোলনের কর্মী, সবশেষে শহীদ- সংক্ষেপে এই হল মুনীর চৌধুরীর পরিচয়। ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাবা খান বাহাদুর আবদুল হালিম সেই সময়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ১৪ ভাইবোনের মধ্যে মুনীর ছিলেন ২য়।

মুনীর চৌধুরী ছোট বেলা থেকেই বই পডুয়া ছিলেন। এর জন্য তার বাড়ির পরিবেশ বাড়তি একটি সুবিধা দিয়েছিল। সব ভাইবোন পাল্লা দিয়ে বই পড়তেন। তবে মুনীর চৌধুরী অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই পড়তেন। পড়াতে উৎসাহ দিতে বাবা আব্দুল হালিম ছেলেকে সাতাশ খণ্ডের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা উপহার দিয়েছিলেন।

১৯৩৫ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সেই সময় তাঁর হাতে পাঠ্য বইয়ের চেয়ে অন্য বই বেশি থাকত। এজন্য সহপাঠীরা তাঁর নাম দিয়েছিল চালিয়াত। স্কুলের পাঠ শেষ করে পড়তে যান আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৩ সালে আলীগড় থেকে আইএসসি পাস করেন। এক লেখায় তিনি বলেছেন,

‘আলীগড় আমায় মোহিত করেনি। তবে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের যা আমাকে আকর্ষিত করেছিল, তা হচ্ছে এর বিশাল পাঠাগার। বিশ্বের সকল লেখকের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ যোগ হয় এই পাঠাগারে’। 

মুনীর চৌধুরী

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রবি গুহ, দেবপ্রসাদ, মদন বসাক, সরদার ফজলুল করিম- প্রমুখদের সাথে মিশে জীবনকে অন্যভাবে আবিষ্কার করেন। তিনি এই সময়ের কথা লিখেছেন,

‘তাদের সংস্পর্শে এসে দেখলাম আমার এতদিনের আভিজাত্য, চাকচিক্য, সৌখিনতা আর চালিয়াতি সব অন্তঃসারশূন্য, সব ফাঁকি। সে সময় পড়ুয়া ছাত্র হিসেবে আমার নাম হয়েছে। এদের চোখে জীবনকে উপলব্ধি করলাম’।

মুনীর চৌধুরী

ছেলে বাম রাজনৈতিক আদর্শে জড়িয়ে গেলে খান বাহাদুর ভাল চোখে দেখেননি। পরে এক সময় মুনীর চৌধুরীর রাজনীতি প্রীতি চলে যায়। ১৯৪৯ সালে খুলনায় ব্রজলাল কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ের পরিবর্তন নিয়ে তিনি লিখেছেন,

‘খুলনার প্রফেসর মুনীর চৌধুরী আর ১৯৪৮ এর শুরুর ভাগের মুনীর চৌধুরী সম্পূর্ণ দুটি আলাদা মানুষ। শেষের মানুষটাই আসল। দুর্বল, ভীরু, পলাতক, সাধারণ, স্বাভাবিক, স্বাপ্নিক’।

স্বাপ্নিক এই মানুষটার সাধারণ জীবন যাপন মনে হয় কপালে ছিল না। ঢাকায় পরীক্ষার খাতা আনতে গেলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন,

‘গোয়েন্দা পুলিশের বুদ্ধি বলিহারী। গভর্মেন্টের মুণ্ডু যখন মহোৎসাহে সর্বত্র সুউচ্চ কণ্ঠে চিবুচ্ছিলাম তোমরা তখন আমায় গ্রেফতার করলে না। তোমাদের সঙ্গে আপোষ করে একটা শান্তিপূর্ণ নতুন জীবন শুরু করব বলে যেই চাকরি নিয়েছি অমনি তুমি আমার ঘাড় মটকে জেলে ফটকের ভেতর ছুড়ে ফেলে দিলে’।

জেল থেকে বের হয়ে লিলি মির্জাকে বিয়ে করেন। ১৯৫০ সালে জগন্নাথ কলেজে কিছুদিন চাকরির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী প্রভাষক পদে যোগ দেন। এরপর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় যোগদান করায় ১৯৫২ সালে পুনরায় জেলে যান। জেলে বসে রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধে রচনা করেন নাটক কবর। এর বাইরে জেলে বসেই জর্জ বার্নার্ড শ’র ‘You can tell’ অনুবাদ করেছেন। এর নাম দিয়েছেন ‘কেউ কিছু বলতে পারে না’। জর্জ গলওয়ার্দির ‘The Silver Box’ রূপার কৌটা’ নামে অনূবাদ করেন।

জেলে থাকাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের পাশাপাশি বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫৬ সালে রকফেলার বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্ব পড়তে যান। দেশে ফিরে পুরোদস্তুর অধ্যাপনা ও সাহিত্যকর্মে মনোনিবেশ করেন।

মুনীর চৌধুরীর শিক্ষক পরিচয়ের চেয়েও তিনি নাট্যকার হিসেবেই সমধিক প্রসিদ্ধ। তবে শিক্ষক হিসেবেও তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর অসাধারণ বাগ্মীতায় সকলে মোহিত হত, আন্দোলিত হত। একবার এক ছাত্র তাঁর কাছে এসে দুঃখের কথা উল্লেখপূর্বক আত্নহত্যা করতে চাইলে তিনি বলেছিলেন,

‘দেখো, তোমার মতো অবস্থায় আমারও একাধিকবার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু পরে দেখেছি, আত্মহত্যা না করে ভালোই করেছি—পৃথিবীটা বসবাসের যোগ্য।’

মুনীর চৌধুরীর কিছু সৃষ্টি

এক সময়ের জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মুনীর চৌধুরীর বক্তব্য সম্পর্কে লিখেছেন,

‘মুনীর চৌধুরীর মার্জিত মননশীল ও প্রাণবন্ত বক্তৃতা এবং অনবদ্য বাচনভঙ্গি আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এ প্রভাব এতটাই সর্বগ্রাসী হয়েছিল যে আমার কথা বলার ঢংটাই কিছু সময়ের জন্য তাঁর মতো হয়ে গিয়েছিল’।

একজন বক্তা, শিক্ষক পরিচয়ের বাইরে তিনি বাংলার নাট্য জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। পাকিস্তান আমলে যে দুইজন নাট্য প্রতিভার প্রোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল তার মধ্যে একজন মুনীর চৌধুরী। অন্যজন নুরুল মোমেন। বাংলা নাট্যের সমৃদ্ধিতে মুনীর চৌধুরী যে কতটা ভূমিকা রেখেছেন তা বুঝতে পারা যায় খ্যাতিমান কিছু নাট্যকারের জবানিতে। কয়েকজনের কথা শোনা যাক।মমতাজউদ্দীন আহমেদ বলেছেন,

‘বাংলা নাটক পাঠের আনন্দ বোধ আমার জাগতই না, যদি না তিনি বাংলা নাটকের ক্ষুদ্র, সামান্য ও অকিঞ্চিৎকর নাট্য ঘটনাগুলো আমার দৃষ্টির মধ্যে এনে দিতেন। তিনিই আমাদের স্বদেশি ও বিদেশি নাট্য বিষয় সম্পর্কে সচেতন করেছেন। আমি নাটক বানাতে বসে বারবার মুনীর চৌধুরীর কাছে উপস্থিত হই’।

আবদুলস্নাহ আল মামুনের ভাষায়,

‘তিনি যে-কোনো নতুনকে, যে-কোনো নবীনকে অভিনন্দন জানাবার, অনুপ্রাণিত করবার এবং আপন হৃদয়ে সেই আধুনিকতা লালন করে আরো তীক্ষনতাদানের আশ্চর্য উদারতা ও ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।’

রামেন্দু মজুমদারের স্বীকারোক্তি,

‘আমরা লাভ করেছি তাঁর কাছ থেকে আমাদের অভিনয় জীবনের সত্যিকারের শিক্ষা।’

সেলিম আল দীনের মূল্যায়ন,

‘ছাত্রজীবনে শ্রদ্ধেয় মুনীর চৌধুরী নাট্যরচনায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতেন এবং আমি স্বয়ং এর সাক্ষী।’

অল্প কিছু লেখনীর মাঝেও তিনি বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন। কবর রচনার মধ্য দিয়েই তিনি নাট্যজগতে পা রাখেন। এই নাটকটি বাংলা সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটকের মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় রক্তাক্ত প্রান্তর। পানিপথের ৩য় যুদ্ধ অবলম্বনে এটি রচনা করেন। অন্যান্য নাটকের মধ্যে রয়েছে চিঠি, দণ্ডকারণ্য, পলাশী ব্যারাক ও অন্যানা। অনূদিত নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মুখরা রমণী বশীকরণ। শেকসপিয়ার এর Taming of the Shrew থেকে অনূদিত হয়েছে।  নাটকের বাইরে তিনি সমালোচনা মূলক প্রবন্ধও লিখেছেন।

মীর মোশাররফ হোসেনকে নিয়ে লেখা মীর মানস লেখার জন্য দাউদ পুরষ্কার পেয়েছেন। টিভিতে তিনি একট বই সমালোচনার অনুষ্ঠানও করতেন। সেই অনুষ্ঠানের বিষয় নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন,

‘গড় পড়তা সমালোচকদের বিচারের নিক্তি একটু বেশিরকম কড়া। বইয়ের কোথাও এতটুকু স্খলন-ত্রুটি পেলে সেগুলো নিয়ে হৈচৈ তুলে তাএ ফাঁক দিয়ে নিজের বিদ্যা ফলানোর মওকা খোঁজেন। কিন্তু মুনীর চৌধুরী সমালোচনা করতেন বন্ধুর মতো, সুহৃদের মতো।’

বাংলা সাহিত্যের অবদানের স্বীকৃতি স্মারক হিসেবে ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার ও ১৯৮০ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। পাক ভারত যুদ্ধ নিয়ে লেখা রচনা সংকলন ‘রণাঙ্গন’ এর জন্য সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উপাধি পান। পরে এই উপাধি বর্জন করেছিলেন। গুণী এই মানুষটি ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর নিহত হন। মরে গিয়েও তিনি বেঁচে আছেন বাংলার মানুষের মাঝে, বেঁচে থাকবেন এটা হলফ করে বলা যায়।

তথ্যসূত্রঃ পত্রিকায় প্রকাশিত আর্টিকেল (Roar Bangla, কালি ও কলম, প্রথম আলো), আমার উপস্থাপক জীবন – আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

লেখকঃ গবেষক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন