মুভি রিভিউ: গ্লোবালাইজেশনের আগ্রাসনে বিপর্যস্ত সময়ের গল্প ‘শঙ্কর মুদি’

মাসুদুল হাসান রনি 

অনেকদিন পর একটা বাংলা সিনেমা দেখার আগ্রহ থেকে সাত সকালে দেখা হলো ওপাড়বাংলার ‘শঙ্কর মুদি’। সিনেমা দেখা শেষে মনে হলো, না আমার পছন্দ বৃথা যায়নি, সময়ের অপচয় হয়নি। দারুন একটা সিনেমাই শেষ পর্যন্ত দেখা হলো।
এ সিনেমাটিকে শুধুমাত্রই একটা পাড়ায় শপিংমল তৈরির কাহিনী বলা ভুল হবে। এ সময়ের রাস্ট্র, সমাজের সামগ্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের গল্পের মিশেলে কিভাবে একটি সমাজ পাল্টে যাচ্ছে তারই কাহিনীর চিত্রায়ন। কিভাবে আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা মানুষের নৈতিক চরিত্র দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে দেয় তারই চিত্ররূপ । সে জন্যই শেষ দৃশ্যে নিতান্ত আটপৌরে নমিতা সংসার বাঁচাতে ভবেনদার কাছে ধরা দেয়। দু’দিন আগেও পাড়ার যে মেয়েটার ডাকে তার অসুস্থ বাবাকে বাঁচাতে ছুটে আসত লোকজন, আজ সে জানলা খুলে সাহায্যের জন্য হাহাকার করে। কেউ এগিয়ে আসে না । সময়ের সাথে পাড়ার মানুষ বদলে গেছে, পারস্পরিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য বিনস্ট হয়ে তাদের মানবিকতা মরে গিয়েছে। উন্নয়নের ঝড়ে কিভাবে হারিয়ে যায় নিম্নবিত্তরা, শুধু টিকে থাকে পদে পদে আপোষ করা আমাদের মধ্যবিত্ত। যারা মেরুদন্ড খুইয়ে, মাথা বিক্রি করে সব দেখে শুনে- বুঝেও চুপ করে থাকে। বিকারহীন সেইসব মানুষকে নিয়ে শঙ্কর মুদি।

কলকাতার একটি বিবর্ণ গলি ঘুপচি পাড়ার কাহিনী নিয়ে শঙ্করমুদি সিনেমার গল্প। যে পাড়ার বাড়ির গায়ে রং কবে পড়েছে তা হয়তো মালিকও ভুলে গেছেন। নোংরা সরু গলির এ পাড়ায় রঙের সমাহার নেই, নেই ঝলমলে আলোর রোশনাই। রয়েছে শুধু হৃদয়ের টান, সম্প্রীতি। আছে শত হাহাকারের মাঝে মানবতার জয়গান। কেউ বিপদে পড়লে বুক দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাড়ার যুবক শঙ্কর, নারায়ন, কালীরা। পাড়ার মুদির দোকান চালান শঙ্কর। তাঁর দোকানের নাম অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার। তার পাশেই ফ্যান্সি টেইলার্স, একটু দূরে নমিতার টেইলারিংয়ের দোকান।এই কালী, নারান, বিশুরা টুকটাক কাজের সঙ্গে আড্ডাবাজি করে কাটায় সারাদিন।

রাতবিরেতে এরাই আবার ছুঁটে যান অসুস্থ বৃদ্ধকে হাসপাতালে ভর্তি করতে, বিষ খেয়ে ফেলা মেয়ের কাছে বাড়ির লোকের আগে পৌঁছে যান, দোকানে ভিজে ভিজে আসা খরিদ্দারকে ছাতা মাথায় এগিয়ে দেন শঙ্কর মুদি, রোজ অফিসফেরত মাতালকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। ক্রেডিট বা ডেভিডকার্ড কী জিনিস জানেন না শঙ্কর মুদি। তাঁর মুদির খাতা আছে, সেটা তাঁর ক্রেডিটের খাতা। পাড়ার সবার নাম আছে তাতে। সেখানেই ধারের হিসেব লেখেন তিনি। টুকরো টুকরো আন্তরিক ছবিতে উঠে আসে চেনা কলকাতা, ষাট-সত্তুর দশকের কলকাতা। যেখানে পয়সার চাকচিক্য নেই বটে, কিন্তু মানুষ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় গভীর মমতায়।জীবন এখানে জঠিল হয়ে উঠেনি, যতোক্ষন বড়পুৃজির আগ্রাসন বা থাবা পড়েছে।
এক পর্যায় কাহিনী মোড় নিতে শুরু করে। জমির দখল নিয়ে বোমাবাজি হয় পাড়াতে। পাড়ার পাশের মাঠে ঝকঝকে শপিংমল তৈরি হয়। যে ভবেনদা দোকান বন্ধ করে সবাইকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মিছিলে যেতে বলেন সেই ভবেনদাই শপিংমলের দালালি শুরু করেন। অসহায় দুর্বল মানুষের নৈতিক পরাজয় ঘটে পুঁজির কাছে। বড় পুঁজি গ্রাস করে নেয় ছোট পুঁজিকে। গ্লোবালাইজেশনের ধাক্কা এসে লাগে পাড়ার নড়বড়ে দরজায়। হঠাৎ পাল্টে যেতে থাকে চেনাজানা সব কিছু।

চেনা পাড়া অচেনা হয়ে উঠে নারায়নের,শঙ্করের। শপিং মলে ভিড় বাড়ে। পুরনো মুদির দোকান, টেলারিং শপ, সেলুনের আর কোনও কদর থাকে না। কদর বাড়ে চাকচিক্যময় শোরুমের। তছনছ হয়ে যায় পাড়া। শুধু কিছু বৃদ্ধ বয়স্ক মানুষ পুরনো মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন শঙ্কররা। দুর্বল আর সবলের অসম লড়াই লড়ার চেষ্টা করেন শেষবারের মতো। তাও ভাঙতে থাকে, ভাঙতেই থাকে সবকিছু। পাড়ার সব আলো নিভে যায়, শুধু আলোকিত হতে থাকে শপিংমল। শেষ পর্যন্ত একদিন যে মাস্টারমশাই তথাকথিত উন্নয়নের বিষময় ফলের কথা বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে শঙ্করের দেখা হয়ে যায় শপিংমলে।

নির্মাতা অনিকেত চট্টোপাধ্যায় এ সময়ের গ্লোবালাইজেশন ও পুঁজির দাপটে মুল্যবোধের অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উত্থান-পতনকে ধরতে চেয়েছেন তাঁর সিনেমায়। তিনি দেখাতে চেয়েছেন এখানে কিভাবে রাজনীতি শুধুই সুবিধাভোগের যন্ত্র হয়ে উঠে। যাঁরা মাথা তুলে, শিরদাঁড়া টানটান করে দাঁড়াতে যান, তাঁদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ এসবের মধ্যে থাকতে চায় না। এই জন্যই ‘কমরেড’ শুনে ছিটকে যান শঙ্কর মুদি। এই সব মানুষদেরকে, তাঁদের চারপাশে ঘটে চলা রাজনীতির নোংরা খেলাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। কিছু সূক্ষ্ণ স্যাটায়ারের ব্যবহার থাকলেও ছবির মুডের সঙ্গে সঙ্গতি রাখার জন্যই কোনও কমিক রিলিফ নেই সিনেমাতে। মাঝে মাঝে ছবির গতি একটু শ্লথ হয়েছে।
প্রধান চরিত্রে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় যথারীতি অসাধারণ অভিনয় করেছেন। শঙ্কর মুদির আনন্দ, দুঃখ, বেদনা, তাঁর লড়াই, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া- এসবই কৌশিকের প্রতিটি অভিব্যক্তিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই চরিত্রে সত্যিই তাঁর কোনও বিকল্প ছিল না। কৌশিকের স্ত্রীর চরিত্রে শ্রীলা মজুমদার ভাল অভিনয় করেছেন। কালীর চরিত্রে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় বেশ ভাল। বহুরূপীর ভূমিকায় রুদ্রনীলকে দেখতে খারাপ লাগে না। মাস্টারমশাইয়ের ভূমিকায় অঞ্জন দত্ত ছিলেন পারফেক্ট চয়েস।

সিনেমা দেখা শেষে বেশ কিছু সময় কেটেছে শঙ্করমুদি থেকে বের হতে। শঙ্কর মুদি ভাবায়, এই সিনেমার রেশ থেকে যায় মননে। আমাদের ঢাকা কিংবা মফস্বল শহরে এরকম অসংখ্য শঙ্করমুদি ছিলেন। আমরা দেখেছি পাড়ার সবার সাথে তাদের হার্দিক সম্পর্ক ছিল। যারা চল্লিশোর্ধ তারা দেখেছেন, পাড়াগুলি নষ্ট হয়ে যেতে। দেখেছেন সামাজিক মুল্যবোধের চরম অবক্ষয়।কলকাতার বিশু,নারায়নদের মতন আমরাও চিনতাম শঙ্করমুদিদের। গ্লোবালাইজেশনের যুগে এখনও পাড়ার ছোট্ট দোকানদার নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছেন । এই সব মানুষের কথা বলে এই সিনেমা। ‘শঙ্কর মুদি’র সাফল্য এখানেই।
অভিনয় করেছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীলা মজুমদার, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, কাঞ্চন মল্লিক, অঞ্জন দত্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়

লেখকঃ ভ্রমণগদ্য লেখক ও প্রবাসী বাংলাদেশী, কানাডা

আরও পড়ুন