মুভি রিভিউ : হ্যাকশ রিজ (Hacksaw Ridge)

আরেফিন আল ইমরান

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে শুধু এটুকু বলে রাখি যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে করা তো বটেই সর্বকালের সেরা ওয়ার মুভির সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও ‘হ্যাকশ রিজ’ অবশ্যই থাকবে। ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ এর সাথে একই কাতারে থাকার মত মুভি। কোনটা বেশি ভালো সেটা বলা কঠিন।

পরিচালক : মেল গিবসন
জনরা : বায়োগ্রাফিকাল ওয়ার ড্রামা।
অভিনয়ে : অ্যান্ড্রু গারফিল্ড, স্যাম ওরথিংটন, টেরেসা পামার, লুক ব্রেসি প্রমুখ।
স্ক্রিন প্লে : রবার্ট শিনকান ও অ্যান্ড্রু নাইট।
সিনেমাটোগ্রাফি : সাইমন ডুগান।
সঙ্গীত : রূপার্ট গ্রেগসন-উইলিয়ামস
রিলিজ ডেট : ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬
প্রেক্ষাপট : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

কাহিনী সংক্ষেপ : আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় চার সদস্যের একটি পরিবার। বাবা সাবেক সেনা কর্মকর্তা–যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। যাই হোক, সেই পরিবারেরই তরুণ সন্তান ‘ডেসমন্ড ডস’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে যায় চিকিৎসাসেবী হিসেবে। কিন্তু ট্রেইনিং ক্যাম্পে সার্জেন্ট হাওয়েল ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতনরা তাকে রাইফেল চালনায় উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। এদিকে নিজের ধর্মবোধ ও নৈতিক বিশ্বাস থেকে অস্ত্র ধারণ না করার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকে ডস। এটা নিয়ে শেষতক কোর্ট মার্শাল বসে যায় তার বিরুদ্ধে। তবে সাবেক সেনা সদস্য বাবা ও প্রেমিকা ডরোথির তৎপরতায় শাস্তি থেকে বেঁচে যায় ডেসমন্ড ডস। তাকে কোনো প্রকার ফায়ার আর্ম ছাড়াই চিকিৎসাসেবী হিসেবে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়। এদিকে ডরোথির সাথে ডসের বিয়েটাও স্থগিত থাকে বিশ্বযুদ্ধের জন্য।
যাই হোক, জাপানের ‘পার্ল হারবার’ আক্রমণের ঠিক পরপরই ৭৭-ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের হয়ে প্রথমবারের মত যুদ্ধে অংশ নেয় ডস। পরে তাদের ৯৬- ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনকে রিলিভ করার জন্য অপারেশন দেয়া হয় হ্যাকশ রিজে। যুদ্ধের প্রথম দিকে দু’পক্ষেরই অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। অমীমাংসিত থাকে প্রথম দিনের যুদ্ধ। দ্বিতীয় দিন, জাপানিরা ভয়াবহ কাউন্টার অ্যাটাক করে বসে। বাধ্য হয়ে পিছু হটতে হয় মার্কিন সেনাদের। নিউমেরিক্যাল অ্যাডভান্টেজ আর সারপ্রাইজ অ্যাটাকের সুবাদে ব্যাপক প্রাণহানী ঘটে আমেরিকান সৈন্যদের। হ্যাকশ রিজের খাড়া ঢাল বেয়ে তারপরও অনেক সৈন্য নিচে আসতে সক্ষম হয় কেবল ডসের কারণে। সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একের পর এক আহত সৈন্যের কাছে ছুটে যায় মেডিক্যাল সেবা নিয়ে। পরিচিত অনেকের পাশাপাশি সার্জেন্ট হাওয়েলকেও সে প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করে। তার অসীম সেবাপরায়ণতা, সাহস ও কর্মতৎপরতায় মুগ্ধ হয়ে বাহিনীর ক্যাপ্টেন গ্লোভারও মানতে বাধ্য হন যে, ডস সত্যিকার অর্থেই এক অসম সাহসী বীর। অথচ এই গ্লোভারই এক সময় ডসকে ভুল বুঝেছিলেন, নির্বীর্য ও কাপুরুষ ভেবে।
জাপানিদের ক্রমাগত গ্রেনেড, শেল ও বুলেট বৃষ্টির মাঝেই ডস চালিয়ে যায় তার রক্ষাকার্য। এভাবেই নিজে আহত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ জন সেনার জীবন রক্ষা করে সে। একের পর এক আহত যোদ্ধাকে নিজের পিঠে তুলে রিজের খাড়া ঢাল দিয়ে রশি বেঁধে, নিচে নামিয়ে দেয়ার প্রায় অসম্ভব কাজটি সম্পাদন করে এক অমর কীর্তি স্থাপন করে ডেসমন্ড ডস।
মুভির শেষ দৃশ্যে মার্কিন সৈন্যদের পাল্টা আক্রমণ দেখানো হয়। জাপানিরা এই দফায় সমূলে বিধ্বস্ত হয়। আর আহত ডেসমন্ড ডস সমস্ত মার্কিন সেনাদের কাছ থেকে লাভ করে বিপুল সম্মান ও শ্রদ্ধা। শেষদিকের কিছু ফটো আর লেখা দিয়ে বোঝানো হয়–যুদ্ধে অপরিসীম কৃতিত্বের জন্য ডসকে ‘মেডাল অব অনার’ প্রদান করেন প্রেসিডেন্ট হ্যারি.এস.ট্রুম্যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধশেষে ডস আর ডরোথির বিয়েটা হয় ভালোভাবেই। ১৯৯১ সালে, ডরোথির মৃত্যু অবধি টিকে থাকে তাদের দাম্পত্য জীবন। আর সেবা ও মানবতায় লিজেন্ড হয়ে ওঠা ডেসমন্ড ডস ইহলোক ত্যাগ করেন–২০০৬ সালের ২৩শে মার্চ।
মুভির তাৎপর্যপূর্ণ কিছু দিক :
১) ডিরেক্টর হিসেবে মেল গিবসন তাঁর অনবদ্য পারদর্শীতা– আরো একবার প্রমাণ করেছেন এই ছবিতে। তাঁর ‘ব্রেইভ হার্ট’, ‘প্যাশন অব ক্রাইস্ট’ কিংবা ‘অ্যাপোক্যালিপ্টো’–যারা দেখেছেন, তাদের কাছে মেল গিবসনের ডিরেকটরিয়াল ক্যারিশমা–নতুন কিছু নয়। দীর্ঘ ১৬ বছর প্রিপারেশন নিয়ে তারপর এই মুভি বানানো হয়েছে। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন ডিরেক্টর কতোটা পরিশ্রম ও সততার পরিচয় দিয়েছেন এটা বানাতে।
২) ডেসমন্ড ডস এর চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন অ্যান্ড্রু গারফিল্ড। কিছুটা লাজুক, ইন্ট্রোভার্ট এবং একই সাথে ধর্মপরায়ণ একটা ছেলে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে এতোটা সাহসের পরিচয় দিতে পারবে–তা আগে থেকে বুঝে ওঠা কঠিন। ডরোথি চরিত্রে টেরেসা পামার ছিলেন অনবদ্য। তার সাথে ইনোসেন্ট প্রেমের রসায়নটা ভালোভাবেই সামলেছেন গারফিল্ড। এছাড়া অন্যসব কো অ্যাক্টরা সবাই নিজের জায়গায় অসাধারণ ছিলেন। পারফেক্ট কাস্ট বলতে যা বোঝায়–তা ‘হ্যাকশ রিজ’ এ সেটাই দেখতে পাবেন।
৩) সেভিং প্রাইভেট রায়ান, শিন্ডলার্স লিস্ট, দা পিয়ানিস্ট প্রভৃতি ধ্রুপদী ওয়ার মুভির পাশাপাশি থাকার যোগ্যতা রয়েছে হ্যাকশ রিজের।
৪) মুভি মেকিংয়ে অতিরিক্ত ফ্যান্টাসির আশ্রয় নেয়া কিংবা আধুনিক ভিএফএক্সের কারিকুরী দেখানো হয়নি। সেই সময়কে প্রতিবিম্বিত করার জন্য বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহ ছিল পুরো টিম। আধুনিক প্রযুক্তি সহকারেও যে পরিমিতিবোধ দেখানো হয়েছে–সেটা আলাদাভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
৫) যুদ্ধ নিয়ে তৈরী করা সত্ত্বেও এই মুভিটির থিম কিন্তু ‘অ্যান্টি ওয়ার’ তথা শান্তি। মেল গিবসন ব্যক্তিজীবনে একজন আন্তরিক ক্রিস্টিয়ান। তাঁর নিজের মনোভাব ও মতাদর্শ থেকেই হয়তো ডেসমন্ড ডস এর মত লিজেন্ডারি ক্যারেক্টার বেছে নিয়েছিলেন হ্যাকশ রিজ নির্মার্ণের জন্য।
৬) স্ক্রিন প্লে বা সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে বেশি কিছু বলবার নেই। গিবসনের অন্যান্য ওয়ার মুভির অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে, সাউন্ড ডিজাইন করেছেন শব্দ প্রকৌশলী। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ছিল হৃদয়স্পর্শী।
৭) সব মিলিয়ে ৫ ক্যাটাগরিতে অস্কার নমিনেশন পায় মুভিটি। সেরা এডিটিং ও সাউন্ড মিক্সের জন্য দুই ক্যাটাগরিতে পুরস্কার নিজের করে নেয় হ্যাকশ রিজ।
৮) মুভির হিস্টোরিক্যাল অ্যাকুরিসির ঠিক রাখার জন্য পুরো টিম যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। যেকারণে ছবির বস্তুনিষ্ঠতা আপনাকে অনায়াসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্পে প্রবেশ করিয়ে ছাড়বে।
৯) দর্শকদের পাশাপাশি সমালোচকদেরও মন জয় করেছে এই ছবি। ৪০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত মুভিটি বক্স অফিসে আয় করেছে ১৮০.৪ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে রটেন টম্যাটোস ৭.৬ দিয়েছে আউট অব টেনে। আর মেটাক্রিটিক তাদের ১০০ রিভিউ থেকে এভারেজ ৭১ নম্বর দিয়েছে হ্যাকশ রিজকে ।
১০) আইএমডিবি র‌্যাংকিং : ৮.১ পার্সোনাল রেটিং ৯.২। যদি এখনো না দেখে থাকেন, তাহলে করোনা কালের অবকাশে দেখে ফেলুন এই মাস্ট ওয়াচ মুভিটি।

লেখকঃআরেফিন আল ইমরান, কলামিস্ট এবং সঙ্গীত পরিচালক
মিরপুর, ২৭-০৪-২০২০

আরও পড়ুন