শূণ্যতা

আফসানা শারমিন

মেহেরু আর সামান্তা ড্রইং রুমে মাফরুহার জন্য অপেক্ষা করছে, ওরা প্লান করছে এবারের ছুটিটা কি করে কাটানো যায় ।

আমার ইচ্ছে গ্রামের বাড়ি যাওয়া ,মারুফের কথা খুব মনে পড়ছে আর চাচাতো বোনের বিয়েতে যেতে হবে,ওদের ইচ্ছে সিলেটে যাওয়া ।

আমি রোহান আহমেদ ,ওদের ভাবী মাফরুহা মানে আমার স্ত্রী ই ওদের শেষ ভরসা, 

ভাবী যা বলবে তাই এখন ফাইনাল ডিসিশন ।

মাফরুহা আসতেই দু বোন দু পাশে বসে জোর করে বলছে, চল না ভাবী সিলেট যাই, এই বৃষ্টির দিনে সিলেটে ঘুরতে ভালো লাগবে। মাফরুহা ওদের হাত দিয়ে গালে আদর করে বলল,শোন আমার আদরের বোনেরা এবার তোমাদের আবদার আমি রাখতে পারছি না, সিলেট বেশ কয়েক বার যাওয়া হয়েছে এবার না হয় চলো বাড়ি ঘুরে আসি ।

সামান্তা বলল,তারপরও ভাবী অনেক দিন পর একসাথে বাইরে কোথাও ঘুরতে যাই না,প্লিজ চলো।মাফরুহা ওদের কাছ থেকে ওঠে এসে আমার কাছে বসল আর আমার হাত ধরে বলল,এবার তোমাদের ভাইয়ার কথা মতো আমরা ছুটি টা পালন করবো।আমি ওদেরকে বলি দেখছো ,এবার তোমাদের ভাবীও আমার দলে,এরা আর যায় কই …

ওরা দুজন আমাদের দুজনের দু পাশে বসে বলল ,ওকে এবার বাড়ি যাবো, কি বলবো বাড়ি গেলে মারুফের স্মৃতি এসে বারেবারে কাঁদায়, তবে সামনের ছুটি টাতে আমরা ঠিক করবো কোথায় যাবো।মারুফের কথা শুনতেই মাফরুহার মুখটা কালো হয়ে যায় ।

ওমা,চেয়ে দেখি আমার মেয়ে রোহা ঘুম ঘুম চোখে ছোট কোলবালিশ হাতে নিয়ে চোখ ঢলতে ঢলতে বলছে,আমাকে রেখে কোথায় যাও আব্বু ? 

মেহেরু হেসে বলল,রোহা তোমার দাদা বাড়ি যাবো ,তুমি যাবে তোমার মারুফ ভাইয়ার কাছে?

হুম,যাবো ছোট্ট ফুফি বলে ,মায়ের কোলে ওঠলো।

আচ্ছা, ঠিক আছে….এবার সবাই ঘুমাতে যাও।

****

রোহা কে বুকে নিয়ে মাফরুহা ঘুমোচ্ছে, পাশে আমি সজাগ শুয়ে আছি, কেন জানি আজ ঘুম ধরছে না।মাফরুহা ইচ্ছে করলে ওর বাবার বাসায় বা অন্য কোন জায়গায় ঘুরতে যেতে বলতে পারতো,আমিও না করতাম না।একটা সময় গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া মানে আমার কাছে অনেক কিছু ছিলো।কিন্তু আমার ছেলের মারুফের অকালমৃত্যু তে গ্রামের কথা মনে হলে বুকের ভেতর ব্যথায় হু হু করে ওঠে। 

এমনি এক ছুটিতে সবাই মিলে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম, মারুফের বয়স তখন ছয় বছর । সে ও আমার মত গ্রাম পাগল, গ্রামের মানুষের সাথে সহজেই ও মিশে যায়, আর ওর মিষ্টি মিষ্টি কথায় সবাই ওকে পছন্দ করে।

বর্ষার জল চারদিকে থৈ থৈ করছে ,আমাদের বাড়িটা পাড়ার মধ্যে পাড়াটা অনেকটা ছোটখাটো টিলার মতো, চারদিকে বর্ষার পানিতে দ্বীপের মতো লাগে। গ্রামের পাশ দিয়ে মেঘনা নদীর একটা শাখা নদী গেছে ,ছোট নৌকা, কলা গাছের ভেলা, তালগাছের তৈরি কোন্দা ছাড়া এক পাড়া থেকে অন্য পাড়াতে যাওয়া যায় না। 

বড়ো, ছেলে সবাই বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে মাছ ধরে , বাচ্চা ছেলেমেয়েরা পানির কাছে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখে। বিকেলের দিকে আমি সবাইকে নিয়ে নৌকা করে ঘুরতে যাই। মারুফ আমাকে বলে – আব্বু আমরা দাদা বাড়ি রয়ে যাই ,দেখো সবাই কত আনন্দ করছে , মাছ ধরছে, পানিতে গোসল করছে ,আমার খুব ভালো লাগছে ।

আমি ওকে আদর করে জরিয়ে ধরে, আমার ছোটবেলার মজার মজার সব গল্প বলি।

মারুফ অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে আর পানির দিকে তাকিয়ে হাসে।

অনেক শাপলা আর শালুক তুলে মারুফের হাতে দেই , ও খুশি হয়ে বলে, আব্বু একটা গান গাও না, আমি গান করি 

” এই পদ্মা এই মেঘনা 

এই যমুনা সুরমা নদী তটে 

আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায় 

এ আমার দেশ, এ আমার প্রম 

আনন্দ বেদনায়, মিলন বিরহ সংকটে,

কত আনন্দ বেদনায়, মিলন বিরহ সংকটে……”

একটা কাজে আমি আর আমার আব্বু মিলে গ্রামের বাজারে যাই, আমার চাচাতো ভাই জয়নালের নৌকা আছে, যখন তখন সবাই নৌকা করে ঘুরতে চলে যায়। মাফরুহা সব সময়ই মারুফ কে চোখচোখ করে রাখছে, আশে পাশের বাচ্চাদের সাথে তার ভালোই ভাব হয়েছে, খেলছে মজা করে, কখনো কখনো নৌকা করে ঘুরতে যাওয়ার বায়না করছে।মাফরুহা ওকে ধমক দিয়ে আটকে রাখে, আদর করে বলে আমার মারুফ তো ভালো ছেলে, সবসময় ঘুরতে যেতে নেই , মারুফ বাবা তুমি তো সাঁতার জানো না , তোমার বাবার সাথে ঘুরতে যেও ।মারুফ মায়ের কথা মেনে নেয়, মা কে জিজ্ঞাসা করে আব্বু কখন আসবে ?

মাফরুহা উত্তর দেয়, এই বাবা কতক্ষণ পরেই চলে আসবে।

জয়নাল বৈঠা ধরে বসে আছে, সব বাচ্চাদের এক করে নৌকায় ওঠতে বলছে , সব বাচ্ছারা হৈচৈ করে নৌকায় ওঠছে, মারুফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ।

মারুফ কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জয়নাল বলে , কি ভাতিজা যাবা না ঘুরতে, দাঁড়িয়ে আছো কেন ?

– না ,চাচ্চু । আমি আব্বু র সাথে যাবো। 

– মিয়া ভাইয়ের লগে যাওন লাগবো?

আ হো আমাগোর লগে ।

– না, চাচ্চু। ওরা যাক , আম্মু জানলে বকা দিবে।আমি তো সাঁতার জানি না, তাই আম্মু বলছে আব্বুর সাথে যেতে।

– কি কও ভাতিজা ! আরে ভাবী বকবে না । আইয়া পরো আমাগো লগে ,বকলে আমি বুঝাইয়া কমুনে ।

এই বলে , এগিয়ে এসে মারুফকে জয়নাল নৌকাতে করে নিয়ে যায় ।

জয়নাল গান ধরে, 

” ও নদী রে …

একটি কথা 

শুধাই শুধু তোমারে,

বলো,কোথায় তোমার দেশ ?

তোমার নেই কি চলার শেষ ?

ও নদী রে …………”

মারুফ মন দিয়ে জয়নালের গান শোনে।

অনেকক্ষণ ধরে মারুফের কোন সাড়া না শোনে মাফরুহা মারুফের খোঁজ করে,কেন জানি তার মনটা উতলা লাগছে।

কথায় আছে, সন্তানের কিছু হলে মায়ের মন নাকি আগে আচ্ করতে পারে।

মেহেরু আর সামান্তা কে বলল, মারুফের খোঁজ করতে ।

ওরা বাড়ি থেকে বের হয়ে কয়েক জনের কাছে জানলো , জয়নালের নৌকায় মারুফ ঘুরতে গেছে। পানির কাছে গিয়ে দেখে নৌকা অনেক দুরে চলে গেছে ।বাড়িতে এসে মাফরুহা কে বলে এসব কথা। মাফরুহা রোহান কে ফোন করে বলে যে , তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসতে ,মারুফ নৌকা করে ঘুরতে গেছে। 

***

মারুফ চুপচাপ নৌকা য় বসে আছে, এমনিতে নৌকা করে ঘুরতে ওর ভালো লাগে কিন্তু আব্বু আম্মু ছাড়া এখন খানিক টা ভয় আর মন খারাপ লাগছে।জয়নাল সব বাচ্চাদের ধমক দেয়,সব চুপ কর, শান্ত হয়ে বও সবাই, নদীর স্রোত আজকে একটু বেশি মনে হচ্ছে, আর দুরে না গিয়ে ফিরতি পথ ধরে গ্রামের কাছাকাছি আসতেই বাচ্চারা আবার হইহল্লা শুরু করে , হঠাৎ একজনের ধাক্কায় মারুফ পানিতে পড়ে যায় । জয়নাল চিৎকার করে ওঠে হায়,হায় এইডা কি অইলো !! আশে পাশের মানুষদের ডাকাডাকি শুরু করে সবাই পানিতে নেমে মারুফ কে খুঁজতে থাকে।

এদিকে দূর থেকে রোহান মানুষের চিল্লা চিল্লি শুনে তাড়াতাড়ি বাড়ির কাছে আসে ,শুনে নৌকা থেকে মারুফ পড়ে গেছে ।পানিতে ঝাঁপ দিয়ে ছেলেকে খুঁজতে থাকে।

দুই ঘন্টা খোঁজার পর একজন মারুফ কে একদম পানির তলায় মাটি তে বসা অবস্থায় খুঁজে পায়, সেখান থেকে তুলে নিয়ে আসে।

মাথায় নিয়ে কয়েক বার ঘোরানো হয়েছিল কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে মারুফের সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে সাদা হয়ে গেছে।

রোহান মারুফ কে পাতাল কোলে নিয়ে বাড়িতে আসে পিছে পিছে সব মানুষ ।মাফরুহা মারুফের পানিতে পড়ার খবর শুনে মারুফকে ডেকে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

বাড়ির সবাই কান্নাকাটি শুরু করে, মাফরুহার জ্ঞান ফিরলেই মারুফকে দেখতে চায়।ওর শরীরের সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে ও হাঁটতে পারছে না, কয়েক জন ওকে ধরে বাইরে উঠোন আনে, বড় উঠোনে এক চৌকিতে মারুফ কে শুয়ে রাখা হয়েছে ,মাফরুহা কাছে যেতে চেষ্টা করে, চিৎকার করে বলে আমার মারুফকে আমার কাছে এনে দাও,আবার অজ্ঞান হয়ে যায় ।

রোহান পাগলের মতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, বারবার মারুফ কে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। মাফরুহা হামাগুড়ি দিয়ে মারফের কাছে আসে, মারুফকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খায়, বলে – বাবা আমার ঘুমিয়ে পড়ছো কেন !! ?

নৌকা করে ঘুরতে যাবে না ? দেখো ,তোমার আব্বু চলে এসেছেন, ওঠো মারুফ, ওঠো ।

আমার মারুফ কথা বলছে না কেন!!?

মারুফ কথা বলো, কলিজার টুকরো বাবা আমার কথা বলো ।

মারুফকে কোলে নিতে চেষ্টা করে কিন্তু সারা শরীর অবশ হয়ে পড়ায় তা আর পাড়ে না, মারুফের ঠান্ডা নিথর দেহ ওর হাতের মাঝখান দিয়ে খসে পড়ে, আবার তুলতে চেষ্টা করে…..।

রোহান মাফরুহাকে জরিয়ে ধরে, মাফরুহা রোহানের শার্ট খামচে ধরে বলে,আমার মারুফ কথা বলছে না কেন? কি হয়েছে আমার মারুফের,কথা বলেন…বলে আবার অজ্ঞান হয়ে যায় ।

রোহনের বাবার মাথায় পানি ঢালা হয়, উনিও নাতি শোকে অজ্ঞান হয়ে যান।রোহান কতক্ষণ জুড়ে জুড়ে চিৎকার করে দেয়ালে পিঠ রেখে পাথরের মত পড়ে থাকে ।

খবর পেয়ে মাফরুহার পরিবারসহ সব আত্মীয় স্বজনরা আসে। 

মারুফের কাফন শেষে আবার মারুফের লাশ বাড়িতে আনা হয়, শেষ বারের মত দেখার জন্য ।

মাফরুহা মারুফের লাশের খাটিয়ার কাছে বসে মারুফকে আদর করে দেয়, সবাইকে বলে ,দেখো আমার ছেলে মারুফকে দেখতে কত সুন্দর লাগছে ,একেবারে রাজপুত্র ‘ মারুফ রাজ ‘। মারুফের কপালে, গালে ,চোখে, নাকে, ঠোঁটে হাত দিয়ে চুমু খায়। যখন মারুফের লাশের খাটিয়া তুলে নেওয়ার জন্য সবাই আসে, মাফরুহা কান্না করে বলে, আমার মারুফকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, মারুফ অন্ধকারে একলা থাকতে ভয় পায় ।ওর শ্বাশুরী আর মা ওকে ধরে রাখে। মাফরুহার বাবা ওকে বলে ,মাগো তোমার ছেলেকে আল্লাহ্ তায়ালার কাছে রেখে আসতে যাচ্ছি, ও যে তোমার কাছে আল্লাহ্ তায়ালার মেহমান।তুমি অনুমতি দাও মা , মাফরুহা ।

মাফরুহা বলে ওঠে, না না ।আমার মারুফ কোথায় যাবে না, ও আমার কাছে থাকবে , আমার বুকে ঘুমোবে ।মারুফ, তোমার বাবাকে বলো তোমাকে কোথায় না নিতে …..মারুফ …বলে অজ্ঞান হয়ে যায় ।

মাফরুহার এ অবস্থা দেখে আশেপাশের সবাই হু হু করে কেঁদে ওঠে ।

জানাজা শেষে বাড়ির কাছেই কবরস্থানে মারুফকে দাফন করা হয় ।

পরদিন সকালে মাফরুহাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, অনেক খুঁজে অবশেষে কবরস্থানে ওর দেখা মিলে।

মারুফের কবরের কাছে বসে আছে, কবরের মাটি ধরে কান্নাকাটি করে, মাটি খামছিয়ে মারুফ কে বের করার চেষ্টা করে ।সবাই ওকে ধরে আনতে চেষ্টা করে ও সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়াতে চায় আর মারুফ, মারুফ বলে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

বাড়িতে দু তিন দিন থেকে সবাইকে নিয়ে আবার ঢাকা ফিরে আসি , শুধু আমার ছেলে মারুফ , ওর প্রিয় গ্রামের মাটিতে ঘুমিয়ে থাকে। মারুফের কথা মনে হলেই আমার বুকের ভেতর দুমরেমুচরে ঝড় ওঠে ,মনে হয় ছুটে গিয়ে মারুফকে আমার কাছে নিয়ে আসি। 

মাফরুহা মারুফকে হারিয়ে বেশ কিছুদিন পাগলের মতো পাগলামি করে, রাত জেগে থাকে ।মারুফের পরনের কাপড় জুতো , বই খাতা, সব খেলনা নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে, ঘুমের মধ্যে সজাগ হয়ে মারুফ, মারুফ বলে চিৎকার করে দরজায় ছুটে চলে যায়, চিৎকার করে বলে আমার মারুফ চলে এসেছে,বলছি না আমার মারুফ ভালো ছেলে ,মায়ের কথা শুনে, মাকে রেখে কোথাও যাবে না, মারুফ আয় বাবা আয়, কতদিন তোমাকে আদর করি না…বলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায় আবার কয়েক ধাপ নেমে কি মনে করে আবার ঘরে চলে আসে।আশেপাশে মারুফের বয়সী বাচ্চাদের আদর করে, কারোর সাথে মারুফের কোন মিল খুঁজে পেলে , বারবার তার কথা বলতে থাকে ।

রোহার জন্মের পর মাফরুহা স্বাভাবিক ভাবেই চলতে থাকে । মারুফের সব কিছু এখনো আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছে ।

***

জয়নালের ছোট বোন রাবেয়ার বিয়ে, চাচা চাচি বার বার বলেছে যেতে, দুপুরে শেষ দিকটায় আমরা বাড়িতে যাই। সন্ধ্যার পরে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়, গ্রামের হলুদ অনুষ্ঠান আর বিয়ে এ এক অন্য রকম অনুভূতি ।

মাফরুহা রোহাকে সুন্দর করে সাজিয়ে সামান্তা আর মেহেরুকে নিয়ে চাচার বাড়িতে যায়, আমার আব্বু আম্মু দু দিন আগে বাড়ি চলে আসে।

রাবেয়াকে ঘিরে বসে সব বোন ভাবীরা ,আশেপাশে মা চাচিরা ,সবাই হলুদের গান গাইতে থাকে আর এক এক করে ওর গায়ে হলুদ দিয়ে আসে। এবার মাফরুহার পালা বাটি থেকে হলুদ নিয়ে রাবেয়ার গালে লাগাতে গেলে ,চাচি ওর হাত ধরে আটকায়, মাফরুহা অবাক হয়ে চাচির দিকে তাকায়।

চাচি চোখ কটমটিয়ে মাফরুহাকে রাবেয়ার কাছ থেকে সড়ায়ে নিয়ে আসে , আম্মু তা দেখে মাফরুহার কাছে যায়।

চাচি মাফরুহাকে বলে, তুমি এখন বাড়ির বড় ছেলের বউ ঠিকই আছে , কিন্তু তুমি তো অপয়া।

চাচির মুখে এ কথা শুনে আম্মু আর মাফরুহা দুজনই অবাক হয়ে গেলো।

আম্মু চাচি কে বলল,কি বলেন এসব ভাবী?

মাফরুহা অপয়া হলো কি করে?চাচি আম্মুকে বলে, মাফরুহার বড় ছেলে মারা গেছে তাই সে অপয়া, অপয়া মাইয়া গো কোন শুভ কাজে হাত দেওন নাই, তোমারা এসব না মানবার পারো, কিন্তু আমরা গ্রামের মানুষের সব নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয় ।আম্মু চিৎকার করে বলল, কি সব বলছেন ভাবী, এসব তো কুসংস্কার ….

এই যুগে মানুষ এসব মানে ?

আর মাফরুহা ছেলে মারা গেছে বলে সে অপয়া হয় কি করে ?

মারুফ তো ওর সন্তান ।আপনি তো ভালো করে দেখছেন ই , ছেলের মৃত্যু তে বউ টা আমার কেমন পাগল হয়ে গেছিলো ।মাফরুহা মুখ কালো করে কেঁদে ফেলল,আম্মু আর চাচির কথা কাটাকাটি তে সবাই চুপ হয়ে গেলো ,বাড়ির ভেতর থেকে গোলমাল শুনে গিয়ে দেখি এ ঘটনা ।

মেহেরু আমার কাছে এসে সব বলছে….

মুরুব্বিরা কয়েক জন চাচিকে কথা বলে বোঝাতে লাগলো, কিন্তু চাচি মানতে রাজী না ।

আমি রাগ করে মাফরুহাকে নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে আসি ,আব্বু ও রাগ করেছেন ।

আমি বুঝি না এ যুগে ও এসে মানুষ কি সব কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতি পালন করে । অন্য সময় চাচি ই মাফরুহাকে নিয়ে গর্ব করতো যে , এত শিক্ষিতা হয়ে ও শ্বশুর শ্বাশুড়ি, আত্মীয় স্বজনের প্রতি ওর কর্তব্য পালন দেখে মুগ্ধ হতো।

আর আজকে তিনিই মাফরুহাকে অপয়া বলছেন, গত সপ্তাহে রাবেয়া তো ঢাকা গিয়ে মাফরুহাকে সাথে নিয়ে ওর বিয়ের সব কিছু কিনছে।

মাফরুহা আমার কাছে আল্লাহ্ তায়ালার এক অশেষ নেয়ামত ,শুধু নেয়ামত ই না একজন ভালো স্ত্রী আর মনের মতো বন্ধু ।মাফরুহার সাথে পরিচয় আমার কলেজ লাইফ থেকে বলতে গেলে আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় মাফরুহা ।আমি তখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি ।

আমারা চার তলায় থাকি ,তিন তলায় মাফরুহারা নতুন আসে।ওরা দু ভাই এক বোন,মাফরুহা ,শাহেদ আর সাহিল। মাফরুহা ইন্টার ফাস্ট ইয়ার ,সাহিল সেভেনে আর শাহেদ ফোরে । ওর বাবা সরকারী চাকুরি করেন,মা গৃহিনী ।

আমার দু বোন মেহেরু আর সামান্তা আর আমি রোহান আহমেদ। আমিই বড়, বাবা ব্যাংকের ম্যানেজার, আমার মা গৃহিনী, আর তখন দাদী ও আমাদের সাথে থাকতো।

আমার মা আবার মিশুক প্রকৃতির মানুষ, ওদের পরিবারের সাথে অল্প ক দিনেই আত্মীয়তার সম্পর্কের মতো হয়ে যায়।ওর আম্মু আসে আমাদের বাসায়।ছুটির দিনে ওর আব্বু আর আমার আব্বু দেখি পত্রিকা খবরাখবর নিয়ে ভালো গল্প করেন।মেহেরু আর সামান্তা মাফরুহা আপু বলতে পাগল।কোন পড়া বুঝছে না, কিভাবে পড়বে, কি করে স্কুলের ফাংশনের কবিতা আবৃত্তি করবে বা ইংলিশে কোন বক্তব্য দিবে কেমন করে করবে ছুটে যায় মাফরুহার কাছে আর মাফরুহা সুন্দর করে বলে দেয়।ওরা বাসায় এসে আমাকে বলে ভাইয়া তুমি কিছু ই পারো না, জানো মাফরুহা আপু সব পারে , কবিতা আবৃত্তি, গান, উপস্থাপনা সব…,তোমার কলেজেই তো পড়ে ,খুব ভালো ছাত্রী ।

আম্মুও এসে একই কথা ,তুমি তো বসে বসে খালি খাও আর ঘুমাও,লেখাপড়া ও ঠিক মতো করো না, দেখ গিয়ে মাফরুহাকে কত কি করছে মেয়ে টা।আবার কি সুন্দর নামাজ কালাম পড়ে আর পর্দাও করে ।তুমি বদমাইশের হাড্ডি ,সপ্তাহে একদিন আল্লাহ্ তায়ালার নাম নেও তা ও আমি ঠেলতে ঠেলতে জুমার নামাজে পাঠাতে হয় ।আমি আর যাই কই,অবশ্য আম্মু ঠিকই বলে, ভালো ছাত্র না বলে আব্বুর ইচ্ছে মতো কর্মাস নিয়ে পড়ছি।ক্লাস ও ঠিক মতো করি না পড়ি কম,আবার ফেল ও যে করি তা না, এই কোন মতনে পাস। সব বই কিনে দিছে মাসে মাসে টিউশনির স্যারের বেতনও দিয়ে যাচ্ছে, স্যার ভালো পড়ায় ,আমিই পড়ি না।আগে এমন ছিলাম না, স্কুলে থাকতে আব্বুর মতো ভালো ব্যাংকার হবো বলে ভালো করে পড়েছি, কিন্তু রেজাল্ট প্লাস আসে নি এ আসছে ।তার পর থেকে আর ভালো করে পড়ি না,ফাঁকিবাজি করি।

বাইরে বন্ধুদের সাথে ঘুরি ,পিছনের সারির কিছু বন্ধুদের সাথে চলি , সময় কাটানোর জন্য ওদের সাথে থাকতাম ।

ভালো ছাত্রদের সাথে থাকতে চেষ্টা করেছি, ওরা খালি পড়া পড়া করে আমার এটা ভালো লাগে না । কদিন ধরে নতুন করে সিগারেট খাওয়া শিখেছি,বাইরে খাই মাঝে মাঝে ।

বাসায় এসব কেউ পছন্দ করে না , আমার পরিবার শিক্ষিত আপটুডেট হলেও এদিকে বেশ কড়া নিয়ম।আম্মু কয়েক বার চেষ্টা করেছে ধরতে আমি অনেক কষ্টে ধরা পরার হাত থেকে বেঁচেছি।যদি ও আমি মাফরুহা কে কখনো দেখেনি তবুও মাফরুহা নামক প্যারা নিয়ে দিন ভালো ই কাটছিলো।

এক রবিবার আমার সিটি পরীক্ষা ছিলো বাংলা বিষয়ে ব্যকরণ অংশ থেকে , সিটিতে পাস না করতে পারলে আবার সেমিস্টার পরীক্ষাতেও ফেল আসবে ,কি আর করা, আগের দিন রাতে পড়তে বসছি, ওমা! দেখি আমার বই দাগানো,বিভিন্ন বোর্ডের সংকেত লেখা ,আবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন গুলো লাল কালি দিয়ে মার্ক করা। ভীষণ রাগ উঠলো, আমি বই পড়ি কম কিন্তু বইয়ে কলম দিয়ে মার্ক করি না, এটা খুব অপছন্দ আমার ।কয়েক পৃষ্ঠা উল্টাইয়া দেখি একটা চিরকুট লেখা ।ছোট ছোট করে লেখা …

রোহান ভাইয়া, 

প্রথমে ই স্যরি বলে নিচ্ছি, আপনার অনুমতি ছাড়াই বইয়ে মার্ক করার জন্য ।আমার কাছে এই রাইটারের বইটা নাই সিটি পরীক্ষা ছিলো,তাই আন্টিকে বলে মেহেরুকে দিয়ে আপনার বইটা আনিয়ে পড়েছি, পড়তে পড়তে কখন যে নিজের বই ভেবে কলম দিয়ে মার্ক করেছি ,খেয়াল ছিলো না এটা আপনার বই।দয়া করে মাফ করবেন আর এমন টা হবে না ।

ইতি 

মাফরুহা নাজাত 

চিরকুট হাতে নিয়ে ভাবছি, তোমাকে কি করে মাফ করবো মাফরুহা ? তুমি তো আমার নতুন এক যন্ত্রণা আবার বইয়ে লিখছো তোমার একটা শিক্ষা দিতে হবে ।রাগে দাঁড়াতে গিয়ে ও বসে পড়লাম না এখন রাগ করা চলবে না পড়া শেষ করতে হবে ।কালকে কলেজ থেকে এসে দেখা যাবে।

মার্ক করা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন গুলো পড়ে গিয়ে পরীক্ষা দিলাম। এই একমাত্র এই সিটি পরীক্ষায় আমি সব প্রশ্ন আনসার করছি ,মাফরুহা বইয়ে মার্ক করে রাখাতে সহজেই সব পড়তে পেরেছি। আবার চিরকুট লিখে মাফ চেয়ে নিয়েছে।

নাহ্, রাগ না ,একটা ধন্যবাদ পাওনা মেয়েটা ,কিন্তু ওকে কোনদিন দেখেই নি ,শুধু নাম শুনেছি । ওকে দেখার ইচ্ছে হলো,কিভাবে দেখবো ধন্যবাদ দিবো ,আমি যখন বাসায় থাকি না ও নাকি মাঝে মাঝে তখন আমাদের বাসায় আসে। সাহিলকে কয়েকবার দেখেছি ,মাফরুহা বাইরে বেশি বের হয় না হলেও নাকি বোরকা পরে বের হয়।

***

ওই সপ্তাহের শুক্রবার সকালে ছাদে বসে সিগারেট খাওয়া মাত্র শুরু করেছি, ছাদ টাই নিরাপদ তেমন কেউ আসে না, তার টাঙানো আছে কয়েক টা মাঝে মাঝে কেউ কাপড় শুকাতে দেয়। হঠাৎ পিছনেকে যেন বলে উঠল মাফরুহা আপু দেখো ছাদে রোহান ভাইয়া সিগারেট খাচ্ছে, পিছনে তাকিয়ে দেখি দরজার সামনে এক বালতি কাপড় রাখা আর ভিতরে সিঁড়ি র মাথায় দাঁড়িয়ে একটা বোরকা পরা মেয়ে, এই তাহলে মাফরুহা …..!!! !

আমি লজ্জায় পড়ে যায়, হাতে সিগারেট নিয়ে ই দৌড়ে নিচে নামতেই দেখি আমাদের ঘরের সামনে আব্বু দাঁড়িয়ে আছে , প্রবাদ আছে,

“যেখানে বাঘের ভয় 

সেখানে রাত হয় “..

আব্বু আমার দিকে তাকিয়ে বলল,তোমার হাতে কি?

আমি কিছু বলার আগেই আব্বু আমার শার্টের কলার ধরে টেনে ঘরে নিয়ে গেল।আব্বু বকাঝকা করে ,কিছু উপদেশ মূলক কথা বলল।

এ ঘটনার পরে আমি আর কোনদিন সিগারেট খাই নি আর ও সব বন্ধু বান্ধবদের সাথে ও চলা বন্ধ করে দিয়েছি। আমার কাছে বারবার মনে হতো,মাফরুহার করুন দুটো চোখ আমাকে বলছে ,”রোহান তুমি সিগারেট খাচ্ছো…….”

এটা ভাবতেই আমার খারাপ লাগতো ,তারপরই নিজেকে বদলাতে শুরু করি,আর পড়াশোনায় মনোযোগ দিই।

মাফরুহার মার্ক করা বাংলা বইয়ের মতো সব বই আমি মার্ক করে পড়েছি,এতে গুরুত্বপূর্ণ পড়া খুব সহজেই পাওয়া ও শেখা যায় ।ইন্টারে ভালো রেজাল্ট করি আর ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পাই ।

তখনো আমার মাফরুহা কে ধন্যবাদ বলা হয়নি।চিন্তা করছি,কি করে ধন্যবাদ জানানো যায়, লিখে ফেললাম একটা চিরকুট, লেখলাম ঠিক কিন্তু দিবো কি করে ?

কিছুক্ষন পরে শুনছি , সামান্তা আম্মুকে বলছে , মাফরুহা আপুর গানের ডাইরি টা দিয়েই কোচিং যাবে । আরে এতো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি …..

আমি চিরকুটটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হই, দেখি সামান্তা ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে ও আবার ওর ব্যাগ আর হাতের ডাইরি টা সোফাতে রেখে আম্মুর কাছে গেলো,মনে হয় টাকা নিতে ,এই ফাঁকে আমি ডাইরি খুলে দেখি মাফরুহার নাম লেখা আর আমিও চিরকুট টা ডাইরিতে রেখে চুপি চুপি আমার রুমে কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। সামান্তা আবার ডাইরি আর ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলো।যাক ,অনেক চেষ্টার পরে ধন্যবাদ জানানো গেলো, এখন মাফরুহা পেলেই হয়। মাফরুহা সামান্তার দেয়া ডাইরি না খুলেই ওর টেবিলে রেখে দেয় ।

***

এদিকে আবার মাফরুহারা বাসা ছেড়ে ওর কলেজের কাছাকাছি অন্য এলাকায় চলে যায় ।এর বেশ অনেক দিন পর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কলেজে আবৃত্তি করার জন্য ডাইরি টা বের করে ।বেশ কয়েক পাতা উল্টাতেই দেখে একটা চিরকুট। তাতে লেখা, 

প্রিয় মাফরুহা , 

আশা করি ভালো আছো, আমি কি বলে যে শুরু করবো বুঝতে পারছি না।কারণ তোমার সাথে আমার সরাসরি কখনো কথা হয় নি , প্রথম তোমার চিরকুট পেয়ে খুব রাগ হয়েছিলাম, পরে দেখি বইয়ে মার্ক করে রাখাতে সহজেই সব পড়তে পাড়া যায়, আমি সব বই এখন ওভাবেই পড়ি।এর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাবো ভাবছিলাম, সত্যি বলতে কি …

আমি একটা সময় বড় হবার সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখতাম এস এস সিতে আশানুযায়ী রেজাল্ট না হওয়াতে ভেবেছিলাম স্বপ্নটা ভেঙে গেছে আর সঙ্গ দোষে তাতে ধুলো জমে গেছে, আমি আবার সে ধুলো মুছে রঙিন একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, খুব মজবুত একটা স্বপ্ন ,যাতে কোন কিছুতে তা আর না ভাঙ্গে। বলতে গেলে তুমিই আমার এ স্বপ্ন দেখার আলোক অভিযাত্রী । ধন্যবাদ দিয়ে আর ছোট করবো না ,অনেক ঋণী করেছো আমাকে,কিভাবে সোধ করবো জানি না। ভালো থেকো আর আমার জন্য ও দোয়া করো, এমন ই যেন ভালো থাকতে পারি।

ইতি 

রোহান আহমেদ 

চিরকুট পড়ে মাফরুহা কতক্ষণ চুপ করে বসে রইলো।কি করবে ,বুঝতে পারছে না , ওর জন্য যদি রোহান ভালো হয়ে থাকে তা খুশির খবর ।চিরকুটটা অন্য ডাইরি তে রেখে দিলো আর ওর আম্মু কে সব বলল , ওর আম্মু ও সব শুনে খুশি হলো।

****

বেশ কয়েক বছর পর হঠাৎ একদিন সাহিলের সাথে কার্জন হলের সামনে দেখা, রোহান ভাই বলে জড়িয়ে ধরলো।আমিও ওকে পেয়ে খুশি, ও নাকি ঢাবিতে গণিতে পড়ছে ।মাফরুহা ঢাবিতে রসায়ন এ মাস্টার্স পড়েছে,

অঙ্কেল আন্টি ভালো আছেন।

আমাদের কথা বললাম,আমি এক প্রাইভেটে ব্যাংকে আছি, সরকারি ব্যাংক গুলো তে পরীক্ষা দিচ্ছি , আব্বু আম্মু ও ভালো আছেন, দাদি খুব অসুস্থ থাকেন।সাহিল মোবাইল নাম্বার দিয়ে বিদায় নিলো।বাসায় এসে আম্মুকে বলি, আম্মু অনেক দিন পর ওদের কথা শুনে নাম্বার নিয়ে মাফরুহার আম্মুকে ফোন দেন।প্রথমে দুজন ই কতক্ষণ পুরনো কথা মনে করে কাঁদলেও পরে বেশ খানিকটা সময় ধরে গল্প করেন ।একদিন অঙ্কেল আন্টি রা আমাদের বাসায় দাদিকে দেখতে আসেন।প্রায়ই আম্মুর সাথে আন্টির কথা হয়, দাদী মারা যাওয়ার দিন মাফরুহার পরিবারের সবাই দেখতে আসে।দাদীর রুমে মেহেরু আর সামান্তা বসে কাঁদছিলো আমি রুমে গিয়ে দেখি মাফরুহাকে ধরে দু বোন কাঁদছে।

আমি মাফরুহাকে বলি ,ওদের বুঝিয়ে বলতে যেন কান্নাকাটি না করে।মাফরুহা ওদের সান্ত্বনা দিচ্ছে কতকিছু বলে বোঝাচ্ছে।দাদীর জন্য আমার ও খারাপ লাগছে কান্না পাচ্ছে কিন্তু ছেলে বলে কাঁদতে পারছি না, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছি আর ভাবছি আমি সবাইকে সান্ত্বনা দিচ্ছি আর আমায় সান্ত্বনা দিবে কে?দাদী মারা যাওয়ার অনেক দিন পর আমার এক সরকারী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার পদে চাকুরি হয় ।

আম্মু আগে থেকেই মাফরুহা কে পছন্দ করতো আর আমার জয়েনের কয়েকদিন পর আম্মু আমাকে এসে বলে মাফরুহাকে বাড়ির বউ করে আনলে কেমন হয়? আমি ভিতরে ভিতরে আনন্দে আটখানা হই আর মুখে বলি

ভালোই হয় আম্মু । আম্মু চলে গেলে দু রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহ্ কাছে দোয়া করি-“হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ

থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শ হিসেবে কবুল করে নিন।” এর মাস খানেক পর মাফরুহাকে বিয়ে করি। মাফরুহা লেখাপড়া শেষ করে জবের জন্য পড়তে থাকে।আমার পরিবার ওর চাকুরি জন্য কোন বাধা দেয় না বরং আম্মু আব্বু ই চাকুরি করতে বেশি উৎসাহী করেন।

ও একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে জয়েন করে , এরই মাঝে আমাদের মারুফের জন্ম। ওর চাঁদ মুখ খানা দেখলে আমাদের সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যেতো । সপ্তাহের ছুটিতে ওকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতাম। ঘোরাঘুরি আমার আগে থেকেই পছন্দ, ভার্সিটি জীবনে দেশের কত জায়গায় যে ঘুরে বেড়িয়েছি ।মারুফ আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো, মায়ের মতোন করে সবার যত্ন নেয়। আমি আর আব্বু বাহিরে বের হতে গেলে জুতা জুড়া এগিয়ে দেয় ।অফিস থেকে ফিরলে ছোট ছোট হাতে আমার ঘাড় টিপে দেয়।

দাদী আর মার কাছে থেকে গল্প শুনে ,গল্প গুলো আবার ওর ফুফুরা বাসা এলে নিজে বলে, ভুল হলে দাদীর কাছে আবার গিয়ে জেনে আসে।বলতো ,জানো ফুফি আমি রাজপুত্র মারুফ রাজ হবো , সবার ভালো করবো, তখন কেউ কষ্টে থাকবে না। অনেক গুলো ছোট সূরা, কিছু কবিতা, গান শিখছে তা অভিনয় করে সবাই কে দেখায়।

ভালোই তো চলছিল আমাদের দিন গুলো, হঠাৎ কি হতে কি হয়ে গেলো। মারুফের মৃত্যুর পর মাফরুহা কে মনে হতো জীবন্ত লাশ। সবসময় চুপচাপ বসে থাকতো, কান্না করতো, জীবন সংসার ভুলে গিয়েছিলো।রোহা হওয়ার পর যখন ও হাত পা নাড়িয়ে শব্দ করতো , মাফরুহা বসে বসে তা দেখতো।আস্তে আস্তে ও স্বাভাবিক হতে থাকে।এই তো কিছুদিন আগে ও তো রাতে হঠাৎ ভূমিকম্প হয়, আমি রোহাকে কোলে নিয়ে আব্বু সহ নিচে নেমে যাই, ভূমিকম্প শেষ হলে বাসায় এসে দেখি , আম্মু পায়ের ব্যথায় নামতে পারেনি বলে মাফরুহা ও আম্মুর সাথে বাসায় থেকে যায় । আমি মায়ের ছেলে হয়ে ও আম্মুর কথা ভুলে গিয়েছিলাম আর মাফরুহা..! 

আজ ওকে যখন ছেলে মারা যাওয়ার দায়ে অপয়া বলছে তখন আমার মনে হচ্ছিল আমার কলিজাটা কেউ টেনে ছিড়ে বের করে ফেলছে।বাসায় এসে অনেক কেঁদেছে, বারবার বলছে, ওদের কাছে হয়তো মারুফ মারা গেছে কিন্তু আমার কাছে আজও সে জীবিত,সে তো মরে নাই, আমার ছেলে মারুফ জান্নাতের সবুজ পাখি হয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ।

কোথায় আছি আমরা, এমন সভ্য সমাজে থেকে ও কুসংস্কার মেনে চলছে মানুষ ।পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য হলো মৃত্যু, ইচ্ছে করছিলো কঠিন এ বাস্তবতা নিয়ে উপহাস করা মানুষের গলার টুঁটি টিপে ধরে বলি , আমার মাফরুহা কে এসব বলার কোন অধিকার তোমাদের নাই। শুয়ে শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে চোখের কোণে পানি জমে চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে, শোয়া থেকে ওঠে আল্লাহ্ তায়ালার কাছে দোয়া করি, আল্লাহ্ তো অন্তর্জামী সমস্ত বিচার আল্লাহর কাছে দিলাম।

মারুফের হাঁসি ,উচ্ছ্বাস, অভিমান, লুকোচুরি খেলা , কবিতা আবৃত্তির ভঙ্গিমা,পাঁচ তলা থেকে নিচ তলা পর্যন্ত ওর ছোটাছুটি, সব কিছু আমার কাছে আজো জীবন্ত, থাকবে আজীবন ।আত্মীয় স্বজনদের কাছে এসব কিছুই স্মৃতি হয়ে থাকে পারে কিন্তু সন্তান হারা বাবা মা জানে তাদের কত শূন্যতা লাগে ,আরো সন্তান থাকলেও তা পূর্ণ হবে না।

কেননা, শূন্যতাটা শূন্যতাই থাকে।

উৎসর্গ– 

গল্পটা  সন্তান হারা সব মায়েদের প্রতি উৎসর্গ করলাম ।

আরও পড়ুন