সন্ধ্যাতারা

ফারহানা শরমীন জেনী

সন্ধ্যার লালিমা কেঁটে রুপোলী চাঁদের আলোয় আলোকিত নক্ষত্র খচিত আকাশের সাথে জুঁইয়ের গভীর মিতালি। কারণ এই নক্ষত্রের মাঝে কোন এক নক্ষত্রে থাকে তার মা, এটা তার বিশ্বাস। সে বিশ্বাস করে যে সেখান থেকে তার মা তাকে অবলোকন করে, কথা বলে, সাবধান করে বিপদ থেকে। এজন্য জুঁই প্রতিদিন একটি করে চিঠি লিখে পূব আকাশের তাঁরাদের ভীড়ে উড়িয়ে দেয় সে চিঠি যদি বাতাস নিয়ে যায় মায়ের কাছে তার হৃদয়ের কথা।

মা,
তোমার জন্য অনেক অনেক দোয়া। জায়নামাজে বসে আজ মন খুব অস্থির। সৃষ্টিকর্তার সাথে অনেক কথোপকথনে আমি খুঁজে পাই অপরিমেয় শান্তি, গ্রীষ্মের গরমে কুলকুল করে ঘামতে থাকার মধ্যেও যেন পাই শীতল অনুভব। তোমার সাথে না বলতে পারা কথাগুলো আমি সব স্রষ্টার সাথে বলি যেন তিনি তোমাকে সব বলেন।

তুমি নেই মা বড্ড অসময়ে চলে গেলে, যখন তোমাকে আমার খুব প্রয়োজন। আমার একলা পথের যুদ্ধটায় আমি হেরে যেতে চাই না।কারণ আমাকে তুমি এতো দূর্বল করে তৈরি করোনি।

আজ এই অতিমারির সময় আমি ভিষণ দিশেহারা। লকডাউনে দোকানপাট সব সন্ধ্যার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। অর্ধেক বেলা তোমার জামাইয়ের দোকান খোলা থাকে। এভাবে ব্যবসা বাণিজ্য চলতে থাকলে মূলধন ফুরিয়ে যাবে।আমার কর্কট রোগের সাথে যুদ্ধ করতে যেয়ে যা ছিলো সব ফুরিয়েছে। জানিনা কর্কট জীবাণু গিয়েছে কিনা, এর মাঝে করোনা সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরছে।বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘটা যেন আমাকে বেশি তাড়িয়ে ফিরছে।ফুটফুটে মেয়েটার আমার এই অসহায় অবস্থা দেখে এখনই চোখের নিচে কালি ফুটেছে। একটা সৌখিন জিনিস ওর হাতে তুলে দিতে পারিনি জীবনের দিকে ধেয়ে আসা অযাচিত উল্কাপিণ্ডের আঘাতে।

ভেতরটা ভেঙেচুড়ে শেষ হয়ে যায়। তবু শান্তি সঙ্গ নিরোধ বা সামাজিক দূরত্ব মানার নামে মেয়েটাকে অনেক কিছু থেকে আড়াল করতে পারছি। এই মহামারির সময়ে কলকব্জার দোকান যেন বড়ো অপ্রয়োজনীয়।

তোমার জামাই যখন পান্ডুর মুখে ফেরে তখন খুব ইচ্ছে হয় জুঁই ফুল খোঁপায় গুজে পাটপাট শাড়িতে সেজেগুজে দরোজা খুলে দেই। কিন্তু মা জানো আমার এককোমর কালো চুলগুলো না সব কেমো আর রেডিও থেরাপির রিএ্যাকশনে পড়ে গিয়েছে। তাই জুঁইফুল খোঁপায় দেয়া শুধু স্বপ্ন থেকে যায়।

তোমার জামাই খুব ধৈর্য্যশীল একজন মানুষ। কি সুন্দর বাসায় এসে সব কষ্টকে নীলখামে পুরে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে গল্প হাসিতে মেতে ওঠে। মেয়েটাও তখন বাবার সাথে গল্পে মশগুল হয়।আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি ওদের বাবা মেয়ের খুনসুটি গল্প আহ্লাদীপনা আর সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়মনোবাক্যে আর্জি জানাই এই সুন্দর পৃথিবীতে আর কটা দিন সকল মানুষকে বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে দাও হে দয়াময় আর বরাদ্দ অক্সিজেন রিজিক বাড়িয়ে দাও যেন সৃষ্টির কৃতজ্ঞতায় নতশীরে কৃতজ্ঞ হয়ে বিদায় নিতে পারি। আবারও তোমার কাছে লিখা হবে কিনা জানি না মা। চারিদিকে যেভাবে মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে তাতে কে কখন হয়ে যায় তার সদস্য হয়তো এটাই আমার শেষ চিঠি হতে পারে ওঁত পেতে থাকা অণুজীবের আক্রমণে !

ইতি
তোমার ছোট্ট মেয়েটা

০৯/০৪/২০২১
রাজশাহী।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলাম লেখক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী 

আরও পড়ুন