সেন্ট্রাল আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশের কানে কানে

পর্বঃ মাতৃত্বের কি অপূর্ব রূপ !

নাজমা বেগম নাজু

বাংগুই এয়ারপোর্টে বসে আছি। বাইরে মেঘ- বৃষ্টি- রোদের মায়া কাড়া লুকোচুরির দারুণ মহড়া।অফিসিয়াল কাজে বোয়ার যাব বলে এই অপেক্ষার প্রহর আমার।সকাল নটার মত হবে।ভি আই পি লাউন্জে আমি একাই বসে আছি।ছোট্ট এয়ার পোর্ট। জাতিসংঘের বিমানগুলোই মূলতঃ উঠানামা করে এখানে।আম্তর্জাতিক বলতে শুধু মরক্কো আর কেনিয়ান এয়ার লাইন্স।এ ছাড়া আর কোন দেশের বিমান এখানে আসে না।জাতিসংঘের ফ্লাইং আওয়ার ছাড়া ব্যস্ততা বলতে গেলে একেবারেই নেই এখানে।এর মাঝেই হঠাৎ করেই যেন একটু একটু ব্যস্ততার আভাস পাই।হঠাৎ করেই সাড়া পড়ে গেছে যেন, হঠাৎ করেই স্বাগত কোন আগমনীর ইশারা।

একটু পরেই দেখি বিমান বম্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ভীড়।তারা খুব ভাল করে পুরোটা এয়ার পোর্ট চেক করেন এবং কর্ডন করে রাখেন।কিছু পরেই পার্লামেন্টের নিরাপত্তা কর্মীরা আসেন।তারাও ভি আই পি লাউন্জ এবং এর আশেপাশের সবটা খুব ভাল ভাবে চেক করেন।তাদের কাছেই জানতে পারি, ফরেইন মিনিস্টার আসছেন।তিনি ইংল্যান্ডে যাবেন আজ।পাঁচ মিনিটের মথায় তিনি চলে এলেন।আমি অবাক হয়ে দেখছি– তিনি একজন নারী। ঘন কালো বুনো এই সেন্ট্রল আফ্রিকার ফরেইন মিনিস্টার কিনা একজন নারী! দেখতে ঠিক অষ্টাদশির মত অপরুপ সৌন্দর্যের একজন কৃঞ্চাংগিনী।কিছুটা চঞ্চল, অনেকখানি দৃঢ়চেতা এবং নেচ সপ্রতিভ।শীর্ষ স্থানীয় একজন মন্ত্রী হলেও এই চাঞ্চল্যটুকু তার এক হারা নিটোল শরীরের সাথে ঠিক মানিয়ে গেছে যেন।তার বিনয় এবং ভদ্রতা মন ছুঁয়ে যায়।করমর্দনের জন্য নিজেই হাত বাড়িয়ে দেন। পরিচয় দেন— আমি ফরেইন মিনিস্টার, সেন্ট্রাল আফ্রিকার।

আমিও নিজের পরিচয় তুলে ধরি—- বাংলাদেশ আর্মির একজন চিকিৎসক।এখানে জাতিসংঘের লেবেল টু হাসপাতালে আছি।এই হাসপাতালের কমান্ডার আমি।তিনি তার স্বভাব সুলভ চপল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বললেন, আমি জানি, তোমার কথা অনেক শুনেছি আমি।আমি কৃতঙ্গতা জ্ঞাপন করি তুমি এবং তোমার দেশের প্রতি।অনেক ঝুঁকি নিয়ে, অনেক অনেক চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে আমাদের দেশ এবং জনগণের সেবা করছ।এর জন্য অশেষ ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে।উত্তরে আমিও তাকে এবং তার দেশকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।আমাদের প্রতি তাদের সম্মান এবং সমর্থন অব্যাহত রাখার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি।

তার পাশের সিটে হালকা পাতলা গড়নের নয় দশ বছরের ছোট্ট একটি মেয়ে ট্রলি একটি ট্রলি ব্যগের উপর হাত রেখে বসেছিল– পরিচয় করিয়ে দেন, এটি তার মেয়ে।স্বল্পভাষী এই মেয়েটি অনেক বেশি ভদ্র এবং শান্ত।কিছু পরে একটি শিশুকন্যা কোলে নিয়ে ভেতরে আসে একজন পরিচারিকা।জানতে পারি এটি তার ছোট মেয়ে। শিশুটি কাঁদছিল।ফরেইন মিনিস্টার পরম আদরে তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।আমি শ্রদ্ধায় মুগ্ধতায় দামী ব্রান্ডেড সার্ট প্যান্ট স্যু পরিহিতা আফ্রিকান এক মিনিস্টারের চিরায়ত মাতৃত্বের রুপ দেখি। যে রুপ মহাবিশ্বের মহাকালীন বহতায় শাশ্বত মহিমায় চির অম্লান।দেশ কাল গোত্র বর্ণ সব কিছুর সীমারেখাকে ছিন্ন করে একই বৃত্তে অবস্হান নেয় চির ভাস্বর যে রুপ।তাদের নির্ধারিত ফ্লাইটের সময় হয়ে গেলে যথারীতি রিপোর্ট করতে বলা হয়। তিনি চলে যান।আমার জন্য রেখে যান হঠাৎ পাওয়া একমুঠো আলোর ঝলকানি

( চলবে)।

লেখকঃ জাতিসংঘের প্রথম কন্টিনজেন্ট নারী কমান্ডার ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন