স্মরণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মঞ্জিলা শরীফঃ

আজ বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৯ তম জন্মদিন।
বাংলা হিসেবে আজ ২৫ শে বৈশাখ আর ইংরেজী হিসেবে গত কাল ৭ই মে। তবে বাংলা হিসেবে ২৫ শে বৈশাখ খুবই বিশাল আকারে কবি গুরুর জন্মদিন পালন করা হয়।

১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ শে বৈশাখ (১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ ৭ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের অনন্যপ্রতিভা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পিতাঃ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতাঃ সারদাসুন্দরী দেবীর চতুর্দশ সন্তান।

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান অতুলনীয়। তাঁর লেখনীতে বাংলা সাহিত্যের সবকটি ধারা পুষ্ট হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে কবি,কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও সংগীত রচয়িতা। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম বাঙালি হিসেবে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর ৫২ টি কাব্যগ্রন্হ, ৩৬ টি প্রবন্ধ, ৩৮ টি নাটক, ১৩ টি উপন্যাস এছাড়াও ৯৫ টি ছোটগল্প ও ১৯১৫ টি গান বাংলা সাহিত্যের অমর সংযোজন। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিচরণ ছিল বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায়। তাঁর লেখা গান আমাদের জাতীয় সংগীত। বাঙালির মহান মুক্তিসংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের গান জুগিয়েছে প্রেরণা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররের বিখ্যাত রচনাসমূহের মধ্যে
কাব্যগ্রন্থঃ গীতাঞ্জলি, সোনারতরী, বলাকা, চিত্রা, ক্ষণিকা।

উপন্যাসঃ শেষের কবিতা, গোরা, চোখের বালি, চার অধ্যায়, যোগাযোগ চতুরঙ্গ।

ছোটগল্পঃ হৈমন্তী, সুভা, ছুটি, এক রাত্রি, অপরিচিতা প্রভৃতি অন্যতম। মূলত সার্থক ছোট গল্পের সূত্রপাত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতেই।

তিনি ভানুসিংহ ঠাকুর ছদ্মনামে লিখতেন।

উল্লেখ্য ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয় মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে।

বিশ্বভারতী তাঁর বিপুল কর্মকাণ্ডের একটি প্রধান কীর্তি।

কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, নওগাঁর পতিসর ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত স্হান

নওগাঁ পতিসর কবি গুরুর বহুল স্মৃতি বিজড়িত, এখানকার গাছপালা রাস্তাঘাট নদী মাঠের প্রতিটি কোনায় কবির পদচারনা মুখরিত ছিল জীবনের অনেকটা সময়। নওগাঁর এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কবির সৃষ্টির স্মৃতিগুলো এখনও প্রোজ্জ্বল। নাগর নদীর তীরে এই পতিসরে বসে কবি রচনা করেছেন—-

আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে,
পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ী
দুই ধার উঁচু তার ঢালা তার পারি।

অথবা লিখে গেছেন—

তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে—
এর মত অনেক কবিতা বা গল্প।

এখনও সেই নাগর নদী ছোট নদী হয়েই আছে, এক সময় বজড়ায় চেপে এই নদীর বুক বেয়ে তিরতিরয়ে আসতেন পতিসরে, সাহিত্যের পিপাসা মেটাতেন এখানে বসে, প্রজাদের সুখ দুঃখ নিজের চোখে দেখতেন। আজও যেমন চিকচিক করা বালুরাশি কবির স্মৃতিই স্বরণ করে তেমনি সেই একপায়ে দাঁড়ানো তাল গাছটি নেই পাশে গজে উঠেছে অন্য তাল গাছ তবে কবির সেই একপায়ে দাঁড়ানো তালগাছটির গুড়ি বা গোড়া যাই বলিনা কেন তা এখনও স্বযতনে সংরক্ষণ করা হয়েছে সেখানে গড়ে উঠেছে একটা মন্দির।

সেই সময় রবীন্দ্রনাথ তার ছেলের নামে ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নওগাঁ জেলার আত্রাই থানার পতিসরে কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন নামে একটা বিদ্যালয় মাত্র হাতে গোনা কয়েক জন শিক্ষার্থী নিয়ে আজ তা মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ ছাত্র ছাত্রী শিক্ষক মন্ডলীর উপস্হিতিতে প্রতিদিন মুখরিত থাকে, দুঃখের বিষয় বাদ্যালয়টি আজও সরকারীকরন হয়নি। স্কুলেই প্রতিষ্টিত হয়েছে রবীন্দ্র লাইব্রেরী সেখানে সংরক্ষিত আছে কবির দূর্লভ কিছু হাতের লেখা ও ছবি। রবীন্দ্র কাচারী বাড়িকে আধুনীকায়ন করা হয়েছে করা হয়েছে রবীন্দ্র যাদু ঘর সেখানে স্হান পেয়েছে কবি গুরুর ব্যবহৃত খাট থেকে শুরু করে মূল্যবান ও দূর্লভ অনেক স্মৃতি ও অনেক জিনিস। এখানে যে আন্তর্জাতিক রবীন্দ্র গবেষনা ইনস্টিটিউট তৈরী করা হয়েছে তা সরকারী করণে এখন সময়ের দাবী।

১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বিশ্বকবি।

জন্মদিন প্রসঙ্গে কবিগুরুর লেখা কবিতার চরণ দিয়ে শেষ করছি —
স্ফূলিঙ্গ কাব্যগ্রন্থ থেকে

জন্মদিন আসে বারে বারে
মনে করাবারে
এ জীবন নিত্যই নতুন
প্রতি প্রাতে আলোকিত
পুলকিত
দিনের মতন।

লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী।

আরও পড়ুন