ধারাবাহিক উপন্যাসঃ – ডাংগুলি (পর্বঃ নয়)

-খোশবুর আলীঃ
যথা সময়ে মিনার একটি মেয়ে সন্তান জন্ম নিল। মেয়ে দেখতে ঠিক সোহেল চৌধুরীর মতই হয়েছে। মেয়ের নাম রাখলো ছেলের নামের সাথে মিল করে মনি। ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে মিনার ব্যাস্ত সময় কাটে। স্কুল থেকে ফিরে মনা বোনের সাথে  খেলা ধুলা করে। পাড়া পড়সি সবাই খুব খুশি হতো তাদের দেখে। মনাও এতদিনে  পঞ্চম শ্রেণী পাশ করে নাটোর সদর উচ্চ বিদ্যলয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে।

মিনার যদিও নিজের একটি মেয়ে হয়েছে তবুও সে মনাকে নিজের ছেলের মতই মানুষ করে চলেছে।

এদিকে সোহেল চৌধুরীর ব্যবসার আরও উন্নতি হয়েছে। নিজস্ব চালের মিল হয়েছে। সেখানে প্রায় শ-খানেক মা্নুষ কাজ করে। ফলে তাঁকে নিজস্ব একটি অফিস বানাতে হয়েছে। অফিসে পিওন ,ম্যানেজার সবই আছে। ট্রাকের ট্রাক ধান তাঁর চাতালে আসে প্রতিদিন । সোহেল চৌধুরীর বন্ধুরা তাঁকে বলতে লাগল বন্ধু মনাই তোর ভাগ্য খুলে দিল। বাড়ি থেকে তাঁর অফিসে যাতায়াতের জন্য একটি গাড়িও কিনেছেন।

সোহেল চৌধুরীর বন্ধুরা এবার সবাই বলতে লাগল সবই যখন হল এবার একটি ভাল বাড়ি বানাও।

অনেক ব্যাংক ব্যালাঞ্চ হয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে রিজার্ভ থাকে। তাই সোহেল চৌধুরী বাড়ির ব্যাপারে মিনার সাথে পরামর্শের জন্য বলল-

সোহেল চৌধুরীঃ মিনা , বন্ধুরা সবাই বলছে তোমার সুখি সংসার, টাকা পয়সা মাশাআল্লাহ অনেক হয়েছে, বহু দিনের করা আমার বাবার বাড়িটা ভেঙ্গে একটি নতুন বাড়ি করলে কেমন হয়।

মিনাঃ আমাদের এই বাড়িতে কোন কিছুর অসুবিধা নাই। মনা-মনি বড় হচ্ছে। আমি ছেলেকে যেমন বাড়ি দিতে চাই তেমন মেয়েকেও আলাদা বাড়ি দিতে চাই। তাহলে আপনার পিতার তৈরি করা এই বাড়িটি না ভেঙ্গে যায়গা কিনে সেখানে আরেকটি বাড়ি বানান। বাবার স্মৃতি ও থাকবে, আমাদের বাড়িও হবে।

সোহেল চৌধুরীঃ তুমি ঠিক বলেছ। দেখি শহরের মধ্যে কোথাও তেমন যায়গা পাওয়া যায় কি না।

সোহেল চৌধুরী তাঁর বন্ধুদের মধ্যে যায়গা খুঁজে দেবার জন্য অনুরোধ করলো। কয়েক দিনের মধ্যেই বনপাড়া মোড়ে এক বিঘার একটি যায়গা পেয়ে গেল সে। জমি রেজিস্ট্রির পর সে বাটির কাজ শুরু করে দিল। বিরাট ডেভেলাপার কোম্পানিকে তিন তালা বাড়ি নির্মানের দায়িত্ব দিলেন।

ডেভেলাপার কোম্পানির বড় বড় ড্রেজার মেশিন এলো মাটি কাটার জন্য। কয়েক দিনের মধ্যে ফাউন্ডেশন হলো, শুরু হল ঢালাইয়ের কাজ। কাজ দেখা শোনার  জন্য সোহেল চৌধুরী নাটোর সিটি কর্পোরেশানের ইঞ্জিনিয়ার আলতাফ উদ্দিনকে দায়িত্ব দিলেন কাজে যাতে ফাঁকি দিতে না পারে।

একদিন বিকালে সোহেল চৌধুরী তাঁর ছেলে মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিজের গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন বাড়ির কাজ দেখাতে।

বড় বড় সব মেশিন দেখে মনা অবাক হয়ে দেখতে লাগল। মেশিন গুলো কিভাবে কাজ করে। মনা লক্ষ করলো হ্যাট পরা একজন ভদ্রলোক সবাইকে নির্দেশ করছেন। এইটা ভুল হল এইভাবে কর। এভাবে ভুল ধরিয়ে সঠিকভাবে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। মনা তাঁর বাবাকে জিজ্ঞাসা করল –

মনাঃ বাবা, উনি কে?

সোহেল চৌধুরীঃ উনি ইঞ্জিনিয়ার বাবা।

মনাঃ উনি আমার কে হন?

সোহেল চৌধুরীঃ চাচ্চু হয়।

মনাঃ চাচ্চু কি সব জানে বাবা?

সোহেল চৌধুরীঃ হাঁ বাবা। ইঞ্জিনিয়ারেরা এসব কাজের সব জানে।

মনাঃ বাবা আমি চাচ্চুর সাথে কথা বলি।

সোহেল চৌধুরীঃ ঠিক আছে বল, তবে প্রথমে সালাম দিবে, তার পর কথা বলবে।

মনাঃ আচ্ছা বাবা। বলে ইঞ্জিনিয়ার আলতাফ উদ্দীনের নিকট এগিয়ে গেল।

মনাঃ আসসলামু আলাইকুম চাচ্চু।

আলতাফ উদ্দীনঃ অলাইকুমুসসালাম।

মনাঃ চাচ্চু , ভালো আছেন?

আলতাফ উদ্দীনঃ হ্যাঁ বাবু। তুমি কে?

মনাঃ উনি আমার বাবা, বলে সোহেল চৌধুরীকে দেখিয়ে দিল।

আলতাফ উদ্দীনঃ ও আচ্ছা। আমি ভাল আছি । তা ভাতিজা তুমি কেমন আছো?

মনাঃ ভাল।
একটু পরে-

মনাঃ চাচ্চু, আপনি কিভাবে এসব কাজ শিখলেন?

আলতাফ উদ্দীনঃ পড়াশোনা করে। সে জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হয়। তুমি হতে চাও?

মনাঃ হ্যাঁ।

আলতাফ উদ্দীনঃ তাহলে তোমাকেও অনেক পড়াশোনা করতে হবে। ক্লাসে ফার্ষ্ট হতে হবে।

মনাঃ আমি তো ক্লাসে ফার্ষ্ট হই।

আলতাফ উদ্দীনঃ ও আচ্ছা। গুড বয়। তাহলে তুমি পারবে।

মনাঃ কখন পারবো?

আলতাফ উদ্দীনঃ বড় হলে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর।

মনাঃ ও আচ্ছা।

মিনা, মনাকে ডাকল, এস বাড়ি যেতে হবে সন্ধ্যা হয়ে এল।

মনা মা-বাবার নিকট ফিরে এলে তাঁরা গাড়িতে উঠে বসল, বাড়িতে আসার উদ্দেশ্যে। মনা তাঁর বাবাকে বলল,

মনাঃ বাবা আমি বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই ঐ চাচ্চুর মত।

সোহেল চৌধুরীঃ তাই নাকি বাবা।

মনাঃ হ্যাঁ।

সোহেল চৌধুরীঃ ঠিক আছে বাবা। বড় হও। ভাল ভাবে পড়াশোনা কর, তুমিও ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবে।

কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁরা বাড়ি ফিরে এল। মনা মাঝে মাঝে বাবার সাথে দেখতে যেত কত তাড়াতাড়ি তৈরি হচ্ছিল তাদের বাড়িটি।

সেই থেকে মনার মনের মধ্যে উঁকি দিত একটি স্বপ্ন, সে বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।

চলবে..

আগের পর্বঃ

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ ডাংগুলি  (পর্বঃ আট)

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন