ধারাবাহিক উপন্যাসঃ ডাংগুলি (পর্ব:১)

-খোশবুর আলীঃ

আজ বৃহস্পতিবার। ২০ শে এপ্রিল উনিশ মত উন্নব্বই সাল। মনা ফজরের আজানের সাথে সাথে উঠে টয়লেটে গিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে অজু করে ফজরের নামাজ পড়ে মহান আল্লাহর  নিকট তাঁর পিতামাতা, আত্মীয় স্বজন সবার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করলো। তাঁর পর নিজের চাকুরী ভবিষ্যৎ জীবন, সর্বপরি মৌ এর জন্যও দোয়া করলো। আজ মনটা তাঁর খুব হাল্কা লাগছে।
মৌ আজ খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছে। সেও ফজরের নামাজ পড়ে মনার জন্য নিজের জন্য তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য দোয়া করেছে। এবং সকাল থেকে মাকে রান্না ঘরের বিভিন্ন কাজে সাহায্য করছে। মেয়ের এমন পরিবর্তন দেখে  মা বেশ খুশি হল। কারণ মৌ এর এখুন কিছু কিছু রান্না বান্না শেখা দরকার। মেয়ের বিয়ে দিলে স্বামীকে অন্তত রান্না করে খাওয়াতে পারবে। তাই খুটিয়ে খুটিয়ে সব কিছু মৌকে বলতে থকল, আর মৌ নিজ হাতে সব কিছু করতে থাকলো।
মনাও গোসল সেরে ফেলেছে। তাই মৌ নিজ হাতে ডাইনিং টেবিলে এসে খাবার রেডি করে ফেলল।
মৌ মনার রুমের দরজায় গিয়ে  বলল-
মৌঃ আসুন আপনার খাবার রেডি।
মনাঃ মৌ বলত আজ কোন পোশাকটা পরে গেলে ভাল হয়?
মৌঃ সেটা পরে হবে, আগে খেয়ে নিন।
মৌঃ আচ্ছা, চল খেয়ে নি।
তাঁরা দুজনে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল। মৌ নিজে সব কিছু তুলে মনার  থালায় দিচ্ছে—-।
মনাঃ আরে থাক আর না।
মৌঃ এগুলো আজ সব আপনাকে খেতে হবে।
মনাঃ আমি রাক্ষস নাকি।
এমন সময় মৌ এর মা এসে বলল—
মাঃ সেকি বাবা, তুমি রাক্ষস হতে যাবে কেন? আজ মৌ নিজ হাতে রান্না করলো তোমার জন্য।
মনাঃ তাই নাকি?
মৌ নিজের জামার কলার নাড়িয়ে দেখালো।
মনাঃ ওহ আচ্ছা, তাহলে তো খেতেই হবে। হাজার হলেও নতুন রাধুনি।
মৌঃ কথা না বাড়িয়ে খেয়ে নিন তো?
মনা এটা ওটা খাওয়ার চেষ্টা করলো বটে, কিন্তু কিছুতেই খেতে পারছে না।
পরিক্ষার দিনগুলিতে মনা যেমন খেতে পারতো না, ঠিক তেমনি আজ প্রথম চাকুরীতে যাচ্ছে তাই কিছুই ভাল খেতে পারলো না। তাঁর পরও খুব চেষ্টা করলো খাবার জন্য। মৌ এর মা তাদেরকে খেতে দেখে চলে গেল নিজ কাজে।
খেতে না পেরে মনা থালা রেখে উঠে গেল দেখে মৌ মুখটা একটু বেজার হয়ে গেল। মনা ইশারা করে বলল এগুলো তোমার জন্য রাখলাম। দেখি তুমি আমাকে কেমন  ভাল—।
মৌ এবার বুঝতে পারলো, তাই সে মুচকি হেঁসে বলল-
মৌঃ ও আচ্ছা, আমি খেয়ে নিচ্ছি।
মনাঃ তাড়াতাড়ি এসো আমার ঘরে কোন পোশাকটা পরব দেখিয়ে দিবা।
মৌ খাবারের থালাটা হাতে নিয়েই মনার পিছু পিছু মনার ঘরে চলল।
মৌ খেতে খেতে বলল-
মৌঃ আকাশি রঙের শার্ট পরেন আর কাল প্যান্ট। তাঁর ওপর কাল স্যুট ও টাই। মৌ এর কথা মত মনা কাপড় পরে আয়নার সামনে দেখল, সত্যি আজ তাঁকে অফিসার অফিসার মনে হচ্ছে।
সকাল আটটায় মনা বেড়িয়ে পড়লো কারন প্রথমে সাহেব বাজারে যেতে হবে কিছু মিষ্টি কিনতে। সেখান থেকে অফিস।
বাজারে গিয়ে রাজশাহী মিস্টান্ন ভান্ডার থেকে দুই সের মিষ্টি কিনে রিক্সা নিয়ে অফিসে চলে গেল।

অফিসে যোগদানের পর থেকে মনা বেশ সৎ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে তাঁর সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। সরকারী বিভিন্ন কাজগুলি সে খুব ভাল ভাবে দেখা শোনা করতে লাগল। তাঁর নিয়ন্ত্রনে যে সকল রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট নির্মান হত তাতে কণ্ট্যাক্টর কোন রকম খারাপ কিছু করতে পারতো না।এমনি একটি কালভার্ট পরিদর্শনে বেরিয়েছে মনা। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ষাট কিলোমিটার দূরে গ্রাম্য মেঠো পথ দিয়ে চলছিল গাড়ী। মনার মনে পড়েছিল তার সেই ছোট্ট বেলার স্মৃতি।
————————————
অনেক দিন আগের কথা। বৈদ্যপুর গ্রামে বাস করতো এক গরিব কৃষক। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলের নাম মনা। ওর বয়স তখন আট নয় হবে। সে সময় সারা বছরে একটি মাত্র ফসল ফলত। আষাঢ় মাসে বৃষ্টি হলে জমিতে ধান  রোপন করতো, আর অগ্রাহায়ন মাসে পাকা ধান কাটতো। মনার বাবা গ্রামের খলিল মন্ডলের জমির ধান দুই আড়ি (বিশ মনে দুই মন) হিসাবে আরও অনেক কামলাদের সাথে কাটতো এতে পাঁচ/সাত মন ধান পেত তা দিয়ে কি আর পাঁচ জনের সংসারে সারা বছর চলে? ফলে খাদ্যের সংকট থাকতো প্রায় বছর জুড়ে। যেটুকু ফসল পেত তার কিছু অংশ বেঁচে আবার পোশাক আশাক কিনতে হত। ফলে খাবারের কষ্টে ছেলে মেয়েদের শরীর খুব ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। মনার বাবা তাই মনাকে মড়লের বাড়িতে পেট ভাতা ( মাইনে ছাড়াই শুধু তিন বেলা খেয়ে কাজ করা)গরু চরানোর কাজে লাগিয়ে দিলেন। কাজে লাগার পর মনা নিয়মিত তিন বেলা খেতে পেত আর দুই বেলা গরু চরাতো। অগ্রাহায়ন মাসে ধান উঠে গেলে মাঠ ফাঁকা হয়ে যেত ফলে গরু চরাতে তার খুব একটা কষ্ট হত না। অনান্য রাখালদের সাথে সে মার্বেল, ডাংগুলি, পুঁতলাঠি, গোবর লাঠি ইত্যাদি খেলতো। কখনো কখনো খেলাধুলা করতে গিয়ে ছেলেদের মাঝে মারামারিও হত, আবার কিছুক্ষণ পরে মিলও হত এবং আবার খেলা করতো।
এমনি একদিন তারা ডাঙ্গুলি খেলছিল। ডাংগুলি খেলার একটি ডান্ডা (শক্ত লাঠি)ও একটি গুলি (ডান্ডার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ ছোট্ট যার দুই প্রান্ত ছূঁচালো করা থাকে) এই দুটো জিনিস লাগে। ছেলেরা দুই  দলে বিভক্ত হয়ে খেলা শুরু করে। মাটিতে একটি গর্ত করে সেই গর্তে গুলি রেখে ডান্ডা দিয়ে ছুঁড়ে দেয় দূরে আর অন্য দলের খেলোয়াড় তা মাটিতে পড়ার আগে ধরার চেষ্টা করে, ধরতে পারলে যে গুলি ছুঁড়েছিল সে বাতিল হয়ে যায়। তার পক্ষ দলের অন্যজন গুলি ছুঁড়ে। এভাবে একে একে সবাই বাতিল হলে বিপক্ষ দল গুলি ছুঁড়ে।
এভাবে খেলা চলতে থাকে। বিপক্ষ দল গুলি ধরতে না পারলে সেই গর্তে রাখা ডান্ডায় ছুঁড়ে মারে, লাগলে খেলোয়াড় বাতিল হয় আর না লাগলে গুলির এক প্রান্তে হাল্কা টোকা মেরে গুলি একটু উপোরে উঠলে ডান্ডা দিয়ে সজরে ছুঁড়ে মারে দূরে। এভাবে তিনবার মারার পর গুলি যেখানে পড়ে সেখান ডান্ডা দিয়ে গর্ত পর্যন্ত দুরত্ত মাপতে থাকে। প্রতি ডান্ডায় বলতে থাকে বাড়ি, ধুড়ি, তেড়ি, ছাগল, চাম্পা, ঝেঁক, ফেঁক। এভাবে সাত ডান্ডায় এক ফুল। এভাবে বিশ বা ত্রিশ ফুলে খাটুনি খাটতে হয়।
যে দল বিজয়ী হয় তারা এক একজন করে হারা দলের এক জনকে খাটুনি খাটায়। এতে গুলি মাটিতে পড়বার আগে ডান্ডা দ্বারা টোকা দিতে হয়। এভাবে তিনবার করা হয় এতে মোট যতবার টোকা দিতে পারে, ঠিক ততবার গুলিকে ডান্ডা দ্বারা সজরে ছুঁড়ে মারা হয়। সর্ব শেষ ছুঁড়ে মারার পর গুলি যেখা পড়ে সেখান থেকে হারা দলের একজন দম ধরে দৌড়ে গর্তের নিকট ফেরত আসে। এভাবে হারা দলের সবাইকে একে একে খাটুনি খাটতে হয়। এই হল ডাংগুলি খেলার নিয়ম কানুন। তবে তা এলাকা বিশেষে আলাদা হতেও পারে।
হঠাৎ মনার ছোড়া গুলি বিপক্ষ দলের এক ছেলে ধরতে গিয়ে লাগল তার চোখে। সে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। সবাই ছুটে গেল তার কাছে। ছেলেটির চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। একজনের গামছা দিয়ে চোখটা ভালভাবে বেঁধে আরো দু’জন ছেলে তাকে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে এলো। মনা মাঠেই ছিল তাঁর মনটা খুব খারাপ, কারণ তাঁর ছোড়া গুলিতে ছেলেটি আহত হয়েছে। ফলে আজ তাকে মাঠের সকল গরু একাই চরাতে হচ্ছে। সব ছেলেরা মনাকে দোষারোপ করতে লাগল। কিন্তু এতে মনার কোন দোষই ছিল না।
এদিকে আহত ছেলেটিকে তাঁর বাবা গরুর গাড়ীতে করে মুন্ডুমালা বাজারে ডাক্তারের নিকট নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে যাবার জন্য পরামর্শ দিল। ফলে মুন্ডুমালা হতে টমটমে (ঘোড়ার গাড়ি) আমনুরা রেলষ্টেশনে  পৌঁছে ট্রেন ধরে রাজশাহী মেডিকেলে গেল। চিকিৎসা করে ছেলেটি সুস্থ্য হল বটে  কিন্তু চোখটা চির দিনের জন্য অন্ধ হরে গেল।
মেডিকেল থেকে ফেরত আসার পর ছেলেটির বাবা মোড়লের নিকট বিচার দাবি করল মনার বিরুদ্ধে। সন্ধ্যায় বিচার বসল। ডাকা হল মনাকে। প্রথমে আহত ছেলেটির কথা শোনা হল। কিন্তু সে যা বলল তাতে সবাই রীতিমত হবাক। ছেলেটি সোজাসুজি বলল মনা ডান্ডা দিয়ে আমার চোখে মেরেছে। মনাকে জিজ্ঞাসা করা হল। মনা কাদুমাদু স্বরে বলল, আমি মারিনি ডান্ডাগুলি খেলার সময় গুলি ধরতে গিয়ে তাঁর চোখে লেগেছে। এবার স্বাক্ষিদের পালা। কিন্তু সকল রাখাল একই কথা বলছে- মনা ডান্ডা দিয়ে মেরেছে। যেহেতু সকল স্বাক্ষি একই কথা বলছে তাই মনার কথার কোন দামই দেওয়া হল না।
বিচারের রায় হোল দশ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে নইতো দশ বছর বাড়ির খেয়ে বাদীদের গরু চরাতে হবে।
মনার বাবার দশ হাজার টাকা জরিমানা দেবার সামর্থ্য ছিল না, তাই আগামী কাল থেকে মনাকে বাড়ির খেয়ে তাদের গরু আগামী দশ বছর চরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হল।
মনাদের সংসারের অবস্থা আরো খারাপ হতে লাগল। মনা গরু চরিয়ে বাড়ি আসলে তাঁরা মনাকে বিভিন্ন দোষারোপ করত যেমন- এত তাড়াতারি গরু নিয়ে এলি কেন? অথবা গরুকে এত মেরেছিস কেন? ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করতো এমনকি মারধর ও করতো।
এর কিছুদিন পর মনার বাবা মনাকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। একদিন রাতে মনাকে ঘুম থেকে তুলে গ্রামের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল অজানার উদ্দেশ্যে।
চলবে..

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন