বিচার

সুস্মিতা মিলি

মুনিয়ার মা যখন মুনিয়াকে ডান কাঁধে নিয়ে চারতলা থেকে নামছিলো তখন তার বা হাতে ধরা জিনিসটাকে কেউ খেয়াল করেনি। হয়তো কেউ দেখেইনি মুনিয়ার মাকে। সবার আগে ওর বাম হাতের মাঝে ধরা জিনিসটাকে দেখেছিলো দুতলার বাড়ীওয়ালার কাজের মেয়ে কাকলি । মেয়েটা বুঝতে পারেনি প্রথমে , তবুও জিনিসটাকে দেখে সে চিৎকার শুরু করলো।
সেদিন তার গগনবিদারী চিৎকারে প্রতিটা ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গিয়েছিলো।

আজব বিষয় হলো একটা মানুষও এগিয়ে আসেনি মুনিয়ার মায়ের সাহায্যে। কিন্তু একটা কাজ সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে করেছে। সবাই যার যার স্মার্ট ফোনে মুনিয়ার মাকে সামনে পিছনে ভিডিও করতে লাগলো।
মুনিয়ার মা এতো মানুষের মাঝখানেও নির্বিকার ভাবে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে রাস্তায় হাটতে লাগলো। তার পেছনে কৌতুহলী মানুষের ভীড়। কেউ একজন দয়াপরবশ পুলিশে খবর দিলো।

এতক্ষণ যে মুনিয়ার কথা বলা হলো সেই মুনিয়ার বয়স নয় বছর। ফড়িং এর মতো চিকন মেয়েটা পাখির মতো সারাক্ষণ কিচিরমিচির করে বাসা গরম রাখে। বাবা মায়ের আদরের ধন এই মুনিয়া ।
এবছরই ক্লাস থ্রীতে উঠেছে মুনিয়া। শুধু বাবা মা নয় পুরা বিল্ডিংএর সবাই ওকে ভালোবাসে। নতুন কাউকে দেখলেই নিজ থেকে এগিয়ে গিয়ে বলবে,
আন্টি আমার নাম মুনিয়া আমি চারতলায় থাকি। এ নিয়ে মাঝে মাঝে খুব বকা খায় মায়ের। মুনিয়ার একটা ভাই আছে তিন বছর বয়স। ভাইবোনে খুব ভাব।
মুনিয়ার বাবা একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করে।

মুনিয়া আর মুনিয়ার মা ছোট বাবুটাকে নিয়ে খুব আনন্দের মাঝেই বাসায় থাকে। লাকডাউনের কারনে বাসায় কোন কাজের মানুষও নাই। তাতে কি। আনন্দের কোন কমতি নাই তাদের।
মা আর ভাইবোনের দিনগুলিও খুব আনন্দে কাটতে থাকে। মুনিয়ার মা মেয়েকে গানের ক্লাস, আবৃত্তির ক্লাসে ভর্তি করেছে অনেক আগেই। বিকাল হলেই মেয়েকে নিয়ে ক্লাসে যায়। খুব সুন্দর গান গায় মুনিয়া।
ইদানীং মুনিয়ার দিনগুলো ভালো যাচ্ছিলো না। লাকডাউনের ফাঁদে তার সকল আনন্দের জায়গায় যাওয়া বন্ধ। প্রতিদিনই মাকে বলতো স্কুলে না গেলে সারাদিনই বোরিং বোরিং লাগে।
কয়েকদিন হলো অনলাইনে এক ওকে টিচার পড়ায়। প্রচুর হোম ওয়ার্ক থাকে। মুনিয়া ব্যাস্তই থাকে। বাকি সময় টিভি দেখে গান গেয়ে কাটায় আর প্রিয় ভাইয়াটাতো আছেই।
আজ মুনিয়া হোমওয়ার্ক করতে করতে বললো,
—–মা খাতা আর পেন্সিল শেষ।

মুনিয়ার মায়েরও কিছু সাংসারিক জিনিস কিনতে হবে। তিনি রেডি হয়ে মেয়েকে বললেন,
—–আমি আধা ঘন্টার মধ্যেই ফিরবো মা,কেউ আসলে দরজা খুলবে না। আর ভাইয়া ঘুমাচ্ছে, উঠলে ওর সাথে থেকো।
——-আসার সময় মেঙ্গো আইসক্রিম নিয়ে এসো মা।

মুনিয়ার মা বাইরে যাওয়ার সময়ই দেখলো, বাড়ীওয়ালার কলেজে পড়া ছেলে আর তার দুই বন্ধু নিয়ে বাসার নিচে গ্যারেজে বসে আড্ডা দিচ্ছে। মোবাইলে কিছু দেখছে আর খুব মজা পেয়ে হাসছে।
মুনিয়ার মাকে দেখে সালাম দিলো,
—-বললো আন্টি এই লকডাউনে কোথায় যাচ্ছেন।
—-মুনিয়ার খাতা পেন্সিল শেষ তাই দোকানে যাচ্ছি। ঘরের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও আনবো।বলেই মুনিয়ার মা বেড়িয়ে গেলেন। পাড়ার দোকান বন্ধ। আর
রিক্সা না পাওয়ায় হাটতে হাটতে গেলেন অন্য দোকানে। শেষ পর্যন্ত খাতা আর অন্যান্য জিনিস কিনে বাসায় ফিরতে দেড় ঘন্টারও বেশি সময় লেগে গেলো। তিনি একটু চিন্তা করতে লাগলেন আবার ভাবলেন কার্টুন দেখতে বসলে মেয়ের হুশ থাকেনা। তিনি মেয়ের পছন্দের আইসক্রিম ও নিয়ে এলেন। নাহলে মুনিয়া রাগ করবে।

বাসায় ফিরে মুনিয়ার মা কলিং বেল বাজালেন। কয়েকবার বেল দেয়ার পরও মেয়ে দরজা খুলছেনা। তিনি ভাবলেন তার দেড়ি দেখে মেয়ে অভিমান করেছে। ব্যাগ থেকে চাবি বের করে তাই দরজা খুললেন। দরজাটা খুলতেই তার চোখে কেয়ামত নেমে এলো।
তিনি দেখলেন ডাইনিং রুমের মেঝেতে বাড়ীওয়ালার ছেলে মুনিয়ার মুখে জোরে চেপে ধরে আছে। মুনিয়ার চোখদুটো কোঠর ছেড়ে যেন বেরিয়ে আসছে। পরনের প্যন্টটা নিচে পড়ে আছে। দুটো পা দিয়ে রক্তের ধারা নেমে ফ্লোরটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

দুটো ছেলে দৌড়ে মুনিয়ার মাকে ধাক্কা মেরে বের হয়ে পালিয়ে গেলো। মুনিয়ার মা বুঝে গেলো কি ঘটেছে। আচমকা তার কি হলো সে জানে না। দরজাটা লাথি দিয়ে বন্ধ করে দৌড়ে রান্নাঘর থেকে মাছ কাটার বটিটা নিয়ে এসে একটা কোপ দিলেন বাড়ীওয়ালার ছেলের ঘাড় বরাবর। তারপর কোপাতেই লাগলেন যতক্ষণ মাথাটা আলাদা না হয়। আর পাশে পরে রইলো মুনিয়ার নিথর দেহটা।
তারপর ধর্ষকের কাটা মাথা আর মেয়ের নিথর দেহ নিয়ে তিনি বের হয়ে গেলেন…।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন