মুসলিম শাসনামলে নির্যাতিত নারী

।। আবদুল্লাহ বিন মাহমুদ ।।

সময়টা বিজয়ের। বিশ্বের আনাচকানাচে ইসলামের বিজয়ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছিল। তারিক বিন জিয়াদ, কুতায়বা বিন মুসলিম, মুহাম্মাদ বিন কাসিমদের মতো সেনাপ্রধানদের আঘাতে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছিল কাফের রাষ্ট্রগুলো। একের পর এক সাম্রাজ্য নুয়ে পড়ছিল মুসলিম উম্মাহর পদতলে। আনুগত্যের শপথ পাঠ করে ধন্য করছিল নিজেদের।

এক নির্দয় অত্যাচারি তখন ইরাকের গভর্নর। ইসলামের ইতিহাসে এমন নির্দয় শাসকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দায়। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সঙ্গীদের রক্ত যার হাতে লেগে ছিল। এমন এক অত্যাচারির হাতে শোভা পাচ্ছিল রক্তে রাঙা একটি চিঠি। চিঠিটি এসেছে সুদূর হিন্দুস্থানের সিন্ধু থেকে। এক মুসলিম বোন লিখেছে নির্দয় শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে।

চিঠির ভাষা অত্যাচারি হাজ্জাজের ভেতরকে কাঁপিয়ে তুলল। হোক না সে জালেম; কিন্তু তারই এক মুসলিম বোন কিনা কাফের শাসক দাহিরের কারাগারে বন্দি। এই অপরাধ ক্ষমার মৃত্যু বৈ ভিন্ন কোনো পন্থা আছে কি! এ যে মুসলিম উম্মাহর আত্মসম্মানে কষাঘাত। এর মোক্ষম জবাব দেওয়া তো আবশ্যক।

মুসলিম বাহিনী তখন বিভিন্ন দিক বিজয়ে ব্যস্ত। খেলাফতের রাজধানীতে দায়িত্বরত বাহিনী ব্যতিত আর কোনো সেনা সদস্য নেই। বিজয়ী সেনাপতি মুহাম্মাদ বিন কাসিম দাঁড়িয়ে গেলেন জনতার সামনে। মেলে ধরলেন নির্যাতিতা এক মুসলিম বোনের রক্তমাখা চিঠি। স্মরণ করিয়ে দিলেন আত্মসম্মানবোধের কথাও।

রাজধানী কেঁপে উঠল তাকবির ধ্বনিতে। মুসলিম বেসামরিক জোয়ানরা তৈরি হয়ে গেল বোনের সম্মান রক্ষার্থে। দূরদেশে তাদেরই এক বোন লাঞ্ছিত হচ্ছে, এ তো মানার মতো নয়। মুসলিম বাহিনী পথ অতিক্রম করছে—তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আত্মমর্যাদায় পূর্ণ ক্ষুদে মুসলিম বাহিনীটি বোনের সম্মান রক্ষার্থে রাজা দাহিরের বিশাল বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কেড়ে আনল বিজয়মালা। রক্ষা করল নিজ বোনের সম্মান মর্যাদা।

মুহাম্মদ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু আবি আমের আন্দালুসিয়ার এক বিজয়ী সেনাপতি। জীবনে তিনি ‘চুয়ান্ন’টি জিহাদে স্বশরীরে অংশ নেন এবং বিজয়ী হন। পরাজয় কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাকে হাজিব আল মানসুর উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

একবার তিনি সংবাদ পান নাফার রাষ্ট্রে তিনজন মুসলিম নারীকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। দ্রুত তিনি বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলেন। এই বাহিনী উপস্থিত হয় নাফার রাষ্ট্রের সীমান্তে। নাফার সম্রাট আতংকিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কেন এসেছেন। তাঁকে বলা হয়, আপনার রাজ্যের একটি গির্জায় তিনজন মুসলিম নারীকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। নাফার সম্রাট জানান, এই বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এবং দ্রুতই তিনি এর সমাধান করবেন। সম্রাট নিজের উদ্যোগে সেই তিন মুসলিম নারীকে মুক্ত করেন। এর সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের সবাইকে শাস্তি দেন। এমনকি হাজিব আল মানসুরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি গির্জাটিও ভেঙে ফেলেন। 1

স্পেনের জালিম সম্রাট রডরিক, তার আঞ্চলিক গভর্ণর কাউন্ট জুলিয়ানের মেয়ে ফ্লোরিডার সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করেছে। কন্যার এমন অপমান সহ্য করা যেকোনো পিতার পক্ষেই অসম্ভব। তিনি সম্রাটকে শাস্তি দিবেন; এমন ক্ষমতা ছিল না। সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মতো শক্তিও ছিল না। কিন্তু তিনি জানতেন ন্যায়বিচারক হিসেবে খ্যাত আছেন একজন মুসলিম গভর্ণর। যিনি অবাধ্য আফ্রিকাকে বাধ্য করেছিলেন। মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর।

কাউন্ট জুলিয়ান একান্তই বাধ্য হয়ে মুসা বিন নুসাইরের কাছে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। আসলেন মুসা বিন নুসাইরের কাছে। এক অসহায় পিতার মুখে কন্যার নির্মমতার কথা শুনে বাকরূদ্ধ হয়ে গেলেন মুসা বিন নুসাইর। জুলিয়ানের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। নিজের বিশ্বস্ত সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে জরুরী তলব করলেন। চরিত্রহীন রডরিককে হটিয়ে সমগ্র
স্পেন জয়ের ঘোষণা করলেন মুসা বিন নুসাইর। জুলিয়ান অবাক হয়ে দেখলেন—স্পেন জয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল তারিক বিন জিয়াদের বাহিনী।

যুগে যুগে ইসলাম নারীর সম্মান রক্ষার্থে এমনই-সব পদক্ষেপ নিয়েছে যা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। অথচ ইসলামের শত্রুরা ইসলামকে বিশ্ববাসীর সামনে এমনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে—ইসলাম যেন গোটা নারীজাতির শত্রু। কিন্তু ইতিহাস অধ্যায়ন করলে নারীজাতির সম্মানার্থে তাদের এমন কোনো পদক্ষেপের লেশ মাত্র পাওয়া যাবে না—যেমন পদক্ষেপের চিহ্ন ইসলাম অঙ্কিত করেছে।

 

রেফারেন্সঃ
1- মাক্কারি, আহমাদ বিন মুহাম্মদ (মৃত্যু ১০৪১ হিজরি), নাফহুত তিব মিন গুসনিল আন্দালুসির রাতিব, ১/৪০৪ (দার সাদের, বৈরুত)

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক 

 

আরও পড়ুন