মানুষ গড়ার কারিগর

।। অধ্যাপিকা মৌলুদা খাতুন মলি ।। 
ফরহাদ ভাইয়ের মুখে- ‘কলেজে সাইকোলজি পড়াই’ কথাটা শুনেই স্পষ্টবাদী রমজান চাচা ব্যঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে লেকচার শুরু করলেন। সে এক নাতিদীর্ঘ লেকচার।
চাচার হাতে এখন অফুরন্ত সময়। কাজ-কাম কিচ্ছু নেই, অবসরে আছেন। আলহামদুলিল্লাহ্‌ সুস্থই আছেন। সুতরাং মানুষ পেলেই তিনি জ্ঞান দিতে বসে যান। চাচার বয়স এখন বিরাশি পার হচ্ছে। কিন্তু গলার তেজ যথেষ্ট স্বচ্ছ- পঁচিশ বছর যুবকের মতো। পুরু কাঁচের চশমা ঠিক করতে করতে চাচা বললেন–
— ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমলে আর যাই হোক, অন্তত শিক্ষক নির্বাচনে তারা একদম সঠিক ছিল। হবু-মবু, যে কেউ চাইলেই ‘শিক্ষক পদে’ আসতে পারতো না। অনেক কঠিন এবং সঠিকভাবে ‘শিক্ষক’ যাচাই-বাছাই হতো। ইন্টার্ভিউ বোর্ড প্রশ্নজালে একেকজনকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়তো। ফিজিক্যাল ফিটনেস, গেট আপ, কথাবার্তা অর্থাৎ তার বাচনভঙ্গি আঞ্চলিকতা বর্জিত কিনা, এমন কি ফ্যামিলি ব্র্যাকগ্রাউন্ড পর্যন্ত দেখত তারা।

 

(একটু থেমে, আবার)–
এখন তো শুধু সার্টিফিকেট, টাকা আর মামা-খালুর জোর থাকলেই অনায়াসে ‘শিক্ষক’ হওয়া যায়- যোগ্যতা লাগে না। সরকারেরও বাপু মাথা খারাপ হয়েছে। নইলে এতবড় ভাইটাল একটা পদে- গরু-ছাগল যাকে-তাকে নিয়োগ দেয় কি করে? ছিহ, ধিক..!!
এবার আর সহ্য হলো না।
রমজান চাচার কথাবার্তা, আর বলার ধরণ এতটাই অপমানকর-আপত্তিকর ছিল যে, সহ্যেরও তো একটা মাত্রা থাকা চাই! আমি সাহসে ভর করে- ‘সরি চাচা’ বলে প্রতিবাদ করলাম-
— ভুল। আপনার ধারনা নিতান্তই ভুল চাচা। এখন রীতিমত নিবন্ধনে পাশ করে, লিখিত-মৌখিক বোর্ড ফেস করে…তারপর একজন শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। এযুগে চাকরি পাওয়া কি অতই সহজ চাচা, ছেলের হাতের মোয়া ভাবছেন? যোগ্যতাবলেই চাকরি হয় সবার।
আমার কথা শুনে বেচারা ফরহাদ ভাই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে কি একটা বলতে চাইলেন কিন্তু কথা শেষ করতে পারলেন না। রমজান চাচা খপ করে তাঁর কথার টুটি চেপে ধরলেন। এবার দিগুণ চড়া সুরে চাচা বললেন-
— যদি যোগ্যতাবলেই চাকরি হতো- তাহলে তোমার মতো জন্মগত ‘তোতলা’ শিক্ষক পদে চাকরি পায় কি করে, শুনি?
একটা বাক্য শেষ করতে তুমি তো…তো…তো করে দশ মিনিট পার করো! তাহলে ছাত্রদের বুঝাবে কি- কাঁচকলা-ঘন্টা?
এক্কেবারে জোকের মুখে নুন…!!

 

ফরহাদ ভাই লজ্জায় কাঁচুমাচু করতে লাগলেন।
আমিও একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।
নীচুস্বরে বললাম-
— কন্ঠ আল্লাহ্‌ প্রদত্ত চাচা। এতে মানুষের হাত নেই।
— কন্ঠে হাত না থাকলেও চাকরিতে হাত আছে মা। অবশ্যই আছে। তারজন্যই তো সততা চাই। চাই দুর্নীতিমুক্ত সঠিক নির্বাচন!!
নির্বাচন সঠিক না হলে- সঠিক মানুষ পাবো কি করে আমরা?
‘কুইনাইন’ এ ভেজাল থাকলে কি আর জ্বর সারে মা? সবধরনের চাকরি সবার জন্য নয়- বিশেষ করে শিক্ষকতা পেশা…।
পৃথিবীতে শিক্ষকের মূল্য সবথেকে বেশি। কারণ- তাঁরাই তো মানুষ গড়ার কারিগর!!
আজ অধ্যক্ষ স্যার (মোকাব্বর হোসেন, রাজু) জরুরি মিটিং কল করেছেন।
তাই সকাল থেকে সব শিক্ষক কলেজে টিচার্স রুমে অপেক্ষারত।
শুনলাম- সাবেক অধ্যক্ষ (সর: আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া) শামস-উল- আলম জয় স্যার কলেজে আসছেন। সাথে থাকছেন- সবার প্রিয়মুখ বুলবুল ভাই।
(খুবই সংক্ষেপে লিখবো আজকের ঘটনা। সবাই ব্যস্ত। বড় লেখা পড়ার মতো সময়- হাতে নেই কারোই।)
হ্যা, জয় স্যার কথার শুরুটাই করলেন গোটা শিক্ষক সমাজের প্রশংসা দিয়ে। উনি বললেন-
‘সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা হলো- শিক্ষকতা’।

 

আমরা নড়েচড়ে, জেকেজুকে বসলাম। জয় স্যার হাসিহাসি মুখ নিয়ে, হাত নেড়ে নেড়ে ইনফরমাল কথা বলছেন- আর আমরা শুনছি। শুধু শোনা নয়-যাকে বলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনা- বুঝা, উপলব্ধি, আত্মস্থ করা। উনার কি যে আকর্ষিত বাচনভঙ্গি, চরম শিক্ষণীয় জ্ঞানগর্ভ আলোচনা!! আমরা সত্যিই অভিভূত!!
রিয়েলি, প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায়- কারও মাঝেই সামান্যতম ক্লান্তি-বিরক্তি লক্ষ্য করিনি আমি। মাশা-আল্লাহ!!
তিনি বললেন- প্রচণ্ড বেয়াদব স্টুডেন্টকেও একজন শিক্ষক তার আচরণ, বুদ্ধি, হিকমাহ দিয়ে- সুপথে আনতে পারে, আলোকিত মানুষ বানাতে পারে।
হ্যা, জয় স্যারের কথার সুরে সুর মিলিয়ে আমিও শুধু এটুকুই বলতে চাই-

 

শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে- অবশ্যই মানসম্মত ভাল শিক্ষক দরকার।
★ যিনি তাঁর নিজের সন্তানের মতো করে (ছাত্রদের) পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে উত্তম চরিত্রের মানুষ বানাতে বদ্ধপরিকর।
★ যিনি তাঁর সারাজীবনের লব্ধ জ্ঞান ছাত্রদের মাঝে বিতরণ করার মাঝেই- নিজের সার্থকতা, আত্মতৃপ্তি খুঁজে পাবেন।
★ যিনি তাঁর সহনশীলতা আর আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে গোটা জাতিকে এগিয়ে নিবেন উন্নতির চরম শিখরে। সাথে থাকবে সুসংগঠিত, আদর্শিক, আত্মত্যাগের বলে বলিয়ান- ছাত্রসমাজ।
তাই প্রার্থনা করি–
শিক্ষক-ছাত্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ হয়ে উঠুক- “সোনার বাংলা”।
সেইসাথে শিক্ষক সমাজ পাক তার সঠিক মর্যাদা, মূল্যায়ন।।

 

মলি, বগুড়া।
১৪ নভেম্বর/২০২১ ইং

 

লেখকঃ লেখক ও শিক্ষক 

 

লেখকের আরও লেখা পড়ুন- মহিলাদের জ্ঞান অর্জন
মানুষ গড়ার কারিগর – মানুষ গড়ার কারিগর – মানুষ গড়ার কারিগর
আরও পড়ুন