বুক রিভিউঃ আদর্শ লিপি

মাসুদ আলমঃ

★এটা  জীবনের প্রথম বুক রিভিউ লেখা।

তাই প্রথম রিভিউটি আমার জীবনে পড়া প্রথম বই দিয়েই শুরু করলাম। ৯০’র দশকে বা তার কিছু পূর্বে যাদের জন্ম এবং যারা গ্রামাঞ্চলে বাল্যকাল কাটিয়েছেন তারা অবশ্যই এই বইটি একদিন হলেও পড়েছেন, আমি নিশ্চিত!
এই বইটি এমন এক বই, যে বইটি যাদের জন্য লেখা তারা কখনোই নিজে নিজে পড়তে পারেনা। আর যখন পড়তে পারে তখন আর এই বইটি পড়েনা!
যাহোক আমার জীবনের অমূল্য একটি বই সমন্ধে বলি….

বইটির প্রথম পাতা খুললেই স্বরবর্ণ। বাংলা একাডেমি প্রনীত স্বরবর্ণের সংখ্যা ১১ টি। কিন্তু আদর্শ লিপির স্বরবর্ণ ১৫ টি!  ‘৯’ একটি সংখ্যা হলেও আদর্শ লিপিতে কিন্তু ‘৯’ একটি স্বরবর্ণ। যার উচ্চারণ হতো ‘লী’।  এছাড়াও ‘৯’ এর উপর আরেকটি ‘৯’ দিয়েও হতো আরেকটি বর্ণ তার উচ্চারণ স্বয়ং শিক্ষকরাও জানতেন না। ‘অং’ এবং ‘অঃ’ দুটিও বিবেচিত হয়েছে স্বরবর্ণ হিসেবে। আর জ্যেতি চিহ্নসহ ব্যঞ্জন বর্ণের সংখ্যা এই বইয়ে ৪১ টি।

স্বরবর্ণ গুলোর সাথে একটি করে নীতিবাক্য যুক্ত আছে। যেমন-

অ- অসৎ সঙ্গ ত্যাগ কর
আ- আলস্য দোষের আকর
ই- ইক্ষু রস অতি মিষ্ট
ঈ- ঈশ্বরকে বন্দনা কর
উ- উগ্র ভাব ভালো নয়
ঊ- ঊর্ধ্ব মুখে পথ চলিও না
ঋ- ঋষিবাক্য শিরধার্য
এ- একতা সুখের মূল
ঐ- ঐশ্বর্য রক্ষা করা কঠিন
ও- ওষধি ফল পাকিলে মরে
ঔ- ঔদার্য মহৎ গুণ

৩ থেকে ৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ব্যঞ্জণবর্ণগুলোর সঙ্গে স্বরবর্ণের যোজনা এবং ‘য’ ফলা, ‘র’ ফলা, ‘ল’ ফলা, ‘ব’ ফলা, ‘ন’ ফলা, ‘রেফ’ ফলা, ‘ম’ ফলার যোজনার পাঠ।
আমার (মাসুদ আলম)  জীবনের পড়া প্রথম বই। ক্লাশ টু তে উঠলেই তখন শুধু সরকারি বই পাওয়া যেত। এর আগেও অবশ্য আরো দুইটি ক্লাশ বা শ্রেণী ছিল, যথা ছোট ওয়ান ও বড় ওয়ান! এই দুটি শ্রেণী বই নিজ দায়িত্বে সংগ্রহ করতে হতো এবং নিশ্চিত ভাবেই দেশজুড়ে (গ্রামাঞ্চলে) তাদের একমাত্র বই হতো- “আদর্শলিপি”।

বইটির ৮ নং পৃষ্ঠা থেকে বাক্য গঠন শুরু। এই বাক্য গঠনগুলো হতো নীতি বাক্য গঠন। যেগুলো আমাদের বটগাছের নিচে দাড় করিয়ে মুখস্থ করানো হতো। অবশ্য আমার সবগুলো বিদ্যালয়ে বট গাছ ছিলনা। কেননা আমি (মাসুদ আলম) চারটি ভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছি।
অ তে ‘অজগর’ আ তে ‘আম’ এগুলো এখানে নেই, এখানে আছে ‘অ’ তে ‘অসৎ সঙ্গ ত্যাগ কর’, ‘আ’তে আলস্য দোষের আকর।
বাক্য গঠনের পর আছে  শ্রুতি বাক্যের পাঠ। অর্থাৎ শিক্ষক বলবেন তারপর তা শুনে শিক্ষার্থীরা গলা ফাটিয়ে তীব্র আওয়াজে তা বলবে। যেমন- ‘খেলায় মজিয়া শিশু কাটাইও না বেলা, সময়ের প্রতি কভু করিও না হেলা।’। এক্ষেত্রে অর্থ বুঝাটা বিবেচ্য কোন বিষয় ছিলনা!
এর পর আছে আমার জীবনে শেখা প্রথম কবিতাটি। মনে করে দেখুন হয়তো আপনারও…  ‘শিশুর প্রার্থনা’ কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কার ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’ এবং আরেকটি কবিতা “‘কে বড়?” কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, ‘আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়’।

এরপর রয়েছে ‘শতকিয়া’। যেখানে ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো মুখস্থ পড়ানো হতো। এরপর ইংরেজি ক্যাপিটাল লেটারের পাঠ, যাকে বাংলায় লেখা হয়েছে, ‘ছাপার বড় অক্ষর’।

আদর্শ লিপি’র শেষ পাতায় ইংরেজি ছোট হাতের অক্ষর। এরপর বাংলা সাত বারের নাম, ইংরেজি সাত বারের নাম এবং বাংলা বারো মাসের নাম পাঠের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সম্পূর্ণ নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপানো এবং কোন প্রকার ছবি বিহীন আদর্শ লিপি বইটি।

সুখপাঠ্য এই বইটি আপনি সংগ্রহ করে পড়তে পারেন। এতে আপনার এখন আর শিখার কিছু নেই, জানারও কিছু নেই!

তবুও পড়ে দেখতে পারেন আপনার মূল (root) কে জানার জন্য। কিভাবে, কোন পরিবেশে, কতোটা সুন্দর ছিল আপনার বাল্যকাল, মানুষ জন কেমন ছিল, কিভাবে বড় হয়েছেন ইত্যাদি সব মনের কোণে উঁকি দিবে।

বইঃ আদর্শলিপি
লেখকঃ সীতানাথ বসাক
প্রকাশকঃ শ্রী সম্ভুনাথ ঘোষ
স্থানঃ কানুপুর, কুমিল্লা, বাংলাদেশ
ধরনঃ বর্ণ পরিচয়
মূল্যঃ তৎকালীন ১ টাকা (বর্তমান মূল্যঃ অমূল্য রতন)
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১২

তবে বইটি এখন কোথায় পাওয়া যায় কি না তা আমার জানা নেই!
ধন্যবাদ।

মাসুদ আলম
ইউএই

আরও পড়ুন