কবি ও রহস্যময়ীঃ নজরুল প্রেমের উপাখ্যান

মাহজেবিন মম

প্রচলিত আছে কবি মাত্রই প্রেমিক হন আর সেই কবি যদি হন কাজী নজরুল ইসলাম তাহলে তো কথাই নেই। দ্রোহ আর উল্লাসের কবি কিন্তু প্রেমিক হিসেবেও বেশ আলোচিত সমালোচিত হয়েছেন। কবি জীবনে আসা প্রেম, নারী এখনও সমানভাবে পাঠকদের কৌতূহলী করে তোলে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী ফজিলাতুন্নেছা এবং কাজী নজরুল ইসলামের প্রেম নিয়ে একটু বেশিই আগ্রহ আছে পাঠক সমাজে। শোনা যায় ফজিলাতুন্নেছা কর্তৃক কবি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। এই প্রেম -প্রত্যাখানের গল্প নিয়ে বিশ্বজিৎ চৌধুরী রচনা করেছেন “কবি ও রহস্যময়ী” উপন্যাসটি। 

কাহিনি সংক্ষেপঃ 

তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার করটিয়ার কুমল্লীনামদার গ্রামের মেয়ে ফজিলাতুন্নেছা। ১৯২৫ সালে প্রথম মুসলিম ছাত্রী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হন। এর আগে তিনি ইডেন এবং বেথুন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মুসলিম সমাজে একজন নারীর উচ্চশিক্ষা অর্জন করার জন্য কলকাতা ঘুরে এসে ঢাকায় বসবাস করা ছিলো অবাস্তব কল্পনার মতো। প্রতিবেশী আত্মীয় এবং সমাজের চোখ রাঙানো আর কটু কথাকে উড়িয়ে দিয়ে সাহসী এই নারী আপন স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলেন শিক্ষাগুরু ড. নলিনীমোহন বসুকে। আপন আত্মজার মতোই ফজিলাতুন্নেছাকে আগলে রাখতেন তিনি। ঢাকা শহরে ফজিলাতুন্নেছা ভাই হিসেবে পেয়েছিলেন গনিত বিভাগের আরেক শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেন কে।

এক সম্মেলনে প্রবন্ধ পড়েছিলেন ফজিলাতুন্নেছা আর দর্শক সারিতে ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী বাঁকপটু এই মেয়ের বক্তব্যে কবি মুগ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ফজিলাতুন্নেছার আগ্রহেই কাজি মোতাহার হোসেন নজরুলের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেন।

প্রথম পরিচয়ে ফজিলাতুন্নেছার হাত দেখেন কবি। এর প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষক নলিনীমোহন ভৎসর্না করেন তাকে। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন উদ্যমী ও সম্ভবনাময়ী এই ছাত্রীটি আবেগে ভেসে যেতে পারে। হারিয়ে ফেলতে পারে তার গন্তব্য। তাই তো তিনি ফজিলাতুন্নেছাকে বলেছিলেন-

‘দেখো, অঙ্কে জাদু নেই, কবিতায় আছে। কবি ও কবিতার এই মায়াজাল কাটিয়ে উঠা বড় কঠিন।’

শিক্ষকের এই সাবধানী বাণীতে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। কিন্তু যিনি সামলালেন না তিনি হলেন কবি। নিত্য যাতায়াত, গান আর আড্ডা চলতে লাগলো ফজিলাতুন্নেছার বাসায়। কবি তখন কাজী মোতাহার হোসেনের বাড়িতে আস্তানা গড়েছেন। আড্ডা,হাসি গানে মাতিয়ে রেখেছেন সকলকে। নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন বুদ্ধদেব বসুর প্রগতির সাহিত্য আড্ডায়।

এরই মাঝে এক রাত্তিরে ফজিলাতুন্নেছার দরজায় কড়া নাড়েন নজরুল। পরিপূর্ণ আবেগের সাথে প্রেম নিবেদন করেন তাকে। কিন্তু কঠিনভাবে প্রত্যাখ্যাত হন কবি। বিস্ময়ে হতবিহ্বল কবি তাঁর লিখে দেয়া কবিতার খাতাটি চাইলেন ফজিলাতুন্নেছার কাছে। খাতা পেয়ে তাতে লিখলেন-

‘সুন্দর বেশে মৃত্যু আমার আসিলে কি এত দিনে?
বাজালে দুপুরে বিদায় পূরবী আমার জীবন বীণে।
ভয় নাই রাণী রেখে গেনু শুধু চোখের জলের লেখা
রাতের এ লেখা শুকাবে প্রভাতে চলে যাই আমি একা’

সেদিন ভোরেই কাউকে কিছু না বলে ঢাকা ছাড়েন কবি। এরপর কাজী মোতাহার হোসেন এবং ফজিলাতুন্নেছাকে লিখতে থাকেন বেদনাবিধুর চিঠি। অন্যদিকে ফজিলাতুন্নেছা এম তে প্রথম বিভাগে প্রথম হন। প্রসংশার বন্যায় ভেসে যেতে থাকেন তিনি। পরবর্তীতে ফজিলাতুন্নেছা উচ্চশিক্ষার জন্য বিলাত গমন করেন।

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ

কবি নজরুল একজন সৌম্য দর্শন, সম্মোহন জাগানিয়া ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর প্রেমে পড়া তাই অনেকটা অনিবার্যই বটে। কিন্তু আজন্ম লড়ে আসা নারী ফজিলাতুন্নেছা অন্য ধাতুতে গড়া। কবির তীব্র প্রেমের আকুতির বিপরীতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন কঠিন এক প্রতিরোধ। ফজিলাতুন্নেছার এই আত্মসংযম এবং প্রত্যয়ী মনোভাব পাঠক কে মুগ্ধ করবে। 

গোঁড়ামি আর অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকা মুসলিম সমাজে নারী হিসেবে নিজের চলার পথ ফজিলাতুন্নেছা নিজেই তৈরী করে নিয়েছেন। চলার পথে সাহায্যকারীর ভূমিকায় পেয়েছেন অনেক মানুষকে। করটিয়ার জমিদার, কিংবা শিক্ষক নলিনীমোহন আবার বিলেত যাত্রায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করা “সওগাত” পত্রিকার সম্পাদক জনাব নাসির উদ্দীন সকলেই ছিলেন তার শুভাকাঙ্ক্ষী। 

প্রত্যাখাত প্রেমিক কবি, ফজিলাতুন্নেছার নাম দিয়েছিলেন ‘চোখের জলের প্রিয়া।’ তাকে নিয়ে রচনা করেছেন বিখ্যাত প্রেমের কবিতা রহস্যময়ী আর অসংখ্য গান। মোতাহার হোসেন কে লিখা চিঠির প্রতিটি লাইনে লাইনে থাকতো ফজিলাতুন্নেছার কথাই। কবির বিরহবিলাস দেখে পাঠক স্বীকার করে নিতে বাধ্য হবেন যে তিনি সত্যিই ফজিলাতুন্নেছার প্রেমে পড়েছিলেন।

উপন্যাসে আরো উঠে এসেছে নজরুল জীবনের এক অন্ধকার দিক। স্বীয় স্ত্রী দোলনের প্রতি অবহেলা কিংবা আপন সংসারে মনোযোগহীন বৈরাগী এক নজরুল কে পাঠক আবিষ্কার করবেন। কবির ভালোবাসার দোলনচাঁপা কেনই বা এতো অবজ্ঞার পাত্রী হয়ে গেলেন তা পাঠকের মনে বিস্ময়ের জন্ম দেয়।

উপন্যাস শেষে লেখক বিশ্বজিৎ চৌধুরী যে চমক দেখিয়েছেন তাতে পাঠক ভাবনার দোলাচলে দুলতে থাকবে। তবে কি নজরুলের প্রেম এক পাক্ষিক ছিলো? ফজিলাতুন্নেছার কি আদৌ ডিগ্রি অর্জন সম্ভ ব হয়েছিলো? নাকি ফজিলাতুন্নেছাও কবির প্রেমে পড়েছিলেন? এমনি অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে ” কবি ও রহস্যময়ী” বইটি।

ব্যক্তিগত মতামতঃ

ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে উপন্যাস রচনা করা তাও আবার বাংলা সাহিত্যের রথী মহারথীরা যেখানে উপস্থিত আছেন তা এক দুরূহ কাজই বটে। এই দুরূহ কাজটিই করে দেখিয়েছেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী। দীর্ঘ দিনের প্রচলিত একটি কাহিনীর সত্যতা যাচাই কিংবা সত্য উদঘাটন করতে গিয়ে তাকে বেশ গবেষনা করতে হয়েছে। একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কলাম লেখা যেতে পারে তবে একেবারে উপন্যাস রচনা করে ফেলা সাহসী কাজই বটে।

উপন্যাসে লেখকের কাহিনি বর্ণার ধরন, ঘটনার ধারাবাহিকতা বিন্যাস এবং শব্দ প্রয়োগ খুবই চমৎকার লেগেছে আমার কাছে। ফজিলাতুন্নেছার মাঝে যেনো নিজেকে কল্পনা করতে পেরেছি। উনার ভালো ফলাফলে আমার চোখের কোণেও অশ্রু ঝলক দিয়ে গিয়েছে। উনার বিলাত গমনে আমিও আনন্দে ভেসেছি। যা অনুভব করতে পারিনি তা হলো কবি নজরুলের প্রতি তার সত্যিকার অনুভূতি। 

লেখক উপন্যাসে  টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ করেছেন। কাহিনির প্রয়োজনেই তা করতে হেয়েছে। এক্ষেত্রে লেখকের কিছুটা ঘাটতি লক্ষ করা যায়। দুয়েকটি শব্দ সঠিক হয়নি বলে মনে হয়েছে আমার।

এই উপন্যাসের কিছু উক্তি খুবই ভালো লেগেছে। যেমন-

১. ‘ভালোবাসা মরে গেলে তার কবরে বসে ভেজা মাটি শুকানোর জন্য অপেক্ষা করতে পারিনা আমি। সেটাই হয়তো আমার ব্যর্থতা, আমার অপরাধ।’ 

২. ‘ভুল তো দেবতাও করে, আমি সামান্য মানুষ।’

৩. ‘সুন্দর ও বেদনা এ দুটা পাতার মাঝখানে একটি ফুল বিকশিত বিশ্ব।’

৪. আমার কেবলি সেই হতভাগিনীর কথা মনে পড়ছে – যার ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে ‘ডিউটিফুল’ আর পায়ের তলায় প্রস্ফুটিত শতদলের মতো ‘বিউটিফুল।’

৫. ‘আমি বিশ্বাস করি যে, যে আমায় এমন করে চোখের জলে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে -সে আমার আজকের নয়, সে আমার জন্মজন্মান্তরের, লোক লোকান্তরের দুখ-জাগানিয়া।’

৬. ‘আমি কবি, আমি জানি কী করে সুন্দরের বুকে ফুল ফোটাতে হয়।’

৭. ‘যে সৌন্দর্য সরব ও প্রচারোন্মুখ, তা অন্যের অহংবোধকে আহত করে, দূরে ঠেলে দেয়।’

৮. ‘মেধা ও প্রতিভার স্পর্শ মানুষকে অন্য রকম এক সৌন্দর্যে সজীব করে তোলে।’

৯. ‘সৃষ্টশীল মানুষের জীবনে ভুল ও প্রেম বোধ হয় সমার্থক শব্দ।’ 

১০. ‘কবিদের আবেগটাই বোধ হয় এ রকম, বিদ্রোহের হুংকার আর বিরহের হাহাকার – সবটাতেই বাড়াবাড়ি।’

উপন্যসটি শেষ করে পাঠক এক দ্বিধার মাঝে থাকবে। তবে কি কবি পেয়েছিলেন অধরা মাধুরী নাকি আক্ষেপ আর চোখের জলই সঙ্গী হয়েছিলো তাঁর? উপন্যাসের শেষে পাঠকের জন্য এমনি এক ‘টুইস্ট ‘ অপেক্ষা করছে যা পাঠককে নতুন করে আবার ভাবতে বাধ্য করবে কবি এবং কবির ভাষায় রহস্যময়ী ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়ে। আশাকরি পাঠকের নিকট বইটি সুখপাঠ্য হবে।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরও পড়ুন