যৌতুক

শাহানারা শারমিন

খুব সকালে টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে আমার।
বাবা :টেলিফোন কানে দিয়ে হ্যালো হ্যালো কে? কোথায় থেকে বলছেন?

ফোনের অপর প্রান্তে কান্না জরিত কন্ঠে বড় মামা।
বড় মামা : আমি দুলাভাই, আপনারা বাড়ির সকলে চলে আসেন,ময়না খুব অসুস্থ।

মা: কি হয়েছে কে ফোন করেছে?কথা বলছনা কেন?
বাবা: চোখ মুছতে মুছতে মাকে বললো ময়না খুব অসুস্থ তারাতারি চলো।

মা:কাঁদতে কাঁদতে আমি জানি ময়নার কিছু একটা হয়েছে, তাছারা বড় ভাইজান এই সকালে কেন ফোন করবে?
আমরা বাড়ির সবাই মামাবাড়ি রওনা দিলাম। আমার আদরের বোন ময়নাকে দেখতে। ময়নার সংসারে অনেক দিন যাবৎ অশান্তি চলছিল। হাসিখুশি ফুলের মত ময়নার জীবন যে এভাবে তীলে তীলে শেষ হয়ে যাবে এইটা আমরা কখনো ভাবতেও পারিনি।

আমার মামার বাড়ি কুসুমপুরে। নানা নানী কেউ বেঁচে নেই। বড় মামা চালের ব্যবস্যা করে।ছোট মামা একজন সিএন জি ড্রাইভার।মামিও খুব ভালো।তার ব্যাবহার খুবই সুন্দর। ঊদার,অতিথীপরায়ন,এছারাও মামির অনেক গুন আছে।
ছোট মামা বিয়ে করেছেন আজ ১০ বছর হয়ে গেলো তবুও তাদের কোন সন্তান হয়নি।তাই নিয়ে তাদের চিন্তার শেষ নাই।
মামা মামিকে অনেক ডাক্তার, কবিরাজ,,দেখিয়েছেন। অনেক চেষ্টা করে কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি।তাই তারা সন্তানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

এর মধ্য মামা হটাৎ করে একদিন মিস্টি নিয়ে আমাদের বাসায় বেড়াতে আসেন।
মা:কিরে মাসুম কেমন আছিস ভাই,এতদিন পরে বোনের কথা মনে হলো?
মামা:আলহামদুলিল্লাহ বুবু, একটা খুশির সমবাদ দিতেই চলে এলাম।
মা: কি খুশির খবর তারাতারি বল।

মামা:ফরিদার বাচ্চা হবে।সে তোমাদের দোয়া চেয়েছে।

মা:আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তোর মনের আশা পূরন করছে।একথা সুনে আমরা সবাই খুব খুশি হলাম।মামাও অনেক খুশি।

আস্তে আস্তে নয় মাস কেটে গেলো।আর মামির কোল আলো করে এলো এক ফুটফুটে কন্যা সন্তান। মামা গ্রামের সবাইকে মিস্টি মুখ করলেন।মামা সখ করে মেয়ের নাম রাখলেন ময়না।

ময়না মামা মামির খুব আদরের মেয়ে। খুব যত্নে তাকে মানুশ করে তারা। ধীরে ধীরে ময়না বড় হয়।ময়নাকে কোন কিছুতেই চাপ দিতনা তারা। ময়না নিজের খেয়াল খুশিমত চলতো।

ময়না দেখতে সুন্দরী হলেও লেখাপড়ায় তার তেমন আগ্রহ ছিলনা।সারাদিন পুতুল খেলা,দোলনায় দোল খাওয়া, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে বেশি পছন্দ করে ময়না।ময়না হাসিখুশি থাকতে ভালোবাসে।

কোন মতে পঞ্চম শ্রেনি পাশ করে লেখাপড়া বাদ দিয়ে দেয় ময়না।ময়নার বয়স ১৩ বছর পার হতে না হতেই চেহারা সবার নজর কাড়ে।

পাড়ার সব ছেলেদের চোখ ময়নার দিকে।আর বাড়িতে একটার পর একটা ঘটক আসতেই থাকে ময়নার বিয়ের সমন্ধ নিয়ে।

ঘটক: মাসুম মিয়া বাড়ি আছেন নাকি?ময়নার একটা বিয়ের প্রাস্তাব নিয়ে এসেছিলাম।
মামা :এত ছোট মেয়েকে বিয়ে দিব না।তাছারা ময়না তো ঘর সংসারের কাজ কিছুই শিখেনি।
মামি: তাতে কি হয়েছে শিখে নিবে।ঘটক মশাই আপনি
ভাল ছেলে আনেন বিয়ে দিয়ে দিব।

ঘটক কিছুদিন পরে একটা পাত্রের খোঁজ আনে, ছেলের নাম মাহিম চৌধুরি,তিন ভাই বোন।বিশাল অবস্থা,ছেলে সরকারী চাকুরি করে।তার কথা টাকা পয়সার দরকার নেই সুধু একটা সুন্দর বউ চাই।

মামি :ঘটককে তাদের আনতে বলে।দুইদিন বাদে মাহিম ও তার বাবা মা ময়নাকে দেখতে আসে।ময়নাকে দেখে সবার পছন্দ হয়ে যায়।

কিন্তু ময়নার লেখাপড়া কম দেখে আর মামার সাংসারিক অবস্থার কথা সুনে তার বাবা মা এই বিয়েতে রাজি হয়না।কিন্তু মাহিম সাহেব এমন পণ করলো যে বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে সে এইখানেই করবে আর আজই করবে।
ছেলের কথায় বাদ্ধ হয়ে তারা এই বিয়েতে রাজি হয়।রাতারাতি ময়নাকে বিয়ে করে নিয়ে চলে যায় মাহিম চৌধুরী।
ময়না যখন শ্বশুর বাড়িতে পৌছে তখন রাত ১ টা বাজে। ময়নার চোখ ঘুমে ঢুলছে তবুও ময়না ঘুমাতে পারছেনা। বাড়িতে ঢুকেই ময়না অবাক হয়ে যায়।বিশাল বড় বাড়ি।সে মনে মনে ভাবে এইটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি।এসব ভাবতে ভাবতে রাত কেটে যায়।

পরের দিন সকালে সবাই নতুন বউকে দেখতে আসে।ময়নাকে দেখে সবাই মুগ্ধ হয়।
ছোট ননদ :ভাবি তোমার নাম কি।
ময়না : আমার নাম ময়না।
সবাই হা হা হা করে হেসে ঊঠে। মাহিম কে বলে ভাইয়া ভাবির নামটা আমাদের সোসাইটিতে একেবারে বেমানান। তুমি আকিকা দিয়ে ভাবির একটা সুন্দর নাম রেখে দাও।

প্রতিবেশি:পাশে থেকে বলে কি গো ময়না পাখি তুমি লেখাপড়া কতদুর করেছো?

ময়না : ক্লাস ফাইভ। একটা সুনে তারা কানা কানি করতে থাকে।আমাদের মাহিম কত লেখাপড়া জানা ছেলে আর তার বউ ক্লাস ফাইভ পাশ।

দেবর :আচ্ছা ভাবি তোমার বাবা কি করে?
ময়না :আমার বাবা একজন ড্রাইভার।

দেবর :কিসের ড্রাইভার উড়োজাহাজ নাকি ট্রেনের? ময়না : সি এন জি ড্রাইভার।
সবাই হাসাহাসি করে।ময়না মুখে কিছুই বলতে পারেনা।খুব কস্ট পায়।
মাহিম নিজের বউকে এভাবে অপমান করছে দেখে খুব খারাপ লাগছে তার।কিন্তু কিছুই বলতে পারছেনা।সবাই যখন চলে যায় ময়নাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

মাহিম: প্লিজ ময়না তুমি রাগ করোনা।একটু ধৈর্য ধরো দেখবে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

বিয়ের সাত দিন পার হয়ে গেলো মাহিমের ছুটি শেষ তার এবার চলে যেতে হবে।
মাহিম: ময়না তুমি সাবধানে থেকো। আর মন খারাপ হলে আমাকে ফোন দিও।
ময়না: আচ্ছা আপনিও সাবধানে যাবেন।আর সময়মত খাবার খাবেন।
শাশুড়ি : ছেলেকে খুশি করার জন্য আচ্ছা বাবা আমি আছি তো তোর এত চিন্তা করতে হবেনা।তুই ভালো থাকিস বাবা।

ময়না সাত দিন বাবা মাকে দেখেনি তার মনটা বড়ই অস্থির লাগছে। গ্রামে থাকলে সে এতক্ষনে কত দৌড়াদৌড়ি করত।আর এখনে সুধু ঘরে বসে থাকা।

এসব ভাবতেই মামা মামি ময়নাকে দেখতে যায়।
ময়না বাবা মাকে দেখে খুবই খুশি হয়।কিন্তু ময়নার শ্বশুর বাড়ির সবার মাথায় যেন আগুন জলে উঠে।

মামা :আসসালামু আলাইকুম বেয়ান কেমন আছেন?

বেয়ান আপনি অনুমতি দিলে আমরা ময়নাকে কিছুদিনের জন্য নিয়ে যেতে চাই।
শাশুড়ি : অশিক্ষিত গেয়ো মেয়েকে আমার ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েও শান্তি হয়নি।আবার নিতে এসেছেন। লজ্জা করেনে আপনাদের। একপয়সা দেবার মুরোদ নেই আবার বড় বড় কথা।

মামা:একি বলেন বেয়ান? বিয়ের সময় তো টাকা পয়সা লেনদেনের কোন কথা ছিল না।

শাশুড়ি :চেয়ে নিতে হবে কেন,আপনাদের বিবেক নাই।আমার ছেলের যোগ্যতা দেখেই আপনার দেওয়া উচিৎ।
আমার কত সাধ ছিল ছলেকে বড় ঘড়ে বিয়ে দিব।অনেক টাকা পয়সা পাব।আর ছেলে এমন জায়গায় বিয়ে করলো যেখানে একটা কানাকড়ি ও পেলোনা।

ময়না: শাশুড়ির এমন আচরন দেখে অবাক হয়ে যায়।যেই কটা দিন ছেলে বাড়িতে ছিল সে অনেক ভালো আচরন করেছিল।আর এখন এমন করছে কেন?
মা বাবাকে এমন ভাবে অপমান করা দেখে ময়নার খুব খারাপ লাগলো।

মামা:ময়নাকে উদ্দেশ্য করে, মারে আমারা চলে গেলাম। নিজের দিকে খেয়াল রাখিস।

শাশুড়ি: যান যান এই মুহুরতে আমার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যান।আর কোন দিন এইখানে আসবেন না।
যেদিন আমার ছেলেকে যোগ্য সম্মান দিতে পারবেন সেই দিন এসে মেয়েকে নিয়ে যাবেন।

মামা মামি কাদঁতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।

যতই দিন যায় ময়নার উপর তাদের অত্যাচার বাড়তে থাকে।কখনো কথার ছুড়ি দিয়ে। কখনো খাবার খোটা দিয়ে,আবার কখনো বাবা মাকে তুলে গালি দিয়ে,আবার কখনো যৌতুক না দেওয়ার কথা বলে ময়নাকে আঘাত করে তারা।

বাবা মায়ের কাছে কখনো বকা খায়নি ময়না।আর এখন প্রতিটা দিন তার এসব সুনতে হয়।ইট পাথরের চার দেয়ালের বন্দি জীবনে ময়না হাপিয়ে উঠে।

সারারাত শুয়ে থেকে কাঁদে। কখনো বা না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে ময়না।এবাবে ময়নার শরীর ভেঙে পড়ে।মাহিম মাঝে মাঝে ময়নাকে ফোন করে খবর নেয়।

কিন্তু ময়না এসব কথা কিছুই জানায় না মাহিমকে।সে ছাড়া বাড়ির কেউ তার সাথে তেমন কথা বলেনা। ময়না বোবার মত ঘরে বসে থাকে। সংসারে কাজ করে।

এর মাঝে ময়না একদিন বমি করে।ময়না কিছুই না বুঝলেও তার শাশুরি বুঝতে পারে যে ময়না অন্তঃসত্ত্বা। ময়নার শাশুড়ি চায়না তার পেটে সন্তান আসুক।শাশুড়ি চালাকি করে একদিন এসে ময়নাকে বলে,

শাশুড়ি :বউমা সারাদিন তোমার মাথা ঘুরাই চলো তোমাকে আজ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।
ময়না:একথা শুনে ময়না খুশি হয়। সে ভাবে এতদিনে হয়ত তার রাগ পরেছে।
শ্বাশুড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে ময়নাকে বাচ্চা নস্ট হয়ে যাওয়ার ঔষধ কিনে দেয় ।ময়না কিছুই বুঝতে পারেনা।
ময়না বাড়ি এসে দুই তিন বার ঔষধ খেয়েই অসুস্থ হয়ে যায়।প্রচন্ড পেট ব্যাথায় ময়না কাতরাতে থাকে।কিন্তু তার কান্না যেন কারো কানে পৌছে না।

ময়না:মা আমার পেট খুব ব্যাথা করছে।আর রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে।
শাশুড়ি :আমি কি করতে পারি ডাক্তার যা ভালো বুঝেছে তাই করেছে।
আস্তে আস্তে ময়নার শরীর আরো খারাপ হয়ে যায়।সে কস্ট সহ্য করতে পারেনা।
ময়না:কাজের বুয়াকে ডেকে বলে তার অবস্থার কথা সে যেন মাহিম কে আর তার বাবা মাকে জানায়।

মেয়ের এমন অবস্থার খবর পেয়ে মামা মামী পাখির মত উড়ে আসে,তারা এসে ময়নাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যায়। কিন্তু লাভ হয়না।প্রচন্ড রক্তক্ষরনের ফলে ময়নার মৃত্যু হয়।
মাহিম খবর পেয়ে এসে দেখে ময়নার নিথর দেহ পড়ে আছে হাসপাতালের বেডে। সে ময়নাকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।মামা মামি একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে প্রায় পাগল হয়ে গেল।

মাহিম ময়নার লাশ নিয়ে যেতে চাইলো তার বাড়িতে।কিন্তু মামা মামি রাজি হলো না। মামা বললেন বেঁচে থাকতেই যেখানে আমার মেয়ের মূল্য ছিলোনা মারা যাওয়ার পরে সেখানে রেখে কি হবে।

তারা ময়নাকে নিয়ে গেলো কুসুমপুরে।ময়নার কপালে সুখ সইলো না। শুুধু মাত্র যৌতুক না দেবার অপরাধে একটা নিষ্পাপ জীবন ধ্বংস হয়ে গেলো। রাজপ্রসাদ ছেরে ময়না এখন চিরশান্তিতে ঘুমিয়ে আছে কুসুমপুরের মাটির ঘরে।

শাহানারা শারমিন কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.